Saturday, April 6, 2019

আবু মূসা আল আশয়ারী (রাঃ)

আবদুল্লাহ নাম, আবু মূসা কুনিয়াত। কুনিয়াত দ্বারাই তিনি অধিক পরিচিত। পিতা কায়েস, মাতা 'তাইয়্যেবা'। তাঁর ইসলাম পূর্ব জীবন সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়না। এতটুকু জানা যায় যে, তিনি ইয়েমেনের অধিবাসী ছিলেন। তথাকার 'আল-আশয়ার' গোত্রের সন্তান হওয়ায় তিনি 'আল-আশয়ারী' হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।

হযরত আবু মূসা ইসলামের পরিচয় লাভ করে ইয়েমেন থেকে মক্কায় আসেন এবং রাসূলুল্লাহর (সাঃ) হাতে বাইয়াত হন। মক্কার 'আবদু শামস' গোত্রের সাথে বন্ধু সম্পর্ক গড়ে তোলেন। কিছুদিন মক্কায় অবস্থানের পর স্বদেশবাসীকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়ার উদ্দেশ্যে ইয়েমেন ফিরে যান।

হযরত আবু মূসা ছিলেন তার খান্দানের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। খান্দানের লোকেরা খুব দ্রুত এবং ব্যাপকভাবে তাঁর দাওয়াতে সাড়া দেয়। প্রায় পঞ্চাশজন মুসলমানের একটি দলকে সাথে নিয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর কাছে যাওয়ার জন্য ইয়েমেন থেকে সমুদ্রপথে যাত্রা করেন। সমুদ্রের প্রতিকূল আবহাওয়া এ দলটিকে হিজাযের পরিবর্তে হাবশা ঠেলে নিয়ে যায়। এদিকে হযরত জাফর বিন আবী তালীব ও তাঁর সংগী সাথীরা যাঁরা তখনও হাবশায় অবস্থান করছিলেন, মদীনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন। আবু মূসা তাঁর দলটিসহ এই কাফিলার সাথে মদীনার পথ ধরলেন। তাঁরা মদীনায় পৌঁছলেন, আর এদিকে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী খাইবার বিজয় শেষ করে মদীনায় ফিরেন। রাসূল (সাঃ) আবু মূসা ও তাঁর সংগী সকলকে খাইবারের গনীমতের অংশ দান করেন।

হযরত আবু মূসা মক্কা বিজয় ও হুনাইন যুদ্ধে শরীক ছিলেন। হুনাইনের ময়দান থেকে পালিয়ে বনু হাওয়াযিন 'আওতাস' উপত্যকায় সমবেত হয়। রাসূল (সাঃ) তাদেরকে সমূলে উৎখাতের জন্য হযরত আবু আমেরের নেতৃত্বে একটি দল পাঠান। তারা আওতাস পৌঁছে হাওয়াযিন সর্দার দুরাইদ ইবন্যুস সাম্মাকে হত্যা করে তাদেরকে ছত্র্রভঙ্গ করে দেয়। কিন্তু ঘটনাক্রমে হাশামী নামক এক মুশরিকের নিক্ষিপ্ত তীরে আবু আমের মারাত্নকভাবে আহত হন। আবু মূসা আশয়ারী পিছু ধাওয়া করে এই মুশরিককে হত্যা করেন।

হযরত আবু আমের তার মৃত্যুর পূর্বে আবু মূসাকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন্ এবং আবু মূসার কাছে এই বলে অনুরোধ করেন যে, 'ভাই, রাসূলুল্লাহর (সাঃ) খেদমতে আমার সালাম পৌঁছে দেবেন এবং আমার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করতে বলবেন।' আবু আমের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। আবু মূসা তাঁর বাহিনী সহ মদীনায ফিরে এসে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নিকট আবু আমেরের অন্তীম অসীয়তের কথা বর্ণনা করলেন। রাসূল (সাঃ) পানি আনিয়ে ওযু করলেন এবং আবু আমেরের জন্য মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করলেন। আবু মূসা আরজ করলেন, 'ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমার জন্যও একটু দোয়া করুন।' রাসূল (সাঃ) দোয়া করলেন, "হে আল্লাহ, আবদুল্লাহ ইবন কায়েসের পাপসমূহ মাফ করে দিন। কিয়ামতের দিন সম্মানের সাথে তাকে জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ দিন।"

হিজরী নবম সনে তাবুক অভিযানের তোড়জোড় চলছে। আবু মূসার সংগী সাথীরা তাকে পাঠালেন রাসূলুল্লাহর (সাঃ) কাছে তাদের জন্য সওয়ারী চেয়ে আনার জন্য। ঘটনাক্রমে আবু মূসা যখন পৌঁছলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কোন কারণে উত্তেজিত ছিলেন। আবু মূসা তা না বুঝে আরজ করলেন ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমার সাথীরা আমাকে পাঠিয়েছে, আপনি যেন তাদেরকে সওয়ারী দান করেন। রাসূল (সাঃ) বসে ছিলেন। উত্তেজিত কন্ঠে তিনি বলে ওঠেনঃ আল্লাহর কসম তোমাদের কোন সওয়ারী আমি দেবনা। আবু মূসা ভীত হয়ে পড়লেন, না জানি কোন বেয়াদবী হয়ে গেল। অত্যন্ত দুঃখিত মনে ফিরে এসে সংগী সাখীদের তিনি এ দুঃসংবাদ দিলেন। কিন্তু তখনও তিনি স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারেননি, এর মধ্যে বিলাল দৌঁড়ে এলেন, বললেনঃ আবদুল্লাহ ইবনে কায়েস কোথায় তুমি? চলো রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তোমাকে ডাকছেন। তিনি বিলালের সাথে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) দরবারে হাজির হলেন।

রাসূল (সাঃ) নিকটেই বাঁধা দুটি উটের দিকে ইঙ্গিত করে বললেনঃ 'এ দুটিকে তোমার সাথীদের কাছে নিয়ে যাও।' হযরত আবু মূসা উট দুটি নিয়ে গোত্রীয় লোকদের কাছে ফিরে এসে বললেনঃ "রাসূল (সাঃ) এ দুটি উট তোমাদের সওয়ারী হিসেবে দান করেছেন, তবে তোমাদের কিছু লোককে আমার সাথে এমন একজন লোকের কাছে যেতে হবে যে রাসূলুল্লাহর পূর্বের কথা শুনেছিল। যাতে তোমাদের মনে এ ধারণা না হয় যে, আমি আগে যা বলেছিলাম তা আমার মনগড়া কথা ছিল।" লোকেরা বলল আল্লাহর কসম আমরা আপনাকে সত্যবাদী বলেই বিশ্বাস করি। তবে আপনি যখন বলছেন, চলুন। এভাবে কিছু লোককে সংগে নিয়ে তিনি তাঁর পূর্বের কথার সত্যতা প্রমান করেন।

তাবুক থেকে ফেরার পর একদিন আশয়ারী গোত্রের দুইজন নেতৃ্স্থানীয় ব্যাক্তি হযরত আবু মূসা আশয়ারীকে সংগে নিয়ে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) কাছে গেল। তারা রাসূলুল্লাহর (সাঃ) কাছে যে কোন একটি পদ লাভের আকাঙ্খা ব্যক্ত করল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মিসওয়াক করছিলেন। তাদের কথা শুনে তাঁর মিসওয়াক করা বন্ধ হয়ে যায়। তিনি আবু মূসার দিকে ফিরে বললেনঃ 'আবু মূসা, আবু মূসা!' আবু মূসা আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমি তাদের অন্তরের কথা জানতাম না। আমি জানতাম না তারা কোন পদ লাভের আকাঙ্খা ব্যক্ত করবে। রাসূল (সাঃ) বললেন, "যদি কেউ নিজেই কোন পদের আকাঙ্খী হয়, আমি তাকে কক্ষনো সেই পদে নিয়োগ করবোনা। তবে, আবু মূসা তুমি ইয়েমেনে যাও। আমি তোমাকে সেখানকার ওয়ালী নিযুক্ত করলাম।"

সেই প্রাচীনকাল থেকে ইয়েমেন দু’ভাগে বিভক্ত ছিল। ইয়েমেন আকসা ও ইয়েমেন আদনা। হযরত মুয়াজ বিন জাবালকে ইয়েমেন আকসার এবং আবু মূসাকে ইয়েমেন আদনার ওয়ালী নিয়োগ করা হল। দুজনকে বিদায় দেওয়ার সময় রাসূল (সাঃ) তাদেরকে এই বলে উপদেশ দেনঃ “ইয়েমেনবাসীর সাথে নরম ব্যবহার করবে, কোন প্রকার কঠোরতা করবেনা। মানুষকে খুশী রাখবে, ক্ষেপিয়ে তুলবেনা। পরস্পর মিলে মিশে বসবাস করবে।‍‍”

নিজ দেশ হওয়ার কারণে ইয়েমেনবাসীর ওপর হযরত আবু মূসার যথেষ্ট প্রভাব পূর্ব থেকেই ছিল। তাই সুষ্ঠুভাবেই তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করেন। পার্শ্ববর্তী ওয়ালী হযরত মুয়াজ বিন জাবালের সাথে তাঁর ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব ছিল। মাঝে মাঝে সীমান্তে গিয়ে তাঁরা মিলিত হতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে পরস্পর মত বিনিময় করতেন।

হিজরী দশম সনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) শেষ হজ্জ আদায় করেন। হযরত আবু মূসা ইয়েমেন থেকে এসে হজ্জে অংশগ্রহন করেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ 'আবদুল্লাহ ইবন কায়েস, তুমি কি হজ্জের উদ্দেশ্যে এসেছ?' তিনি জবাব দিলেনঃ হাঁ, ইয়া রাসূলুল্লাহ! রাসূল (সাঃ) প্রশ্ন করলেনঃ 'তোমার নিয়ত কি ছিল?' তিনি বললেনঃ আমি বলেছিলাম, রাসূলুল্লাহর (সাঃ) যে নিয়াত আমারও সেই নিয়াত। রাসূল (সাঃ) আবার প্রশ্ন করলেনঃ 'কুরবানীর পশু সঙ্গে এনেছো কি?' তিনি বললেনঃ না। রাসূল (সাঃ) নির্দেশ দিলেন তাওয়াফ্ ও সায়ী করার পর ইহরাম ভেঙ্গে ফেল। [সহীহুল বুখারী]। উল্লেখ্য যে, রাসূল (সাঃ) হজ্জে 'কিরান' আদায় করেছিলেন। আর হজ্জে কিরানের জন্য কুরবানীর পশু সংগে নেওয়া জরুরী।

হজ্জ শেষে আবু মূসা ইয়েমেন ফিরে আসেন। এদিকে আসওয়াদ আনাসী নামক এক ভন্ড নবুওয়াত দাবী করে বিদ্রোহ ঘোষনা করে বসে। এমনকি হযরত মুয়াজ বিন জাবাল আবু মূসার রাজধানী 'মারেব' চলে আসতে বাধ্য হন। এখানেও তারা বেশী দিন থাকতে পারলেন না। অবশেষে তারা হাদরামাউতে আশ্রয় নেন। যদিও ইবন মাকতুহ মুরাদী আসওয়াদ আনাসীকে হত্যা করেন, তবুও রাসূলুল্লাহর (সাঃ) ইনতিকালে আবার বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অতঃপর প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর (রাঃ) মদীনা থেকে বাহিনী পাঠিয়ে এই বিদ্রোহ নিমূর্ল করেন। ইয়েমেনর দুই ওয়ালী নিজেদের স্থানে আপন আপন দায়িত্বে ফিরে গেলেন। হযরত আবু মূসা হাদরামাউত থেকে স্বীয় কর্মস্থল 'মারেব' ফিরে আসেন এবং দ্বিতীয় খলিফার খিলাফত কালের প্রথম পযার্য় পর্যন্ত অত্যন্ত সফলভাবে স্বীয় দায়িত্ব পালন করতে খাকেন।
 
হযরত উমারের (রাঃ) খিলাফাতকালে বিভিন্ন অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা শুরু হলে আবু মূসা (রাঃ) জিহাদে শরীক হওয়ার প্রবল আকাঙ্খায় ওয়ালীর দায়িত্ব ত্যাগ করে হযরত সাদ ইবন আবী ওয়াক্কাসের বাহিনীতে সৈনিক হিসেবে যোগদান করেন। হিজরী ১৭ সনে সেনাপতি সাদের নির্দেশে তিনি 'নাসিবীন' জয় করেন। এ বছরই বসরার ওয়ালী মুগীরা ইবন শুবাকে (রাঃ) অপসারণ করে তার স্থলে আবু মূসা (রাঃ) কে নিয়োগ করা হয়।

খুযিস্তান হচ্ছে বসরার সীমান্ত সংগলগ্ন এলাকা। ঐ এলাকাটি তখনো ইরানীদের দখলে ছিল। হিজরী ১৬ সনে খুযিস্তান দখলের উদ্দেশ্যে হযরত মুগীরা (রাঃ) আহওয়াযে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেন। আহওয়াযের সর্দার অল্প কিছু অর্থ বার্ষিক করদানের বিনিময়ে মুগীরার সাথে সন্ধি করেন। মুগীরা ফিরে যান। হিজরী ১৭ সনে মুগীরার স্থলে আবু মূসা দায়িত্ব গ্রহন করলে আহওয়াজবাসী কর প্রদান বন্ধ করে দিয়ে বিদ্রোহ করে। বাধ্য হয়ে আবু মূসা সৈন্য পাঠিয়ে আহওয়াজ দখল করেন এবং মানাযির পযর্ন্ত অভিযান অব্যহত রাখেন। বিশিষ্ট সেনা অফিসার হযরত মুহাজির ইবন যিয়াদ (রাঃ) এই মানাযির অভিযানের এক পযার্য়ে শাহাদাত বরণ করেন। শত্রু বাহিনী তার দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করে কিল্লার গম্বুজে ঝুলিয়ে রাখে। আবু মূসা হযরত মুহাজিরের ভাই হযরত রাবীকে মানাযির দখলের দায়িত্ব দেন। রাবী মানাযির দখলে সফল হন।

এদিকে আবু মূসা 'সোস' অবরোধ করেন। শহরবাসী কিল্লায় আশ্রয় নেয়। অবশেষে তাদের নেতা এই শর্তে আবু মূসার সাথে সমঝোতায় পৌঁছেন যে, তার খান্দানের একশত ব্যক্তিকে জীবিত রাখা হবে। নেতা এক এক করে একশত ব্যক্তিকে হাজির করলো এবং আবু মূসা শর্ত অনুযায়ী তাদের মুক্তি দিলেন। দুর্ভাগ্যক্রমে নেতা নিজের নামটি পেশ করতে ভুলে গেল এবং সন্ধির শর্তানুযায়ী তাকে হত্যা করা হলো। 'সোস' অবরোধের পর আবু মূসা ‘রামহরমুয’ অবরোধ করেন এবং বার্ষিক আট লাখ দিরহাম কর আদায়ের শর্তে তাদের সাথে সন্ধি হয়।

চারদিক থেকে তাড়া খেয়ে শাহানশাহে ইরানের সেনাপতি 'হরমুযান' শোশতার-এর মজবুত কেল্লায় এসে আশ্রয় নিয়েছে। আবু মূসা শহরটি অবরোধ করে বসে আছেন। শহরটির পতনের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হচ্ছে। একদিন অপ্রত্যাশিতভাবে এক ব্যক্তি গোপনে শহর খেকে বেরিয়ে আবু মূসার ছাউনীতে চলে এলো। সে প্রস্তাব দেয়, যদি তার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়া হয় তাহলে সে শহরের পতন ঘটিয়ে দেবে। লোকটির শর্ত মনজুর হলো। সে 'আশরাস' নামক এক আরবকে সঙ্গে নিল। আশরাস চাদর দিয়ে মাথা মুখ ঢেকে চাকরের মত লোকটির পিছে পিছে চললো। তারা নদী ও গোপন সুড়ঙ্গ পথে শহরে প্রবেশ করে এবং নালা, অলি-গলি পেরিয়ে হরমুযানের খাস মহলে গিয়ে হাজির হয়। এভাবে আশরাস শহরের সব অবস্থা পর্যবেক্ষন করে গোপনে আবার আবু মূসার কাছে ফিরে আসে এবং বিস্তারিত রিপোর্ট পেশ করে। অতঃপর আবু মূসার নির্দেশে আশরাস দু’শো জানবাজ সিপাহী সংগে করে হঠাৎ আক্রমন করে দ্বার রক্ষীদের হত্যা করে দরজা খুলে দেয়। এদিকে আবু মূসা তাঁর সকল সৈন্যসহ দরজার মুখেই উপস্থিত ছিলেন। দরজা খোলার সাথে সাথে সকল সৈনিক একযোগে নগরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। শহরে হৈ চৈ পড়ে যায়। হরমুযান দৌঁড়ে কিল্লায় আশ্রয় নেয়। মুসলিম বাহিনী কিল্লার পাশে পৌঁছলে হরমুযান কিল্লার গম্বুজে উঠে ঘোষনা করে যে, যদি আত্নসমর্পণের পর মদীনায় উমারের কাছে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাহলে আমি আত্নসমর্পণে রাজী। তার শর্ত মঞ্জুর করা হয় এবং তাকে হযরত আনাসের (রাঃ) সাথে দারুল খিলাফাত মদীনায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

'শোশতার' বিজয়ের পর আবু মূসার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী 'জুনদিসাবুর' অবরোধ করে। এ অবরোধ বেশ কিছুদিন ধরে চলছিল। একদিন শহরবাসী হঠাৎ শহরের ফটক উন্মুক্ত করে দেয়। তারা অত্যন্ত শান্তভাবে আপন আপন কাজে ব্যস্ত। মুসলিম বাহিনী শহরে প্রবেশ করে তাদের এমন নিঃশঙ্কভাব দেখে অবাক হয়ে যায়। জিজ্ঞেস করলে তারা জানালো, কেন আমাদের তো জিযিয়ার শর্তে নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে। খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেল, মুসলিম বাহিনীর এক দাস সকলের অগোচরে একাই এ নিরাপত্তার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। সেনাপতি আবু মূসা দাসের এ চুক্তি মানতে অস্বীকার করলেন। শহরবাসী বলল, কে দাস, কে স্বাধীন তা আমরা জানিনে। শেষে এ বিষয়টি মদীনায় খলিফার দরবারে উত্থাপিত হলো। খলীফা জানালো, 'মুসলমানদের দাসও মুসলমান। যাদেরকে সে আমান বা নিরাপত্তা দিয়েছে, সকল মুসলমানই যেন তাদের আমান দিয়েছে।' এভাবে আবু মূসার নেতৃত্বে গোটা খুযিস্তানে ইসলামের ভিত্তি সুদৃঢ় হয় এবং সেই সাথে তার অবস্থান স্থল 'বসরা' শত্রুর হুমকি থেকে মুক্ত হয়ে যায়।

খুযিস্তানের পতনের পর হিজরী ২১ সনে ইরানীরা নিহাওয়ান্দে এক চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি নেয়। খলীফা উমার (রাঃ) নুমান ইবনে মুকরিনকে বিরাট এক বাহিনীসহ নিহাওয়ান্দে পাঠান এবং আবু মূসাকে তাঁকে সাহায্য করার নির্দেশ দেন। খলীফার নির্দেশ পেয়ে বিরাট এক বাহিনীসহ তিনি নিহাওয়ান্দে পৌঁছেন। এ যুদ্ধেও ইরানী বাহিনী মারাত্নকভাবে পরাজয় বরণ করে।

খুযিস্তান জয়ের পর বিজিত এলাকা বসরার সাথে একীভূত করার জন্য আবু মূসা আবেদন জানালেন খলীফার কাছে। এদিকে কুফাবাসীরাও কুফার সাথে একীভূত করার দাবী জানালো তাদের ওয়ালী আম্মার ইবনে ইয়াসিরের (রাঃ) নিকট। খলীফা আবু মূসার দাবী সমর্থন করে বিজিত এলাকা বসরার সাথে একীভূত করলেন। এ দিকে কুফাবাসী তাদের দাবী পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় আম্মারের বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। অবশেষে খলীফা কুফাবাসীদের দাবী অনুযায়ী আম্মারকে সরিয়ে হিজরী ২২ সনে আবু মূসাকে কুফার ওয়ালী নিযুক্ত করেন। কিন্তু এক বছর পর হিজরী ২৩ সনে আবার বসরায় বদলী হন।

এ বছরই (হিঃ ২৩) 'দাব্বা' নামক এক ব্যক্তি খলীফার কাছে আবু মূসার বিরুদ্ধে নিম্নের অভিযোগগুলি উত্থাপন করেঃ

১. আবু মূসা যুদ্ধবন্দীদের থেকে ষাটজন সর্দার পুত্রকে নিজেই নিয়ে নিয়েছেন।

২. তিনি শাসনর্কাযের যাবতীয় দায়িত্ব যিয়াদ ইবন সুমাইয়্যার ওপর ন্যস্ত করেছেন এবং প্রকৃতপক্ষে যিয়াদই এখন সকল দন্ডমুন্ডের মালিক।

৩. তিনি কবি হুতাইয়্যাকে এক হাজার দিরহাম ইনয়াম দিয়েছেন।

৪. আকলিয়্যা নাম্মী তার এক দাসীকে দু’বেলা উত্তম খাবার দেয়া হয়; অথচ তেমন খাবার সাধারণ মানুষ খেতে পায় না।

হজরত উমার নিজহাতে অভিযোগগুলি লিখলেন। আবু মূসাকে মদীনায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন। অভিযোগগুলির সত্য মিথ্যা নিরুপনের জন্য যথারীতি অনুসন্ধান চালালেন। প্রথম অভিযোগটি মিথ্যা প্রমানিত হল। দ্বিতীয় অভিযোগের জবাব দিলেন যে, যিয়াদ একজন তুখোড় রাজনীতিক ও দক্ষ প্রশাসক। তাকে আমি উপদেষ্টা নিয়োগ করেছি। খলীফা যিয়াদকে ডেকে পরীক্ষা নিলেন এবং তাকে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে দেখতে পেলেন। যিয়াদকে তার পদে বহাল রাখার নির্দেশ দিলেন। তৃতীয় অভিযোগের জবাবে বললেন, হুতাইয়্যা যাতে আমার হিজু (নিন্দা) না করে এজন্য আমি তাকে আমার নিজ অর্থ থেকে উপঢৌকন দিয়েছি। কিন্তু চতুর্থ অভিযোগের কোন জবাব তিনি দিতে পারলেন না। হযরত উমার (রাঃ) একটু বকাবকি করে তাকে ছেড়ে দিলেন। [তাবারী]।

আবু মূসা এ বছরই (হিঃ ২৩) ইস্পাহানে অভিযান চালিয়ে অঞ্চলটি ইসলামী খিলাফতের অন্তর্ভূ্ক্ত করেন। ইস্পাহান বিজয় শেষ করে ফিরে এলে সেই বছরই তাঁকে বসরা থেকে কুফায় বদলী করা হয়।

বসরাবাসীদের ভীষন পানি-কষ্ট ছিল। বিষয়টি খলীফার দরবারে পৌঁছানো হলো। দিজলা নদী থেকে খাল কেটে বসরা শহর পযর্ন্ত নেওয়ার জন্য খলীফা নির্দেশ দিলেন। আবু মূসার নেতৃত্বে দশ মাইল দীর্ঘ একটি খাল খনন করে বসরাবাসীদের পানি-কষ্ট দূর করা হয়। ইতিহাসে এ খাল 'নহরে আবি মূসা' নামে প্রসিদ্ধ।

হিজরী ২৩ সনে জিলহজ্জ মাসে দ্বিতীয় খলীফা উমার (রাঃ) শাহাদাত বরণ করেন। হযরত উসমান (রাঃ) খিলাফতের দায়িত্বভার গ্রহনের পর প্রশাসনের কাঠামোতে অনেক রদবদল করেন। কিন্তু হিজরী ২৯ সন পযর্ন্ত আবু মূসা বসরার ওয়ালীর পদে বহাল থাকেন।

হিজরী ২৯ সনে কুর্দীরা বিদ্রোহ ঘোষনা করে। আবু মূসা মসজিদে গিয়ে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ সর্ম্পকে এক জ্বালাময়ী ভাষন দান করেন। ভাষনে আল্লাহর রাস্তায় পায়ে হেঁটে চলার ফযীলত বর্ণনা করেন। তার প্রতিক্রিয়া স্বরুপ কিছু মুজাহিদ তাদের নিকট ঘোড়া থাকা সত্ত্বেও পায়ে হেঁটে চলার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেল। আবু মূসার সমালোচক তাদেরকে বললোঃ "আমাদের এত তাড়াতাড়ি করা উচিত হবে না। দেখা যাক আমাদের আমীর আবু মূসা কিভাবে চলেন।" আবু মূসাও ঘোড়ার ওপর সওয়ার হয়ে বের হয়ে এলেন। মুজাহিদরা তাঁর ঘোড়ার লাগাম ধরে প্রতিবাদ করে বসল।

আসলে আবু মূসার ভাষনের অর্থ এমন ছিলনা যে, যাদের ঘোড়া আছে তারা তাদের কাজে তা ব্যবহার করবে না। বস্তুতঃ তখন সময়টি ছিল ফিতনা ও ষড়যন্ত্রের। হাঙ্গামাবাজরা এই সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে মদীনায় চলে গেল এবং তাঁর অপসারণ দাবী করলো। খলীফা উসমান তাকে সরিয়ে নিলেন।

হিজরী ৩৪ সনে কুফাবাসীদের অনুরোধে সাঈদ ইবনুল আসের স্থলে খলীফা উসমা্ন আবু মূসাকে আবার কুফার ওয়ালী নিযুক্ত করেন। খিলাফতের সবর্ত্র তখন চলছে দারুণ চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র। রাসূলুল্লাহর (সাঃ) ভবিষ্যদ্বাণী আবু মূসার স্মরণে ছিল। তাই তিনি তাঁর বক্তৃতা-ভাষনে সবর্দা কুফাবাসীদের এ ভবিষ্যদ্বানীর কথা শোনাতেন। তাদেরকে সব ফিতনা থেকে দূরে থাকার উপদেশ দিতেন। হিজরী ৩৫ সনে হযরত উসমানের (রাঃ) শাহাদাত ও হযরত আলীর খলীফা হওয়ার পর সেই ফিতনা আত্নপ্রকাশ করে।

তৃতীয় খলিফা হযরত উসমানের (রাঃ) রক্তের কিসাসের দাবীতে সোচ্চার হয়ে হযরত আয়িশা, তালহা ও যুবাইর (রাঃ) মক্কা থেকে বসরার দিকে রওয়ানা হলেন। এদিকে তাদের প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে খলীফা হযরত আলী (রাঃ) উপস্থিত হলেন যি’কার নামক স্থানে। অন্যদিকে তিনি আম্মার ইবনে ইয়াসিরের (রাঃ) সাথে হযরত হাসানকে (রাঃ) পাঠালেন কুফায়। হযরত হাসান যখন কুফা পৌঁছলেন, আবু মূসা আশয়ারী তখন কুফার মসজিদে এক বিশাল জনসমাবেশে ভাষন দিচ্ছিলেন। ভাষনে তিনি জনগনকে এই ফিতনা থেকে দূরে থাকার উপদেশ দিচ্ছিলেন। হযরত হাসান সেথানে উপস্থিত হলেন এবং আবু মূসার (রাঃ) সাথে তার কিছু বাক বিতণ্ডা হয়। আবু মূসা নীরবে মসজিদের মিম্বর থেকে নেমে আসেন এবং কোন রকম প্রতিবাদ না করে সোজা সিরিয়ার এক অজ্ঞাত গ্রামে গিয়ে বসবাস করতে থাকেন। এভাবে তিনি এ গৃহযুদ্ধে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেন।

সিফফিনে হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত মুয়াবিয়া যুদ্ধ বিরতি ঘোষনা করলেন এই শর্তে যে, উভয় পক্ষে একজন করে দু’জন নিরপেক্ষ বিচারকের ওপর বিষয়টি নিষ্পত্তির ভার দেওয়া হবে। তাদের মিলিত সিদ্ধান্ত উভয় পক্ষ মেনে নেবে। আলীর (রাঃ) পক্ষ আবু মূসাকে এবং মুয়াবিয়ার পক্ষ আমর ইবনুল আসকে (রাঃ) বিচারক নিযুক্ত করেন।

উভয় পক্ষ ‘‌দুমাতুল জান্দাল’ নামক স্থানে একত্র হলেন। বিষয়টি নিয়ে দু’জনের মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হলো। অবশেষে তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন যে, উম্মাতের স্বার্থে আলী ও মুয়াবিয়া উভয়কে খিলাফতের পদ থেকে অপসারণ করতে হবে এবং মজলিসে শুরা তৃতীয় কাউকে খলীফা নিবার্চন করবে। তাঁরা উভয়ে জনগনের সামনে হাজির হলেন তাদের সিদ্ধান্ত ঘোষনার জন্য। আমর ইবনুল আসের অনুরোধে আবু মূসা প্রথমে উঠে সিদ্ধান্ত ঘোষনা করলেন; কিন্তু আমর তাঁর পূর্ব সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে হযরত মুয়াবিয়াকে খলীফা ঘোষনা করে বসলেন। আবু মূসা স্তম্ভিত হয়ে গেলেন।

আসলে আবু মূসা ছিলেন অত্যন্ত সরল ও সাদাসিধে প্রকৃতির। ধোঁকা ও কূটনীতি কি জিনিস তিনি জানতেন না। এ কারণে তাকে বিচারক নিযুক্ত করার ব্যাপারে হযরত আলী (রাঃ) দ্বিমত পোষন করেছিলেন। কিন্তু তার পক্ষের লোকদের চাপাচাপিতে তিনিও মেনে নেন। আমর ইবনুল আসের কুটনৈতিক জালে পরাজিত হয়ে আবু মূসা অনুশোচনায় এত দগ্ধিভূত হলেন যে, সেই মুহূর্তে তিনি মক্কার পথ ধরলেন। জীবনে আর কোন ব্যাপারে তিনি অংশগ্রহন করেননি। তাঁর মৃত্যু সন ও স্থান সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে। কারো মতে মক্কায় আবার কারো মতে তিনি কুফায় মৃত্যুবরণ করেন। তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে তিনি মক্কায় ইনতিকাল করেন। অনুরূপভাবে তাঁর মৃত্যুসন হিঃ ৪২, ৪৪ ও ৫২ সন বলে একাধিক মত রয়েছে। তবে প্রসিদ্ধ মতে হিঃ ৪৪ তাঁর মৃত্যুসন। [তাজকিরাতুল হুফফাজ]।

হযরত আবু মূসা (রাঃ) জীবনের শেষ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহর (সাঃ) আদেশ নিষেধ পালনে অত্যন্ত যত্ববান ছিলেন। এমনকি যখন তাঁর অবস্থা সঙ্কটজনক হয়ে পড়ে এবং তিনি চেতনা হারিয়ে ফেলেন, তখন মহিলারা কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। সেই মারাত্নক মুহূর্তেও ক্ষনিকের জন্য চেতনা ফিরে পেয়ে বলে ওঠেনঃ যে জিনিস থেকে রাসূল (সাঃ) স্বীয় দায়িত্ব মুক্তির কথা ঘোষণা করেছেন আমিও তা থেকে দায়িত্বমুক্ত। রাসূল (সাঃ) এমন বিলাপকারিনীদের থেকে দায়িত্ব মুক্তির কথা বলেছেন।

প্রথম জীবনে দারিদ্র ছিল তাঁর নিত্য সঙ্গী। কিন্তু পরবর্তী জীবন সচ্ছলতায় কেটেছে। হযরত উমার (রাঃ) তাঁর ভাতা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।

রাসূলুল্লাহর (সাঃ) বিশেষ নৈকট্য লাভের সৌভাগ্য যাদের হয়েছিল হযরত আবু মূসা (রাঃ) সেই সব বিশিষ্ট সাহাবীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন। রাসূলুল্লাহর (সাঃ) জীবদ্দশায় যে ছয় ব্যাক্তি ফাতওয়া দানের অনুমতি পেয়েছিলেন, তিনি তাঁদের অন্যতম। [তাজকিরাতুল হুফফাজ]। আসওয়াদ নামক একজন বিশিষ্ট তাবেয়ী বলেন, আমি কুফায় হযরত আলী (রাঃ) ও হযরত আবু মূসা (রাঃ) অপেক্ষা অধিক জ্ঞানী ব্যক্তি আর দেখিনি। হযরত আলী (রাঃ) বলতেনঃ মাথা খেকে পা পর্যন্ত আবু মূসা ইলমের রঙে রঞ্জিত। তিনি সব সময় জ্ঞানী-ব্যক্তিবর্গের সাহচর্য্যে থাকতেন এবং তিনি তাদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতেন। এ আলোচনা কখনও কখনও বাহাস-মুনাজিরা পর্যন্ত পৌঁছে যেত। বিশেষতঃ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ ও মুয়াজ বিন জাবালের (রাঃ) সাথে তাঁর বিশেষ তর্ক-বাহাস হতো। একবার তায়াম্মুমের মাসয়ালার ব্যাপারে আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) ও আবু মূসার (রাঃ) মধ্যে বিতর্ক হয়। ইমাম বুখারী 'তায়াম্মুম' অধ্যায়ে এ বিতর্ক বর্ণনা করেছেন।

তিনি যে শুধু জ্ঞান পিপাসু ছিলেন তাই নয়, জ্ঞানের প্রচার ও প্রসারের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতেন। তিনি মনে করতেন, যতটুকু তিনি জানবেন অন্যকে তা জানানো ফরজ। একবার এক ভাষণে বললেনঃ 'যে ব্যক্তিকে আল্লাহ ইলম দান করেছেন, তার উচিত অন্য ভাইদের তা জানানো। তবে যে বিষয়ে তার কোন জ্ঞান নেই সে সম্পর্কে একটি শব্দও মুখ থেকে বের করবে না।' তাঁর দারসের পদ্ধতিও ছিল বিভিন্ন ধরণের। যথারীতি হালকায়ে দারস ছাড়াও কখনও কখনও লোকজন জড়ো করে তাদের সামনে ভাষন দিতেন। পথে-ঘাটে কোথাও এক স্থানে কিছু লোকের দেখা পেলে তাদের কাছে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) দু' একটি বাণী পৌঁছে দিতেন। শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তিনি খুব কোমল আচরণ করতেন। কেউ অজ্ঞতা বশতঃ বোকার মত যদি কোন প্রশ্ন করে বসতো, তিনি উত্তেজিত হতেন না। অত্যন্ত নরম সুরে তাকে বুঝিয়ে দিতেন।

পবিত্র কুরআনের সাথে আবু মূসার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। রাত-দিনের প্রায় প্রতিটি মুহূর্ত কুরআন তিলাওয়াত ও কুরআন শিক্ষাদানের মাধ্যমে ব্যয় করতেন। ইয়েমেনের ওয়ালী থাকাকালে একবার মুয়াজ বিন জাবাল (রাঃ) জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি কিভাবে কুরআন তিলাওয়াত করেন? বললেনঃ রাত্র দিনে যখনই সুযোগ পাই একটু করে তিলাওয়াত করে নিই। তিনি সুমধুর কন্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। রাসূল (সাঃ) বলতেনঃ 'আবু মূসা দাউদের (আঃ) লাহানের কিছু অংশ লাভ করেছে।'

তাঁর তিলাওয়াত রাসূলে্র (সাঃ) খুবই পছন্দ ছিল। 

তাঁর কুরআন তিলাওয়াত শুনতে পেলেই রাসূল (সাঃ) দাঁড়িয়ে যেতেন। একবার হযরত আয়িশাকে (রাঃ) সংগে করে রাসূল (সাঃ) কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে আবু মূসার কুরআন তিলাওয়াত শুনতে পেয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে যান। কিছুক্ষন শোনার পর আবার সামনে অগ্রসর হন। একবার মসজিদে নববীতে আবু মূসা জোর আওয়াজে ইশার নামাজে কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন। সুমধুর আওয়াজ শুনে উম্মুহাতুল মুমিনীন হুজরার পর্দার কাছে এসে কান লাগিয়ে কুরআন তিলাওয়াত শুনতে থাকেন। সকালে আবু মূসা যখন এ কথা জানতে পারলেন, বললেনঃ আমি যদি তখন এ কথা জানতে পারতাম তাহলে আরো চিত্তাকর্ষক আওয়াজে তিলাওয়াত করে তাঁদেরকে কুরআনের আশেক বানিয়ে দিতাম। তাঁর এই অসাধারণ খোশ লাহানের কারণেই রাসূল (সাঃ) মুয়াজ বিন জাবালের (রাঃ) সাথে তাঁকেও নওমুসলিমদেরকে কুরআনের তালীম দানের জন্য ইয়েমেনে পাঠান।

পবিত্র কুরআনের সাথে সাথে হাদীছের খিদমতেও তাঁর অবদান কোন অংশে কম ছিলনা। কুফায় তার স্বতন্ত্র হালকায়ে দারসে হাদীস ছিল। এই দরসের মাধ্যমে বড় বড় মুহাদ্দিসীন সৃষ্টি হয়েছে। তার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ৩৬০। তন্মধ্যে ৫০ টি মুত্তাফাক আলাইহি, ৪৫টি বুখারী এবং ২৫টি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন।

কুরআন ও হাদীছে তার প্রভূত দখল থাকা সত্ত্বেও নিজের ভুল-ভ্রান্তি সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। তেমনিভাবে অন্যের জ্ঞানের কদরও করতেন। এববার তিনি মীরাস সংক্রান্ত একটি মাসয়ালায় ফাতওয়া দিলেন। ফাতওয়া জিজ্ঞেসকারী আবদুল্লাহ ইবন মাসউদের কাছেও বিষয়টি জিজ্ঞেস করে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ অন্যরকম ফাতওয়া দিলেন। আবু মূসা নিজের ভুল স্বীকার করে মন্তব্য করেন, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ জীবিত থাকা পর্যন্ত তোমাদের আমার কাছে আসা উচিত নয়।

হযরত আবু মূসার জীবনটি ছিল রাসূলে পাকের (সাঃ) জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। সর্বদা তিনি চেষ্টা করতেন রাসূলুল্লাহর (সাঃ) প্রতিটি কথা, কাজ, চলন, বলন, ইত্যাদি হুবহু অনুকরণ ও অনুসরণ করতে। একবার তিনি মক্কা থেকে মদীনা যাচ্ছিলেন। পথে ইশার নামাজ দুই রাকায়াত আদায় করলেন। তারপর আবার দাঁড়িয়ে সূরা আন নিসার ১০০টি আয়াত পাঠের মাধ্যমে এক রাকায়াত আদায় করলেন। লোকেরা প্রতিবাদ করলে তিনি বললেন, আমি সব সময় চেষ্টা করি যেখানে যেখানে রাসূল (সাঃ) কদম রেখেছেন সেখানে সেখানে কদম রাখার এবং তিনি যে কাজ করেছেন হুবহু তাই করার।

রামাদানের রোযা ছাড়াও নফল রোজা এজন্য রাখতেন যে, রাসূল (সাঃ) তা রেখেছেন। আশূরার রোযা তিনি বরাবর রাখতেন এবং মানুষকে তা রাখার জন্য বলতেন। সুন্নাত ছাড়া মু্স্তাহাবেরও তিনি ভীষন পাবন্দ ছিলেন। কুরবানীর পশু নিজ হাতে জবেহ করা মুস্তাহাব। শুধু এ কারণে তিনি তার নিজ কন্যাদেরকেও হুকুম দিতেন নিজ হাতে পশু জবেহ করার জন্য।

রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নির্দেশ ছিল কোন ব্যাক্তি যখন কারো বাড়িতে যাবে তখন ভিতরে প্রবেশ করার আগে যেন অনুমতি নেয়। যদি তিনবার অনুমতি চাওয়ার পরেও অনুমতি না পাওয়া যায় তাহলে সে যেন ফিরে আসে। একবার আবু মূসা গেলেন খলীফা উমারের (রাঃ) সাথে দেখা করতে। এক এক করে তিনবার তিনি অনুমতি চাইলেন, কিন্তু খলীফা অন্য কোন কাজে ব্যস্ত থাকায় সাড়া দিতে পারলেন না। আবু মূসা ফিরে আসলেন। অন্য এক সময় খলীফা জিজ্ঞেস করলেন, আবু মূসা ফিরে গেলে কেন? বললেন, আমি তিনবার অনুমতি চাওয়ার পরেও সাড়া পাইনি তাই ফিরে গেছি। এই কথার পর তিনি এ সম্পর্কিত রাসূলুল্লাহর (সাঃ) হাদীছটি বর্ণনা করে শুনালেন। উমার (রাঃ) বললেন, হাদীছটি তুমি ছাড়া অন্যকেউ শুনেছে এমন একজন সাক্ষী নিয়ে আসো। আবু মূসা ভয়ে কাঁপতে কাঁপেতে আনসারীদের এক মজলিসে উপস্থিত হলেন। সেখানে উপস্থিত উবাই বিন কাবও হাদীছটি শুনেছিলেন। তিনি উমারের (রাঃ) কাছে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দেন। 

শাবী বলেনঃ ছয়জনের নিকট থেকে ইলম গ্রহন করা হয়ঃ উমার (রাঃ), আলী (রাঃ), উবাই (রাঃ), ইবন মাসউদ (রাঃ), যায়িদ (রাঃ) ও আবু মূসা (রাঃ)।

খলীফা উমার (রাঃ) তাকে বসরার ওয়ালী নিযুক্ত করে পাঠালেন। বসরায় পৌঁছে তিনি সমবেত জনতার সামনে ভাষন দিতে গিয়ে বলেন 'আমীরুল মুমিনীন আমাকে আপনাদের কাছে পাঠিয়েছেন। আমি আপনাদেরকে আপনাদের রবের কিতাব ও তার নবীর সুন্নাত শিক্ষা দেব এবং আপনাদের পখ ঘাট সমূহ আপনাদের কল্যানের জন্য পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করবো।' ভাষণ শুনে জনতাতো অবাক! জনগনকে সংস্কৃতিবান করে তোলা, তাদেরকে দ্বীনের শিক্ষায় শিক্ষিত করাতো শাসকের দায়িত্বের আওতায় পড়তে পারে। কিন্তু তাদের পথ-ঘাটসমূহ পরিষ্কার করার দায়িত্ব তিনি কেমন করে পালন করতে পারেন? ব্যাপারটি তাদের কাছে ভীষন আশ্চর্য্যের মনে হলো। তাই হযরত হাসান (রাঃ) তার সম্পর্কে মন্তব্য করেছেনঃ 'তাঁর চেয়ে উত্তম আরোহী বসরাবাসীদের জন্য আর কেউ আসেনি।' [রিজালুন হালার রাসূল]। রাসূল (সাঃ) তাঁর সম্পর্কে বলতেনঃ 'আবু মূসা অশ্বারোহীদের নেতা।'

হযরত আবু মূসার সামনে উম্মাতের কল্যান চিন্তাটাই ছিল সবচেয়ে বড়। এজন্য সারাজীবন ব্যক্তিগত সব লাভ ও সুযোগের প্রতি পদাঘাত করেছেন। আলী (রাঃ) ও মুয়াবিয়ার মধ্যে যখন যুদ্ধ চলছে, তখন একদিন মুয়াবিয়া আবু মূসাকে বলেছেনঃ যদি তিনি মুয়াবিয়াকে সমর্থন করেন, তাহলে তাঁর দু'ছেলেকে যথাক্রমে বসরা ও কুফার ওয়ালী নিয়োগ করবেন এবং তাঁর সুযোগ-সুবিধার প্রতিও যত্নবান হবেন। জবাবে আবু মূসা লিখলেনঃ 'আপনি উম্মাতে মুহাম্মাদীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে লিখেছেন। যে জিনিস আপনি আমার সামনে পেশ করেছেন, তার প্রয়োজন আমার নেই।'

লজ্জা-শরম ঈমানের অঙ্গ। আবু মূসার মধ্যে এই উপাদানটি পরিপূর্ণরুপে ছিল। রাতে ঘুমানোর সময়ও বিশেষ ধরণের পোশাক পরে নিতেন, যাতে সতর উন্মুক্ত না হয়ে যায়। একবার কিছু লোককে তিনি দেখলেন, তারা পানির মধ্যে উলঙ্গ হয়ে গোসল করছে। তিনি বললেন, 'বার বার মরে জীবিত হওয়া আমার মনঃপূত তবুও একাজ আমার পছন্দ নয়।'

       লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ
   আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
(বইঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথাদ্বিতীয় খন্ড)

No comments:

Post a Comment