Thursday, January 31, 2019

গর্ব করার মত এক ইতিহাস !!

ওসমানীয় খেলাফত[১] চলছে তখন, ১৮৪৫ সাল। খলিফা প্রথম আব্দুল মাজিদ[২] ইস্তাম্বুলের মসনদে।

এসময়ে এসেও ইউরোপের অবস্থা খুব একটা সুবিধার ছিলনা। বিভিন্ন আর্থিক-সামাজিক সমস্যা বিপর্যস্ত ছিল অনেক ইউরোপীয় দেশ। আয়ারল্যান্ডে এসময় দেখা দেয় এক ভয়াবহ দূর্ভিক্ষ। ক্ষুদার বিধ্বংসী তরঙ্গ দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পড়ে আয়ারল্যান্ড দ্বীপটিতে।
The Star and crescent flag of the 
Ottoman Khilafah, a late 18th century 
design officially adopted in 1844
মহামারী টাইপের রোগও ছড়িয়ে পড়ে ইংল্যান্ডের প্রতিবেশী রাজ্যে, মারা যেতে থাকে হাজার হাজার আদম সন্তান। চারিদিকে শুধু ক্ষুদার্ত রোগাক্রান্ত মানুষের হাহাকার। এই দূর্ভিক্ষে প্রায় ১০ লাখ লোক মারা যায় এবং জীবন রক্ষার তাগিদে ও ভালো জীবনের অনুসন্ধানে অন্যান্য দেশে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ পালিয়ে যায়। আয়ারল্যান্ডের এই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ফলস্বরূপ আয়ারল্যান্ড দ্বীপটির জনসংখ্যা ১৮৪৫ থেকে ১৮৫২ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশের মত হ্রাস পায়।

আইরিশদের এই চরম দুর্দশাগ্রস্থ অবস্থায় বিশ্বের বেশীরভাগ দেশই তাদের পরিত্যাগ করে। ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ শক্তিধর লুটেরা দেশগুলো প্রহসনমূলক সাহায্য পাঠায়।[৩]

আয়ারল্যান্ডের এই দূর্দশা দেখে এগিয়ে আসেন খলিফা প্রথম আব্দুল মাজিদ।

Coat of arms of the Ottoman
Empire (1882 design)
তিনি জরুরীভাবে ১০ হাজার স্টার্লিং (sterling) (২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী ৮.০০ মিলিয়ন স্টার্লিং অথবা ১.৭ মিলিয়ন আমেরিকান ডলার) ও কিছু জাহাজ ভর্তি করে খাবার এবং ত্রাণ সাহায্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন আয়ারল্যান্ডবাসীর জন্য।

কিন্তু বাধ সাধে ইউরোপের মোড়ল ইংল্যান্ড। গোটা দুনিয়ায় লুণ্ঠন করে বেড়ানো ইংল্যান্ড নিজেদের অধিনস্ত রাজ্যকে এই দূর্যোগেও মাত্র ২০০০ স্টার্লিং এর বেশী সাহায্য দেয়নি সেখানে কেন মুসলিম খলিফা তার ৫ গুণ টাকা দিবে! এ তো ইংল্যান্ডের মান-ইজ্জতের ব্যাপার।

রানী ভিক্টোরিয়া ইস্তাম্বুলকে এই বলে সাবধান করে দেন যে, কেউ যেন আয়ারল্যান্ডকে রাণীর চেয়ে বেশি সাহায্য না দেয়। ইংল্যান্ডকে ডিংগিয়ে আয়ারল্যান্ডকে সাহায্য দিতে যাওয়াটা রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিকভাবে বিপদজনক হতে পারে। সাথে সাথে খলিফাকে এ পরামর্শও দেওয়া হয় যে, সে চাইলে রানী ভিক্টোরিয়ার প্রদানকৃত সাহায্যের অর্ধেক সমমূল্যের সাহায্য দিতে পারে।

Drogheda United Football Club
বাধ্য হয়ে খলিফা সাহায্যের পরিমাণ ১ হাজার স্টার্লিং এ নামিয়ে আনেন। এর পরেও এই অর্থের মূল্য ছিল ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী ৮,০০,০০০ (আট লক্ষ) স্টার্লিং অথবা ১,৭০,০০০ (এক লক্ষ সত্তর হাজার) মার্কিন ডলার।

খলিফা আব্দুল মাজিদ এতে সন্তুষ্ট হতে পারলেননা। বারবার মনে হচ্ছিল, তার এ অর্থে মৃত্যুর কূপে পড়ে যাওয়া মানুষগুলোর কিছুই হবেনা। তিনি গোপনে ৩টি অথবা ৫টি জাহাজ ভর্তি করে খাবার এবং ত্রাণ পাঠালেন আয়ারল্যান্ডের দিকে।

গোপনে বহু মাধ্যমে পাঠালেন নগদ অর্থ। মুসলিম ত্রানবহরকে বৃটিশ সৈন্যরা আটকে দিল ডাবলিন এবং বেলফাস্টের ঢোকার পথে। ওসমানীয় সৈন্যরা দমে না গিয়ে ফেরার পথে ডাবলিনের উত্তরে গোপনে ড্রগেডা নামের এক ছোট্ট শহরের পাশে নোংগর করে গোপনে ত্রান সামগ্রী সেই শহরের মেয়রের মাধ্যমে আয়ারল্যান্ডবাসীর কাছে পৌঁছে দেয়।[৪]

Drogheda Coat of Arms
ইউরোপের বাঘা বাঘা লুটেরা দেশ থাকতে মুসলিম এক শাসকের এই ভালবাসা আর সাহায্য অভিভূত করে আয়ারল্যান্ডের মানুষকে।

১৯৯৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ড্রগেডা শহরের মেয়র গডফ্রে খলিফা আব্দুল মজিদের এই সাহায্য এবং অকৃত্রিম বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করেন এবং তৎকালীন মুসলিম খেলাফতের সম্মানে একটি স্মৃতিফলক উদ্ধোধন করেন।

এখনো যদি সেই ড্রগেডা শহরে যান তো দেখবেন সেখানকার বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব ‘ড্রগেডা ফুটবল ক্লাব’ এর লোগোতে ওসমানীয় খেলাফতের প্রতি সম্মান জানানোর নিদর্শন হিসেবে মুসলমানদের প্রতীক অর্ধচন্দ্র বা হেলাল-সেতারা অংকিত আছে। এছাড়া ড্রগেডা কোর্ট অফ আর্মসের লোগোতেও অংকিত আছে মুসলিম খেলাফতের গৌরবান্বিত ইতিহাস।
--------------------------------------------------------------------------------------------------------
[১] ওসমানীয় খেলাফতের সময়কাল ১৫১৭-১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ।

[২] খলিফা প্রথম আব্দুল মাজিদ, জন্মঃ ২৩/২৫ এপ্রিল ১৮২৩, মৃত্যুঃ ২৫ জুন ১৮৬১। শাসনকালঃ ২ জুলাই ১৮৩৯-২৫ জুন ১৮৬১। তিনি ছিলেন ৩১ তম উসমানীয় খলিফা।

[৩] Queen Victoria donated £2,000. U.S. President James K. Polk donated $50 and Congressman Abraham Lincoln donated $10

Wikipedia Link: https://en.wikipedia.org/wiki/Great_Famine_(Ireland)

[৪] ২০০৭ সালে দ্যা ফাউন্টেইন ম্যাগাজিনের (The Fountain magazine) একটি নিবন্ধে আবদুল্লাহ আইমাজ (Abdullah Aymaz) উল্লেখ করেছিলেন যে ব্রিটিশ প্রশাসন উসমানীয় খলিফা কতৃক প্রেরিত তিনটি রসদ ভর্তি জাহাজকে বেলফাস্ট বা ডাবলিনের প্রবেশদ্বারগুলিতে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। তবে জাহাজগুলি গোপনভাবে ডাবলিনের প্রায় ৭০ মাইল উত্তরে ড্রগেডা শহরে পৌঁছে  ত্রান সামগ্রী শহরের কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেয়।

রেফারেন্স বুকস এবং ওয়েবপেজ লিংকসঃ

১. Charity and the Great Hunger in Ireland : The Kindness of Strangers;  Written by : Christine Kinealy (2013)

২. https://en.wikipedia.org/wiki/Abdulmejid_I

৩. https://www.irishcentral.com/roots/history/little-known-tale-of-generous-turkish-aid-to-the-irish-during-the-great-hunger

৪. https://web.archive.org/web/20131017094035/http://www.todayszaman.com/newsDetail_getNewsById.action?newsId=269871

৫. https://en.wikipedia.org/wiki/Ireland%E2%80%93Turkey_relations

সম্পাদনাঃ মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম।

Thursday, January 24, 2019

বাদশাহ ইবনে সউদের বিচার (স্বীকৃত এক জালেমের একটি ন্যায় বিচার)

খিলাফতের পবিত্র ও গৌরবউজ্জ্বল শাসনব্যবস্থা থেকে আরব ভূমিকে ছিনিয়ে নিয়ে যারা আরবে রাজতন্ত্র ও স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন তাদের মধ্যে সবচেয়ে সফল ব্যক্তি হলেন আবদুল আজিজ ইবনে সৌদ। জন্মঃ ১৫ জানুয়ারি ১৮৭৬ এবং মৃত্যুঃ ৯ নভেম্বর ১৯৫৩। আরব বিশ্বে তিনি সাধারণভাবে আবদুল আজিজ বা ইবনে সৌদ বলে পরিচিত। তিনি আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা ও সৌদি আরবের প্রথম বাদশাহ। এই ব্যক্তি আমৃত্যু খিলাফতের সবচেয়ে বড় দুশমন যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন।

ব্রিটিশদের দালালিতে এই ব্যক্তি এমন পরাকাষ্টা দেখিয়েছেলেন যে, তার প্রতিদন্ধী সকল দালালকে পরাজিত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি তার প্রধান প্রতিদন্ধী দালাল হুসাইন বিন আলীকে (জন্মঃ ১৮৫৪ এবং মৃত্যুঃ ৪ জুন, ১৯৩১) পরাজিত করতে সমর্থ হলে আরব ভূমিতে ব্রিটিশদের দালালিতে তার প্রতিধন্ধীর অবসান ঘটে। তিনি পরিপূর্ণভাবে ব্রিটিশদের সন্তুষ্টি অর্জন করে নিতে সক্ষম হন।

১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ইবনে সৌদ তার শাসনাধীন অঞ্চলগুলোকে সৌদি আরব হিসেবে একীভূত করেন এবং নিজেকে এর বাদশাহ ঘোষণা করেন। আল সৌদ বংশের নাম অনুসারে দেশের নতুন নাম রাখা হয় “Kingdom of Saudi Arabia” (কিংডম অব সৌদি এরাবিয়া)।

এই স্বীকৃত জালেম ব্যক্তিও তার শাসনামলে জনগণের প্রতি কিছু ইনছাপূর্ণ বিচার করেছিলেন।

এক দিনের ঘটনা।

ইবনে সউদ তাঁর দরবারে বসেছিলেন। স্থানীয় শেখ ও গোত্র সর্দারেরা তাঁর চারদিকে ঘিরে বসেছিল। এ সময় একজন মহিলা এসে নালিশ করল, তার প্রতিবেশীর গরু তার বাগানে ঢুকে বাগানের সবটা ক্লোভার গাছ খেয়ে ফেলেছে।

ইবনে সউদ মহিলার প্রতিবেশীকে দরবারে হাজির করার পর তাকে জিজ্ঞাসা করা হলে সে শপথ করে অভিযোগ অস্বীকার করল। অবশেষে ইবনে সউদ কসাইকে নির্দেশ দিলেন গরু জবাই করে পেট ফাঁড়ার জন্যে। গরুর পেট ফেঁড়ে গরুর পেটে ক্লোভার গাছ পাওয়া গেল।

ইবনে সউদের রায়ে মহিলার প্রতিবেশী দোষী সাব্যস্ত হলো। রায় অনুসারে তাকে মহিলার ক্লোভার গাছের পুরো ক্ষতিপূরণ দিতে হলো এবং মিথ্যা শপথ করার জন্য দিতে হলো বিরাট রকমের জরিমানা।

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-দ্বিতীয় খন্ড)

সম্পাদনাঃ মুহাম্মাদ সাইফুল ইসলাম।

Monday, January 7, 2019

শেষ রক্তবিন্দুর লড়াই

১৭৯৯ সালের ৪ঠা মে। ইংরেজ, নিজাম ও মারাঠার মিলিত বাহিনী শ্রীরঙ্গপত্তমে বীর টিপুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। টিপু ও টিপু সুলতানের ছোট্ট বাহিনী নির্ভীকভাবে তাদের মুকাবিলা করলো। নিহত হলো অনেক শত্রু সৈন্য। কিন্তু শত্রুর বিশাল বাহিনীর প্রবল চাপে ভেঙে পড়ল দুর্গের সিংহদ্বার।

ক্ষুদ্র বাহিনী সাথে নিয়ে টিপু সুলতান দুর্গদ্বার রক্ষার জন্যে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন। গুলীর অবিরাম বৃষ্টি তাদের ভয় দেখাতে পারল না। অকস্মাৎ একটা গুলী এসে টিপুর বাম পাশে বিদ্ধ হলো। কিন্তু তিনি স্থান ত্যাগ করলেন না, তাঁর কোন সৈন্যও নয়।

টিপুর সৈন্যের মৃতদেহের স্তুপ দুর্গের দ্বার প্রায় বন্ধ করে দিল। এ সময় আরেকটি গুলি টিপু সুলতানের বাম বুক বিদ্ধ করল। অজস্র রক্তপাতে সিংহদিল টিপু লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে। কিন্তু অস্ত্র তিনি ত্যাগ করেন নি। একজন ইংরেজ তাঁর স্বর্ণ নির্মিত তরবারির বাঁটের জন্যে অগ্রসর হলো। টিপু বাম বাহুর উপর ভর করে মাথাটা তুলে এক আঘাতে তাকে শেষ করে দিলেন। আরও একজন ছুটে এলো তাঁর দিকে। তাকেও তিনি শেষ করলেন। আরেকটি গুলী এসে এ সময় তাঁর কপালে বিদ্ধ হলো।

শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন টিপু। তাঁর মুখে কোন ভয়, দুশ্চিন্তা কিংবা উদ্বেগের ছাপ ছিল না, ছিল তাতে অসাধারণ এক প্রশান্তি ও দৃঢ়তার ছাপ। যেন প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছেন তিনি।

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-দ্বিতীয় খন্ড)

জাভার রাজপুত্র হাজী পুরওয়া

জাভার পশ্চিম প্রান্তে পাজাজারান নামে একটি রাজ্য।

দ্বাদশ শতকের শেষ দিকে সেখানে এক রাজা ছিলেন। রাজার ছিল দুই ছেলে। বড় ছেলে ব্যবসায়ে আত্মনিয়োগ করেছিলেন এবং ব্যবসায় উপলক্ষে তিনি ভারতে যান। এই সময় রাজার মৃত্যু হলে ছোট ছেলে সিংহাসনে আরোহণ করেন।

রাজার বড় ছেলে তাঁর বাণিজ্য সফরের এক পর্যায়ে কিছু আরব বণিকের দেখা পান এবং তাদের কাছে ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর নতুন নাম হাজী পুরওয়া। পরে রাজপুত্র হাজী পুরওয়া একজন আরব ধর্ম প্রচারকসহ দেশে ফিরে গেলেন এবং রাজা ও রাজ পরিবারকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা ইসলাম গ্রহণে অস্বীকার করল এবং হাজী পুরওয়াকে হত্যার ষড়যন্ত্র করল।

ভাই এবং অন্যান্যের এই ষড়যন্ত্রের মুখে রাজপুত্র হাজী পুরওয়া জঙ্গলে আশ্রয় নিলেন। তারপর কেউ আর তাঁর সন্ধান পায়নি। কিন্তু তাঁর চেষ্টা বৃথা যায়নি, গোটা জাভাই পরে ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নেয়।

হাজী পুরওয়া রাজা ও রাজ পরিবারকে ইসলাম গ্রহণ করাতে পারেননি, কিন্তু জঙ্গলে গিয়ে জনগণের কাতারে শামিল হয়ে গোটা দেশকেই ইসলাম গ্রহণ করিয়েছেন।

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-দ্বিতীয় খন্ড)

আওরঙ্গজেব নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে সন্তানকে কারাগারে পাঠালেন

বাদশাহ আওরঙ্গজেব যে কত বড় ন্যায়বিচারক ছিলেন, তাঁর ৫০ বছর রাজত্ত্বকালের হাজার হাজার ন্যায়বিচারের ঘটনা থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি বলতেন, বিচার ক্ষেত্রে শাহজাদাদেরকেও আমি সাধারণ লোকের পর্যায়ভুক্ত মনে করি। বাদশাহ আওরঙ্গজেব ১০৮২ হিজরী সনে এক আদেশ জারি করেন, জিলায় জিলায় প্রতিনিধি নিযুক্ত করে জনসাধারণকে জানিয়ে দেয়া হোক যে, বাদশাহর বিরুদ্ধে যদি কারো কোন অভিযোগ থাকে তাহলে নির্ভয়ে তা পেশ করতে পারবে। সরকারী প্রতিনিধি সে সব অভিযোগের কৈফিয়ত প্রদান করবে। অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে অভিযোগকারী তার অধিকার ফিরে পাবে। বাদশাহ সরাসরি দায়ী হলে বাদশাহ নিজেই তার প্রতিকার করবেন।

মির্জা কামবখশ আলমগীরের অত্যন্ত স্নেহপরায়ণ পুত্র ছিলেন। তাঁর দুধ ভাইয়ের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আরোপিত হয়।

আলমগীর আদেশ দিলেন যে, বিচারালয়ে এর তথ্যানুসন্ধান করা হোক। তদন্তের নিরপেক্ষতা যাতে কোনভাবেই নষ্ট না হয়, কোন সুপারিশ যেন গ্রাহ্য করা না হয়, সুপারিশকারী যদি বাদশাহর সন্তানও হয়। কিন্তু কামবখশ তার দুধ ভাইয়ের পক্ষে দাঁড়ালেন। আলমগীর কামবখশকে দরবারে ডাকলেন। কামবখশ দুধ ভাইকে সঙ্গে নিয়ে আসলেন।

আলমগীর নিজ সন্তানকে গ্রেফতার করে তদন্ত কমিটিকে বললেন, ‘এবার নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে পারবে।

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-দ্বিতীয় খন্ড)

মুজাদ্দিদের মাথা মানুষ-সম্রাটের কাছে নত হলোনা

মোগল আমল।

সম্রাট আকবরের ছেলে জাহাঙ্গীর তখন মোগল সাম্রাজ্যের প্রতাপশালী সম্রাট।

একদা তিনি শায়খ আহমদ সরহিন্দীকে দরবারে ডেকে পাঠালেন। শায়খ আহমদ ছিলেন ইসলামী আন্দোলনের এক অকুতোভয় কর্মী পুরুষ। জাহাঙ্গীরের দরবারে এ রেওয়াজ ছিল যে, কোন ব্যক্তি দরবারে আগমন করলে প্রথমে বাদশাহকে কুর্নিশ করতে হতো।

বাদশাহ আশা করেছিলেন শায়খ আহমদ তাই করবেন। কিন্তু তিনি দরবারে প্রবেশ করে ইসলামী বিধান অনুযায়ী সালাম করলেন।

বাদশাহ রাগান্বিত হয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনার সাহস তো কম নয়আপনি কেন দরবারের বিধি লংঘন করলেন? কেন সম্মান সূচক কুর্নিশ করেননি?’

জবাবে শায়খ আহমদ বললেন, ‘হে সম্রাট! যে মস্তক প্রত্যহ কমপক্ষে পাঁচবার সম্রাটের সম্রাট রাব্বুল আলামীনের সামনে নত হয়, সে মাথা দুনিয়ার কোন মানুষের সামনে নত হতে পারে না, তিনি যত বড় শক্তিধরই হোন না কেন।

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-দ্বিতীয় খন্ড)

বাবরের আমানতদারী

ভারতে মোগল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বাবর। মধ্য এশিয়ার ফারগানা রাজ্যের শাসন কর্তার তিনি ছেলে। পরে তিনি ফারগানার শাসনকর্তা হন। বহু উত্থান-পতনে ভরা ছিল তাঁর জীবন। সবকিছু ছাপিয়ে তাঁর চরিত্র ছিল হিরকের মত উজ্জ্বল। তাঁর সততা, মানবিকতা ছিল কিংবদন্তির মত মানুষের মুখে মুখে।

বাবর যখন ফারগানার শাসনকর্তা, তখন একটি বানিজ্য কাফিলার মালিক ইন্দিজান পাহাড় এলাকায় বজ্রপাতে মারা যায়। বাবর এ কাফিলার সমস্ত সম্পদ সংগ্রহ করতে এবং মালিকের উত্তরাধিকারীদের কাছে ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেন।

দু'বছর পর এ উত্তরাধিকারীরা আসে এবং সমস্ত জিনিস ফেরত পায়। বাবরকে তারা উপঢৌকন দিতে চায়। কিন্তু বাবর শুধু প্রত্যাখ্যানই করেননি উপরন্তু তাদের আসা-যাওয়ার সব খরচ বহন করেন।

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-দ্বিতীয় খন্ড)

আল-বিরুনীর জ্ঞান পিপাসা

জ্ঞানানুসন্ধিৎসু আল-বিরুনীর মৃত্যুকালীন অবস্থা সম্পর্কে ফকিহ আবুল হাসান বলেনঃ

যখন আমি তাঁর শয্যাপাশে গেলাম, তখন দেখলাম তিনি শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। তিনি আমাকে দেখে বললেন, “একদিন আপনি আমাকে নানীর সম্পত্তির অংশ ভাগ সম্পর্কে বলেছিলেন। আপনি কি অনুগ্রহ করে সে কথা বলবেন যাতে আমি তা আবার স্মরণ করতে পারি।

আমি বললাম, “আপনার এই অবস্থায় সেই আলোচনা আমি কিভাবে তুলি?”

তিনি বললেন, “এ বিষয়টি না জেনে পৃথিবী থেকে যাওয়ার চেয়ে জেনে যাওয়াই ভাল।

আমি সেই ভাগ-বণ্টনের ফর্মুলা বললাম। আল-বিরুনী তা মুখস্থ করে আমাকে শুনালেন তাঁর ভুল শুধরাবার জন্যে।

এরপর তাঁর শয্যাপাশ থেকে চলে এলাম। রাস্তায় পা দেবার আগেই শুনতে পেলাম সেই জ্ঞানতাপস আর দুনিয়াতে নেই।

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-দ্বিতীয় খন্ড)

বসন্তের যিনি স্রষ্টা তার সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে দেখ

আল্লাহর ধ্যানে সর্বদা মশগুল থাকতেন তাপসী রাবেয়া বসরী। সকল সৃষ্টির স্রষ্টা, সব সৌন্দর্যের উৎস পরম প্রভু আল্লাহই ছিল তাঁর ধ্যান-জ্ঞান।

বসরায় সেদিন বসন্তের সকাল। বসরার বিখ্যাত গোলাপ বাগানগুলো ফুলসম্ভারে পূর্ণ। বাতাস সে ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে চারদিক মোহিত করছিল। পাখি গান গাইছিল। বুলবুলি গুলো যেন ফিসফিস করে গোলাপের প্রতি তাদের ভালবাসা প্রকাশ করছিল। চারদিকটা বসন্তের নতুন প্রাণচাঞ্চল্যে নেচে উঠছিল।

পরিচারিকা তাপসী রাবেয়াকে গিয়ে বললো, বাইরে আসুন। দেখুন, বসন্তে প্রকৃতি কি অপূর্ব রূপ সম্ভারে সেজেছে। রাবেয়া তাঁর নামাযের ঘর থেকে বললেন, ‘বাইরের দুনিয়া স্বতঃ পরিবর্তনশীল। রূপবৈচিত্র্য আর কি দেখব, তুমি আস এবং একবার বসন্তের যিনি স্রষ্টা তাঁর অকল্পনীয় সৌন্দর্যের দিকে তাকিয়ে দেখ।

পরম প্রভুর পরম সৌন্দর্য যাঁরা উপলদ্ধি করেন, দুনিয়ার কোন সৌন্দর্যই তাঁদের কাছে সৌন্দর্য নয়।

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-দ্বিতীয় খন্ড)

সাক্ষী হওয়ার যোগ্যতা

কাযী আবু জাফর বিন আব্দুল ওয়াহিদ হাশমী বর্ণনা করেছেনঃ একদিন কাযী আবু উমার রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন। পথে মদের পাত্র ভেঙ্গে প্রচুর মদ ছড়িয়ে থাকার দৃশ্য তাঁর চোখে পড়ল। একজন প্রত্যক্ষদর্শী যিনি কাযীর সাথে হাঁটছিলেন তিনি বললেন, ‘এভাবে মদ ছড়িয়ে উৎকট গন্ধ ছড়ায়।কাযী শুনলেন কিছুই বললেন না। কিন্তু একদিন ঐ লোক সাক্ষী হয়ে তাঁর আদালতে আসল কোন এক ব্যাপারে, কাযী তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করলেন। সাক্ষী লোকটি খুব ভীত হয়ে পড়ল। সে অন্য লোকের দ্বারা জানতে চাইলো এর কারণ কি?

কারণ হিসেবে কাযী সে দিনের ঘটনার উল্লেখ করে বললেন, ‘মদ ইসলামে হারাম। এর গন্ধ খারাপ কিংবা ভাল তা বিবেচ্য বিষয় নয়। কিন্তু সে এ বিষয়টাকে বিবেচ্য বিষয়ে পরিণত করেছে। সুতরাং হয় সে প্রবঞ্চনা করছে অথবা মিথ্যা বলছে কিংবা সে কিছুই বুঝে না অজ্ঞ। সুতরাং আমি তার সাক্ষ্য গ্রহণ করতে পারি না।

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-দ্বিতীয় খন্ড)

অভিযোগের ব্যান্ডেজ আছে, কৃতজ্ঞতার ব্যান্ডেজ কই?

আল্লাহর পথে, আল্লাহর জন্যে সব যাঁরা বিলিয়ে দেন, বিলিয়ে দেন নিজের সুখ-সম্ভোগ সব, হযরত রাবেয়া বসরী এমনি একজন মহিলা। মানুষ আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের অফুরন্ত নিয়ামত ভোগ করে, খুব কমই তার জন্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে। অথচ সামান্য দুঃখ-কষ্টে তাদের হা-হুতাশের অন্ত থাকে না।

এই কথাটাই তাপসী রাবেয়া বসরী কত সুন্দর ভাবে বললেন।

একদা মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা একজন লোক রাবেয়া বসরীর কাছে এলেন। তারপর এভাবে দুজনের মধ্যে কথা শুরু হলোঃ

রাবেয়াঃ মাথায় ব্যান্ডেজ কেন?

আগন্তুকঃ গত রাত থেকে আমার ভীষণ মাথাব্যথা।

রাবেয়াঃ আপনার বয়স কত?

আগন্তুকঃ ৩০ বছর।

রাবেয়াঃ জীবনের অধিকাংশ সময় কি আপনার কষ্ট ও বেদনায় কেটেছে?

আগন্তুকঃ না।

রাবেয়াঃ 'ত্রিশ বছর ধরে আল্লাহ আপনার দেহকে সুস্থ রেখেছেন, কিন্তু এর জন্যে কোন কৃতজ্ঞতার ব্যান্ডেজ আপনি ধারণ করেননি। আর মাথায় এক রাতের বেদনাতে আপনি অভিযোগের ব্যান্ডেজ ধারণ করলেন?'

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-দ্বিতীয় খন্ড)

অভাববোধ করলে আল্লাহকেই বলব

তাপসী রাবেয়া বসরী ছিলেন পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট হৃদয়। তাঁর এ সন্তুষ্ট হৃদয়ে কোন অভাব বোধ ছিল না, তাই ছিলনা কোন অভিযোগও। চাইবারও ছিলনা কারও কাছে কিছু তাঁর।

হযরত রাবেয়াকে অনেক সময়ই ছিন্ন বসনে দেখা যেত। একদিন বসরার একজন অভিজাত লোকের এটা হৃদয় স্পর্শ করল। সে বলল, ‘মা, যদি আপনি অনুমতি দেন, তাহলে অনেকেই আছে যারা আপনার সকল অভাব দূর করতে কৃতজ্ঞ বোধ করবে।

রাবেয়া উত্তরে বললেন, ‘হে আমার পুত্র, বাইরের লোকের কাছে আমার অভাবের কথা বলতে লজ্জাবোধ করি। সমগ্র দুনিয়ার মালিক আল্লাহ। যদি আমি অভাব বোধ করি, তাহলে এটা দূর করার জন্য আল্লাহকেই আমি বলবো।

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-দ্বিতীয় খন্ড)

এক রাজা, এক রাজ্যের ইসলাম গ্রহণ

১৫০১ খ্রিস্টাব্দ। শেখ আবদুল্লাহ নামে একজন আরব ধর্ম প্রচারক মালয় উপদ্বীপের সর্ব উত্তর কুয়েদায় আসলেন। শেখ কুয়েদার রাজার সাথে দেখা করতে চাইলেন। সাক্ষাতের ব্যবস্থা হলো। তারপর দু'জনের মধ্যে নিম্নোক্ত কথোপকথন হলোঃ

আবদুল্লাহঃ আপনার দেশের ধর্ম কি?

রাজাঃ পূর্ব পুরুষের কাছ থেকে যা আমরা পেয়েছি সেটাই আমাদের ধর্ম। আপনার ধর্ম কি?

আবদুল্লাহঃ আমাদের ধর্ম স্বয়ং আল্লাহর কাছ থেকে তাঁর রাসূলের (সাঃ) মাধ্যমে আমাদের কাছে এসেছে।

রাজাঃ স্বয়ং আল্লাহর কাছ থেকে? ঐ ধর্মের নাম কি?

আবদুল্লাহঃ এর নাম ইসলাম। আমরা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (সাঃ) এর মাধ্যমে এই ধর্ম পেয়েছি। সর্ব ধর্মের উপরে এটা বিজয়ী হয়েছে।

রাজাঃ তাহলে ঐ ধর্ম সম্পর্কে আমাকে কিছু বলুন।

শেখ আবদুল্লাহ ইসলামের শিক্ষা ও সৌন্দর্যের কিছু বিবরণ দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে রাজা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন। তাঁর সাথে সাথে অন্যান্য সভাসদ এবং প্রজারাও ইসলামে দীক্ষিত হলো।

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-দ্বিতীয় খন্ড)

সুলতান বাহমানীর উচিত শিক্ষা

দক্ষিণ ভারতের বাহমানী রাজ্যের সুলতান আলাউদ্দিন শাহ বাহমানী (দ্বিতীয়) একজন বাগ্মী লোক ছিলেন। মাঝে মাঝে তিনি মসজিদে খুতবা দিতেন এবং বলতেন তিনি সংযমী, ন্যায়পরায়ণ, উদার ও দয়ালু রাষ্ট্রনায়ক।

একজন আরবীয় বণিক শাহ বাহমানীর কাছে একটি ঘোড়া বিক্রয় করেছিলেন, কিন্তু দাম তখনও পাননি। শাহ বাহমানীর খুতবা দেয়ার সময় একদিন তিনি মসজিদে হাযির ছিলেন এবং রাজা যে নিজের প্রশস্তি গাইছিলেন তা শুনছিলেন। এসব কথা শুনে তার প্রতি দুর্ব্যবহার এবং নিরপরাধ সাইয়েদদের সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের কথা তার মনে পড়ে গেল। তিনি চিৎকার করে উঠলেন এই বলে- আপনি না ন্যায়পরায়ণ, না দয়ালু, না ধৈর্যশীল, না উদার; বরং আপনি সত্যিকার মুমিনের জন্য নির্দিষ্ট মসজিদের মিম্বর থেকে বাগাড়ম্বর প্রকাশের সাহস করছেন।

শাহ বাহমানী তৎক্ষণাৎ ঐ বণিকের ঘোড়ার দাম ঐখানেই দিয়ে দিতে বললেন এবং তিনি প্রাসাদে চলে গেলেন। এরপর তিনি আর মসজিদের মিম্বরে উঠেননি।

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-দ্বিতীয় খন্ড)

বাদশাহর পরিচারিকা রাখার সংগতি নেই

দিল্লীর বাদশাহ নাসির উদ্দিন। বাদশাহ আলতামাশের পুত্র তিনি। বাদশাহর পুত্র হলেও স্বহস্তে পুস্তক নকল করে তার বিক্রয়লব্ধ অর্থ দিয়ে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। দিল্লীর সিংহাসনে আরোহণের পরও তিনি এভাবেই নিজ পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতেন।

তাঁর বেগম নিজ হাতে রান্না-বান্নাসহ সংসারের যাবতীয় কাজ করতেন। একদিন রুটি সেকবার সময় বাদশাহর বেগমের হাত পুড়ে গেল।

বেগম এসে বললেন, ‘বাদশাহ, একলা আর পেরে উঠিনে, একজন পরিচারিকার ব্যবস্থা করে দিন।’ 

বাদশাহর চক্ষে দেখা দিল অশ্রু। তিনি বললেন, ‘পরিচারিকা রাখার সংগতি আমার নেই। ধৈর্য ধরে কাজ করে যাও বেগম, আল্লাহ তার পুরস্কার দেবেন। দাসী রাখা অসম্ভব। রাজকোষ জনসাধারণেরআমি তার রক্ষক মাত্র। অনাবশ্যক ব্যয় বৃদ্ধি দ্বারা রাজ্যের ব্যয়ভার বৃদ্ধি করতে আমি পারবো না

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-দ্বিতীয় খন্ড)

পরিচারিকার কথায় কাঁপতে লাগলেন রাজা ইবরাহীম আদহাম

বলখের রাজা ইবরাহীম আদহাম একদিন পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে শিকারে গেলেন। সেই সময়ে রাজ প্রাসাদের এক দাসী বালিকা তার শয়নকক্ষে এলো এবং দেখল বেগম বাইরে গেছেন। রাজকক্ষের বহুমূল্য আসবাবপত্র, সুশোভিত বিছানা, আতরদানি থেকে আসা মনোহর সুগন্ধ সব মিলে দাসী-বালিকাকে আত্মহারা করে তুলল। সে ভুলে গেল নিজের অবস্থার কথা। তার লোভ হলো সে বিছানায় একটু শয়নের। সে সন্তর্পণে সেই রাজকীয় বিছানায় শুয়ে পড়ল এবং ঘুমিয়ে গেল।

ঘুমন্ত অবস্থায়ই তাকে ঐ রাজকীয় বিছানায় পাওয়া গেল। ইবরাহীম আদহাম শিকার থেকে ফেরার সাথে সাথেই এই গুরুতর ব্যাপারটা তাঁকে জানানো হলো। শুনে রাজা ভয়ানক ক্ষিপ্ত হলেন। একজন দাসী বালিকা তাঁর রাজ-বিছানা স্পর্শ করেছে এত বড় ঔদ্ধত্য।

ক্রুদ্ধ রাজা ইবরাহীম আদহাম নির্দেশ দিলেন, দাসী বালিকাটিকে ৫০টি বেত্রাঘাত করা হোক। যখন তাঁর আদেশ প্রতিপালিত হলো, তখন রাজা বললেন, ‘হে বালিকা, তুমি তোমার কৃতকর্মের জন্য নিশ্চয় দুঃখবোধ করছ?’

বালিকাটি উত্তর দিল, ‘হ্যা, মহামান্য রাজা। কিন্তু আমি আমার নিজের অবস্থার চেয়ে আপনার জন্যেই বেশি দুঃখবোধ করছি।

রাজা সরবে বললেন, ‘কেন এই অমূলক চিন্তা করছ?’

বালিকা বলল, ‘কারণ এক ঘণ্টা আপনার বিছানায় শোয়ার জন্যে যদি আমার এই শাস্তি হয়ে থাকে, তাহলে বছরের পর বছর ঐখানে শোয়ার জন্যে আপনার কেমন শাস্তি হবে, তা ভেবে আমি দুঃখবোধ করছি।’ 

বালিকার এই কথা যেন রাজার উপর বিনা মেঘে বজ্রপাত ঘটাল। তিনি হতবাক হয়ে গেলেন। তাঁর মুখের চেহারা বদলে গেল। তিনি দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে কাঁপতে কাঁপতে তাঁর পরিচারকদের বললেন, ‘এই বালিকাকে নিয়ে যাও, তার ভালভাবে চিকিৎসা কর। আমাকে একাকী থাকতে দাও।

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-দ্বিতীয় খন্ড)

সুলতান মালিক শাহের প্রার্থনা

আফগানিস্তান, পারস্যসহ মধ্য এশিয়ার বিশাল অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত সেলজুক সুলতানদের শাসন।

১০৭২ সাল।

সেলজুক বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সুলতান মালিক শাহ তখন ক্ষমতায়। ছোট ভাইয়ের সাথে বিরোধ চলছিল মালিক শাহের। সিংহাসনের দাবী করে বিদ্রোহ করেছিল তাঁর ছোট ভাই।

সে সময়ের একটি ঘটনা।

সেলজুক সুলতান মালিক শাহ একদিন তাউস এর একটা মসজিদ পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। মসজিদ থেকে বের হবার পথে তিনি প্রধান উজির নিজামুল মুলককে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি মসজিদে যে দোয়া করেছেন সেটা কি?’

নিজামুল মুলক বললেন, ‘আমি দোয়া করেছি আল্লাহ যাতে আপনাকে আপনার ভাইয়ের উপর বিজয় দান করেন।

মালিক শাহ বললেন, ‘আর আমি কি দোয়া করেছি জানেন?’

জিজ্ঞেস করার পর তিনিই উত্তরে বললেন, ‘আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে আমি এটুকুই বলেছি, হে আল্লাহ, জনগণের জন্য যার শাসন মঙ্গলকর হবে, তাকেই আপনি শাসন ক্ষমতা দান করুন।

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-দ্বিতীয় খন্ড)