১৫১৭ সাল। স্পেনে
মুসলমানদের শেষ আশ্রয়স্থল গ্রানাডার পতনের (১৪৯২) ২৫
বছর পরের ঘটনা। গোটা স্পেন খৃস্টানদের পদানত। সম্রাট পঞ্চম চার্লস এবং তার
পুত্র ফিলিপের লোমহর্ষক অত্যাচারে লক্ষ লক্ষ মুসলমান ধর্মান্তরিত অথবা স্পেন
থেকে বিতাড়িত। উত্তর আফ্রিকার মুসলিম শক্তিও বিধ্বস্ত। সেখানেও চলছে
স্পেন রাজের হুকুম।
আলজিয়ার্স সহ
উপকূলীয় মুসলিম বন্দরগুলোতে মেরামতের অভাবে মুসলিম রণপতগুলো পচে খসেই শেষ
হয়ে যাচ্ছে। স্পেনের বিতাড়িত মুর মুসলমানরা বাঁচার প্রাণান্তরকর সংগ্রামে রত।
ভূমধ্য সাগরের যাযাবর
সেনাপতি উরুজ বারবারোসা তাদেরই একজন। ঐতিহাসিক মরণগান তাকেঁ অভিহিত করেছেন সে যুগের
সর্বশ্রেষ্ঠ সেনাধ্যক্ষ হিসাবে। খৃস্টান ইউরোপ তাকেঁ বলেছে ভূমধ্য
সাগরের বোম্টেটে জলদস্যু।
আর ঐতিহাসিক
লেনপুন বলেছেন আত্মীয় স্বজন ও স্বজাতির পৈশাচিক হত্যালীলার প্রতিশোধ
নেবার জন্য খৃস্টানদের বিরুদ্ধে তিনি এক পবিত্র যুদ্ধে রত।
সেই ১৫১৭ সাল। উরুজ
বার্বারোসা তখন আলজিরিয়ার তিলিসমানে অবস্থান করছেন।
সাথে মাত্র ১৫০০
তুর্কী ও মূর সৈন্য। পার্শ্ববর্তী ওরানের খৃস্টান শাসনকর্তা মার্কোয়েস ডি কোমারেসের আকুল
আবেদনে স্পেন সম্রাট পঞ্চম চার্লসের প্রেরিত সৈন্য উরুজের বিরুদ্ধে ছুটে
আসছে।
চেষ্টা করেও
সাহায্যের কোন উৎস তিনি কোথাও থেকে বের করতে পারলেন না। সামনে রয়েছে ডি
কোমারেসের বিরাট বাহিনী। অগ্রসর হওয়া যায়না। সুতরাং পিছু হটে আলজির্য়াস
ফেরাই যুক্তিযুক্ত
মনে করলেন উরুজ। শত্রুপক্ষের চোখ এড়াবার জন্য একদিন রাত্রিযোগে তিনি
আলজির্য়াস যাত্রা করলেন। কিন্তু তাঁর চেষ্টা ব্যর্থ হলো।
কোমারেসের নেতৃত্বে
সম্মিলিত শত্রু বাহিনী ছুটে এল। উরুজের চলার পথে সামনেই রয়েছে এক নদী। উরুজ নিশ্চিত, একবার নদী পার হতে পারলেই শত্রুপক্ষ আর তাঁদের
নাগাল পাবে না।
লোভী স্পেনীয়দের যাতে
বিলম্ব হয় সেজন্য উরুজ তাঁর স্বর্ণ ও অর্থ সম্পদ রাস্তাময়
ছড়িয়ে আসতে লাগলেন। কিন্তু খৃস্টান বাহিনী এবার দুর্জয়, অপ্রতিরোধ্য উরুজকে হাতে পাবার নেশায়
পাগল হয়ে উঠেছে। তারা মণিমানিক্য পদদলিত করে ছুটে চলে এল
উরুজের পেছনে। উরুজ তাঁর অর্ধেক সৈন্য সহ নদী পার হয়েছেন।
ইতোমধ্যে খৃস্টান
বহিনী এসে পড়ল নদীর তীরে। নদীর ওপারে উরুজের অবশিষ্ট সৈন্য
আক্রান্ত হলো। উরুজ ফিরে দাঁড়ালেন। নদীর এপার থেকে নদীর ওপারে নিজ সাথীদের
আক্রান্ত হবার দৃশ্য দেখলেন।
ইচ্ছা করলে উরুজ তাঁর
অর্ধেক সৈন্য নিয়ে নিরাপদে আলজির্য়াস ফিরে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না।
তিনি এপারের সাথীদের
বললেন, আমার
একটি মুসলিম ভাইকেও খৃস্টানদের হাতে রেখে আমি ফিরে যেতে পারি না। এই বলে আবার
তিনি লাফিয়ে পড়লেন নদীতে।
তাঁকে অনুসরণ করল
তাঁর প্রতিটি সৈনিকই। ওপারে উঠে তিনি তার ক্ষুদ্র বাহিনী সংগঠিত করে শত্রুসাগরে
ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
উরুজের প্রতিটি সৈনিক
শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শত্রু হনন করে শাহাদাত বরণ করলেন।
ইতিহাস বলে, একটি মুসলিম সৈনিকও সেদিন যুদ্ধ ক্ষেত্র
থেকে পালিয়ে যায়নি।
সিংহের মত যুদ্ধ করে
উরুজ তাঁর ১৫০০ সাথী সমেত যুদ্ধ ক্ষেত্রে শাহাদাত বরণ করলেন।
একটি যুদ্ধে একটি
গোটা বাহিনী নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবার এমন দৃষ্টান্ত পৃথিবীর সমগ্র ইতিহাসে আর নেই।
লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-প্রথম খন্ড)
No comments:
Post a Comment