Sunday, June 23, 2019

যূ-শিমালাইন উমাইর ইবন আবদি আমর (রাঃ)

আসল নাম উমাইর, ডাক নাম আবু মুহাম্মাদ, লকব বা উপাধি যূ -শিমালাইন। পিতার নাম আবদু আমর। খুযায়া গোত্রের সন্তান। তিনি সকল কাজ দু হাত দিয়ে করতেন বলে যূ-শিমালাইন দুখানি দক্ষিণ হস্তের অধিকারী তার উপাধিতে পরিণত হন। 

তার পিতা আবদু আমর ইবন নাদলা মক্কায় এসে আবদ ইবন হারেস ইবন নাদলা ইবন যাহবার সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে স্থায়ীভাবে থেকে যান। আবদ নিজ কন্যা নুম বিনতু আবদকে তার সাথে বিয়ে দেন। তারই গর্ভে পুত্র যূ-শিমালাইন ও কন্যা রায়তা জন্ম গ্রহণ করেন। (তাবাকাত ইবন সাদ-৩/১৬৭)।

উল্লেখ্য যে, সীরাত গ্রন্থ সমূহে যূ-শিমালাইন অর্থাৎ দুখানি ডান হাতের অধিকারী এবং যুল ইয়াদাইন বা দুখানি হাতের অধিকারী এ দুটি লকব বা উপাধি বিশিষ্ট ব্যক্তি বা ব্যক্তিদ্বয়ের কথা পাওয়া যায়। এ দুটি উপাধি কি একই ব্যক্তির না ভিন্ন দু ব্যক্তির এ সম্পর্কে সীরাত বিশেষজ্ঞদের মতের অমিল দেখা যায়। অধিকাংশের মতে উপাধি দুটি একই ব্যক্তির যেমনঃ ইবন সা’দ তার তাবাকাতে শিরোনাম দিয়েছেন- যূল ইয়াদাইন ওয়া ইউকালু যূ-আশ-শিমালাইন অর্থাত যূল-ইয়াদাইন এবং তাকেই যূ-আশ-শিমালাইন বলা হয়। (তাবাকাত-৩/১৬৭)।

কিন্তু তাদের এ মত অনেকের নিকট গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের মতে মূলতঃ তারা ভিন্ন দু ব্যক্তি। হাদীসের দ্বারাও এর প্রমাণ পাওয়া যায়। যূল-ইয়াদাইন নামক ব্যক্তির একটি ঘটনা বুখারী ও মুসলিম শরীফে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে। একবার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) চার রাকয়াতের স্থলে দুই রাকয়াত নামায আদায় করে সালাম ফিরান। সাহাবীরা তো সবাই হতভম্ব। কিন্তু কেউ কোন প্রশ্ন করতে সাহস পেলেন না। যুল ইয়াদাইন ছিলেন অত্যন্ত সাহসী। তিনি জিজ্ঞেস করে বসলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! নামায কি কম করে দেওয়া হয়েছে না কি আপনি ভুল করেছেন? রাসূল (সাঃ) সাহাবীদের নিকট তার কথার সত্যতা যাচাই করলেন। সবাই যূল-ইয়াদাইনকে সমর্থন করে বললেনঃ আপনি দুই রাকয়াতই আদায় করেছেন। সত্যতা যাচাইর পর তিনি বাকী দু' রাকায়াত আদায়ের শেষে সহু সিজদাহ করেন। (বুখারীঃ আযান অধ্যায়, অনুচ্ছেদঃ ইমামের সন্দেহ হলে তিনি কি মুকতাদিদের কথা গ্রহণ করবেন?)

উপরোক্ত হাদীসটির বর্ণনাকারী হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ)। তিনি হিজরী সপ্তম সনে খাইবার যুদ্ধের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। অন্যদিকে যূ-শিমালাইন তার পাঁচ বছর পূর্বে বদর যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। সুতরাং যূল-ইয়াদাইন ও যূ-শিমালাইন একই ব্যক্তি হতে পারেন না। তাছাড়া দুজনের নামেও পার্থক্য আছে। একজনের নাম খিরবাক ও অন্যজনের নাম উমাইর। (সিয়ারুস সাহাবা, মুহাজিরিন-২/৩২৭)। আবু উমার বলেনঃ বদরে যূ-শিমালাইন শহীদ হন তিনি যূল-ইয়াদাইন নন। (আল ইসাবা-৩/৩৩)।

হযরত যূ-শিমালাইন কখন এবং কিভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন সে সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। ইসলাম গ্রহণের পর মদীনায় হিজরাত করে হযরত সাদ ইবন খাইসামার অতিথি হন। রাসূল (সাঃ) ইয়াযীদ ইবন ‍হারেসের সাথে তার মুওয়াখাত বা ভাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্টা করে দেন। 

ইসলাম গ্রহণের পর খুব বেশি দিন তিনি বাঁচেননি। মদীনায় আসার পর তিনি ও তার দ্বীনি ভাই ইয়াযীদ বদর যুদ্ধে যোগদান করেন। এটাই ছিল তার জীবনের প্রথম ও শেষ যুদ্ধ। এ যুদ্ধে তিনি কাফির আবু উসামা যুহাইর ইবন মুয়াবিয়া আল জুশামীর হাতে শহীদ হন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ত্রিশ বছর। তার দ্বীনী ভাই ইয়াযীদও এ যুদ্ধে শহীদ হন। (তাবাকাতঃ ৩/১৬৮, আনসাবুল আশরাফ-১/২৯৫)।

       লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ
    আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
(বইঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথাদ্বিতীয় খন্ড)

হিশাম ইবনুল আস (রাঃ)

নাম হিশাম, কুনিয়াত বা ডাক নাম আবুল আস ও আবু মুতী। ইবন হিব্বান বলেনঃ জাহিলী যুগে হিশামের কুনিয়াত ছিল আবুল আস অর্থাৎ অবাধ্যের পিতা। ইসলাম গ্রহণের পর রাসূল (সাঃ) তা পরিবর্তন করে রাখেন আবু মুতী- অনুগতের পিতা। (আল ইসাবা-২/৬০৪)। তাঁর পিতা আল-আস ইবন ওয়ায়িল। কুরাইশ গোত্রের বনী সাহম শাখার সন্তান। মিসর বিজয়ী প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আমর ইবনুল আসের ছোট ভাই।

সৌভাগ্য বা দূর্ভাগ্য বয়সের তারতম্যের ওপর নির্ভর করে না। হিশাম আমর অপেক্ষা ছোট হলেও বড় ভাইয়ের চেয়ে অধিকতর সৌভাগ্যের অধিকারী ছিলেন। আমর যখন পৌত্তলিকতার অন্ধকারে হাবুডুব খাচ্ছেন, হিশামের ললাটে তখন ইসলামের নূর ঝলক দিচেছ। মক্কায় ইসলামী দাওয়াতের সূচনা পর্বেই তিনি তা কবুল করেন এবং মক্কাবাসীদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে মুহাজিরদের একটি কাফিলার সাথে হাবশায় চলে যান। কিছুদিন সেখানে অবস্থানের পর এই মিথ্যা গুজব শুনেন যে, মক্কাবাসীরা ইসলাম কবুল করেছে, তখন অনেকের সাথে তিনিও মক্কায় ফিরে আসেন। এখান থেকে আবার মদীনায় হিজরতের পরিকল্পনা করেন; কিন্তু তার পিতা ও খান্দানের লোকদের হাতে বন্দী হন। এ সম্পর্কে উমার ইবনুল খাত্তাবের বর্ণনা বিভিন্ন সীরাত গ্রন্থে পাওয়া যায়। তিনি বলেনঃ 

'আমরা মদীনায় হিজরতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম। আমি আইয়াশ ইবন রাবীয়া ও হিশাম ইবনুল আস- এ তিনজন মক্কা থেকে ছয় মাইল দূরে 'তানদুব' উপত্যকায় বনী গিফারের 'উদাত' নামক কূপের নিকট এই অঙ্গীকার করলাম আমাদের প্রত্যেকেই আগামীকাল সকালে এখানে উপস্থিত হবে। কেউ ব্যর্থ হলে অবশ্যই সে বন্দী হবে। আমি ও আইয়াশ সময়মত হাজির হলাম; কিন্তু হিশাম বন্দী হয়ে অত্যাচারিত হলো। আমরা মদীনায় পৌঁছে কুবার বনী আমর ইবন আওফের অতিথি হলাম। এদিকে আইয়াশকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য আবু জাহল ইবন হিশাম ও হারিস ইবন হিশাম মদীনায় এলো। তারা দুজন ছিল আইয়াশের চাচাতো ভাই এবং সকলেই একই মায়ের সন্তান। রাসূল (সাঃ) তখন মক্কায়। 

তারা আইয়াশকে বললো, তোমার মা শপথ করেছে, তোমাকে না দেখে চুলে চিরুণী দেবে না, রোদ থেকে ছায়াতেও যাবে না। তুমি ফিরে চল। আইয়াশের অন্তর মায়ের জন্য নরম হয়ে গেল।

উমার বলেনঃ আমি তাকে বারবার অনুরোধ করলাম তাদের সাথে ফিরে না যাওয়ার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আইয়াশ তাদের সাথে মক্কার দিকে যাত্রা করলো। কিছু দূর যাওয়ার পর তারা আইয়াশকে বেঁধে ফেলে এবং অত্যাচার করতে করতে মক্কায় নিয়ে যায়। সেখানে তাকে বন্দী করে রাখা হয়।

উমার বলেন, আমরা তখন মদীনায় বলাবলি করতাম যারা এভাবে নিজেদেরকে বিপদের সম্মুখীন করেছে আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করবেন না। অতঃপর রাসূল (সাঃ) মদীনায় আসলেন এবং কুরআনের এ আয়াত নাযিল হলোঃ
বল হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হয়োনা। আল্লাহ সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

উমার বলেঃ আমি আয়াতটি লিখে গোপনে মক্কায় হিশামের কাছে পাঠিয়ে দিলাম। হিশাম বলেন, আমি সে আয়াতটি মক্কার 'যী-তুওয়া' নামক স্থানে বসে পাঠ করতাম; কিন্তু কিছুই বুঝতাম না। অবশেষে তা বুঝার তাওফীক দানের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করলাম। তারপর আমি বুঝলাম এ ‍আয়াত আমাদের শানে নাযিল হয়েছে। অতঃপর আমি মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নিকট পৌঁছলাম। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৪৫-৪৬, সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৭৪-৪৭৬, আল ইসাবা-৩/৬০৪)।

ইবন হিশাম বলেনঃ আমার বিশ্বস্ত এক ব্যক্তি আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, মদীনায় একদিন রাসূল (সাঃ) বললেনঃ আইয়াশ ইবন রাবীয়া ও হিশাম ইবনুল আসের ব্যাপারে তোমাদের মধ্যে কে আমাকে সাহায্য করতে পারে? ওয়ালীদ ইবনুল ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ), তাদের ব্যাপারে আমি ‍আপনাকে সাহায্য করবো। অতঃপর তিনি মক্কার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন। গোপনে মক্কায় প্রবেশ করে তিনি এক মহিলাকে দেখলেন, খাবার নিয়ে যাচ্ছে। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ আল্লাহর বান্দী, কোথায় যাচ্ছ? সে বললোঃ আমি যাচ্ছি এই দুই বন্দীর কাছে। অর্থাৎ আইয়াশ ও হিশামের কাছে। ওয়ালীদ মহিলাকে অনুসরণ করে বন্দীশালাটি চিনে নিলেন। তাদেরকে একটি ছাদবিহীন ঘরে বেঁধে রাখা হয়েছিল। তখন রাত হলো, ওয়ালীদ দেওয়াল টপকে তাদের কাছে পৌঁছে গেলেন এবং একটি পাথরের সাহায্যে তাঁদের বাধন কেটে দিলেন। তারপর তিন জন এক সাথে বেরিয়ে ওয়ালীদের উটে সওয়ার হয়ে মদীনায় পালিয়ে আসেন। তাঁদের একমাত্র বাহন উটটি হোঁচট খেলে ওয়ালীদের একটি আংগুল আহত হয়ে রক্ত রঞ্জিত হয়। তিনি স্বীয় অঙ্গুলিকে উদ্দেশ্য করে এই শ্লোকটি আবৃত্তি করেনঃ 

"হাল আনতি ইল্লা উসবুয়িন দামাইতি ওয়া ফী সাবীলিল্লাহি মা লাকীতি"।

"ওহে, তুমি একটি অঙ্গুলি ছাড়া আর তো কিছু নও, যা রক্তে রঞ্জিত হয়েছে। তোমার যা কিছু হয়েছে, তাতো আল্লাহর রাস্তায়"। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৭৬)।

বদর, উহুদ, খন্দকের যুদ্ধ মক্কায় হিশামের বন্দী দশায় শেষ হয়। খন্দক যুদ্ধের পর তিনি মদীনায় আসেন। খন্দকের পর কাফিরদের সাথে যতগুলি যুদ্ধ হয়েছে, সবগুলিতে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। ওয়াকিদী বলেন, মক্কা বিজয়ের পূর্বে রমযান মাসে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হিশামকে এক অভিযানে পাঠান। (আল ইসাবা-৩/৬০৪)।

সেনা পরিচালনা, বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রদর্শন এসব ছিল হিশামের খান্দানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। এ পরিবারের সন্তানেরা তরবারির ছায়াতলেই বেড়ে ওঠতো। রাসূলুল্লাহর (সাঃ) ওফাতের পর হযরত আবু বকরের খিলাফতকালে তার এ বৈশিষ্টের কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। কোন কোন বর্ণনায় জানা যায় প্রথম খলীফা হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে নুঈম ইবন আবদুল্লাহ ও অন্য কতিপয় ব্যক্তির সাথে রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসকে ইসলামের দাওয়াত দানের জন্য তার দরবারে পাঠান। এ প্রসঙ্গে হিশাম বলেনঃ কয়েক ব্যক্তির সাথে আমাকে হিরাক্লিয়াসের নিকট পাঠানো হয়। আমরা 'গুতা' বা দামেশকে পৌঁছে জাবালা ইবন আয়হাম আল-গাসসানীর বাড়ীতে উপস্থিত হলাম। আমাদের সাথে কথা বলার জন্য তিনি একজন দূত পাঠালেন। আমরা বললামঃ আমাদেরকে সম্রাটের কাছে পাঠানো হয়েছে, আমরা কোন দূতের সাথে কথা বলবো না। অনুমতি দিলে আমরা তারই সাথে কথা বলবো। অবশেষে জাবালা আমাদেরকে তার কাছে যাওয়ার অনুমতি দিলেন।

জাবালা আমাদেরকে বললেনঃ আপনাদের বক্তব্য কী? হিশাম বলেন, আমি তার সামনে ইসলামের দাওয়াত তুলে ধরি। তখন তার ও সভাষদবৃন্দের পরিধানে ছিল কালো পোশাক। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনাদের পরিধানে এ পোশাক কেন? তিনি বললেনঃ আমরা এ পোশাক পরেছি এবং শপথ করেছি, শাম থেকে তোমাদের তাড়িয়ে না দেওয়া পর্যন্ত এগুলি খুলবো না। আমি বললামঃ আল্লাহর কসম! আপনার এই সিংহাসন এবং আপনাদের সম্রাটের সাম্রাজ্য ইনশাআল্লাহ আমরা ছিনিয়ে নেব। আমাদের নবী মুহাম্মাদ (সাঃ) এমনই ভবিষ্যত বাণী করেছেন। জাবালা বললেনঃ আপনারা নন; বরং তারাই এর উপযুক্ত যারা দিনে সিয়াম সাধনা করে এবং রাতে ইবাদাতে দন্ডায়মান থাকে। আপনাদের সিয়াম কেমন? আমি আমাদের সিয়ামের পরিচিতি তুলে ধরলাম। তখন জাবালার চেহারা কালো হয়ে গেল। অতঃপর তিনি একজন দূত সহ আমাদেরকে সম্রাট হিরাক্লিয়াসের নিকট পাঠিয়ে দিলেন।

হিশাম বলেনঃ আমরা দূতের সাথে চলতে লাগলাম। যখন আমরা নগরের নিকটবর্তী হলাম, আমাদের সাথের দূতটি বললোঃ আপনাদের এই সওয়ারী পশু সম্রাটের নগরে প্রবেশ করতে পারবে না। ‍আপনারা চাইলে আমি আপনাদের জন্য তুর্কী ঘোড়া ও খচ্চরের ব্যবস্থা করতে পারবো। আমরা বললামঃ আমাদের এই পশুর ওপর সওয়ার হওয়া ছাড়া অন্য কোন অবস্থায় আমরা শহরে প্রবেশ করবো না। আমাদের অনমনীয়তার কথা সম্রাটকে জানানো হলে তিনি আমাদের ইচ্ছা অনুযায়ী প্রবেশের অনুমতি দিলেন। আমরা তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে সম্রাটের কক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে গেলাম।

এভাবে হিশাম ইবনুল আস ও তার সঙ্গীরা যখন রাজ দরবারের বাইরে নিজ নিজ পশুর পিঠ থেকে নামছিলেন তখন সম্রাট তাদেরকে তাকিয়ে দেখছিলেন। তারা যখন লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আল্লাহু আকবার উচ্চারণ করছিলেন, বাতাসে আন্দোলিত খেজুর গাছের পাতার মত তারা কাঁপছিল। সম্রাট লোক মারফত তাদের জানিয়ে দেন যে, এভাবে জোরে জোরে দ্বীন প্রচারের অধিকার তাদের নেই। তারা সম্রাটের কাছে গেলেন।

সম্রাট সিংহাসনে এবং রোমান সমরবিশারদরা নিজ নিজ আসনে উপবিষ্ট। সম্রাট হাসিমুখে তাদের বললেনঃ আপনারা নিজেদের মধ্যে যেভাবে সালাম ও সম্ভাষণ বিনিময় করেন, সেইভাবে আমাকে সম্ভাষণ জানালেন না কেন? সম্রাটের পাশেই বসা ছিল একজন প্রাঞ্জল আরবী ভাষী। তারা বললেনঃ আমাদের সম্ভাষণ আপনার জন্য বৈধ নয়; আর আপনাদের সম্ভাষণও আমাদের মুখে উচ্চারণ আমাদের জন্য উচিত নয়। সম্রাট প্রশ্ন করলেনঃ আপনারা নিজেদের মধ্যে এবং আপনাদের বাদশাহকে কিভাবে সম্ভাষণ জানান? তারা বললেনঃ আসসালামু আলাইকা। সম্রাট আবার প্রশ্ন করেনঃ আপনাদের সর্বশ্রেষ্ঠ বাক্য কি? তারা বলেনঃ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আল্লাহু আকবার- আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। অতঃপর তারা সম্রাটের নিকট দ্বীন ইসলামের বিভিন্ন বিষয় যথাঃ সালাত, সাওম, হজ্জ,যাকাত ইত্যাদির পরিচয় তুলে ধরেন। 

এই প্রতিনিধি দল সম্রাটের অতিথি হিসাবে তিন দিন তার নিকট অবস্থান করে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। বিভিন্ন সীরাত গ্রন্থে এই দাওয়াতী মিশনের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। (আল ইসাবা-২/ ৪৭১, হায়াতুস সাহাবা-১/২০৪, ৪০৫, ৩/৫৫৭-৫৬২)। অবশ্য কোন কোন বর্ণনায় বলা হয়েছে, সম্রাট হিরাক্লিয়াসের দরবারে তাবলীগী মিশন নিয়ে যিনি গিয়েছিলেন তিনি এ হিশাম নন, তিনি অন্য আর এক হিশাম। (‍আল ইসাবা-৩/৭০৪)।

খলীফা হযরত আবু বকরের খিলাফতকালে দু একটি সংঘর্ষের পর রোমানরা আজনাদাইনে বিপুল সৈন্য সমাবেশ করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হয়। হিজরী ১৩ সনের জুমাদা আল-উলা মাসে সংঘর্ষ শুরু হয়। ওয়াকিদী উম্মু বকর বিনতুল মিসওয়ারের সূত্রে উল্লেখ করেছেনঃ এ যুদ্ধে হিশাম যখন কিছু মুসলিম সৈনিকের মধ্যে পলায়নী মনোবৃত্তি লক্ষ্য করলেন, স্বীয় মুখাবরণ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে শত্রু ব্যুহের মাঝ বরাবর এগিয়ে গেলেন এবং চিৎকার করে বলতে থাকলেনঃ ওহে মুসলিম সৈনিকবৃন্দ, আমি হিশাম ইবনুল আস। তোমরা আমার সাথে এসো। তোমরা জান্নাত থেকে পালাচ্ছ? এই খৎনাবিহীন লোকেরা তোমাদের তরবারির সামনে টিকে থাকতে পারে না। হিশামের সাথে যোগ দিয়ে মুসলিম বাহিনী রোমান বাহিনীর ওপর প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। রোমান বাহিনী একটি সংকীর্ণ পথের মুখে জমা হয়। পথের বিপরীত দিক থেকে হিশাম আক্রমণ চালান। রোমানরা সম্মিলিতভাবে আক্রমণ করে তাকে হত্যা করে এবং তার লাশের ওপর দিয়ে পালিয়ে যায়। মুসলিম সৈন্যরা সেখানে পৌঁছে তার পেষা লাশটি পদদলিত হওয়ার ভয়ে শত্রু বাহিনীর পিছু ধাওয়া করতে ইতস্ততঃ করতে লাগলো। তখন তার বড় ভাই আমর (রাঃ) এসে বললেনঃ ওহে লোক সকল, আল্লাহ তাকে শাহাদাত দান করেছেন, তার রুহটি উঠিয়ে নিয়েছেন এবং তার দেহটি এখানে পড়ে আছে। অতঃপর মুসলিম সৈন্যরা তার লাশের ওপর দিয়ে সংকীর্ণ পথটি অতিক্রম করে শত্রু বাহিনীর পিছু ধাওয়া করে। আমর ইবনুল আস (রাঃ) সেই ছড়ানো ছিটানো লাশ একত্রিত করে দাফন করেন। (আল ইসাবা-৩/৬০৪)। তবে ইবনুল মুবারকের মতে তিনি খলীফা ‍উমারের (রাঃ) যুগে ইয়ারমুক যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। (আল ইসতীয়াব, টীকা আল ইসাবা-৩/৫৯৩-৫৯৫)।

হিশাম ইবনুল আস তার ভাই আমর ইবনুল আস অপেক্ষা বয়সে ছোট হলেও বড় ভাইয়ের চেয়ে বেশি নেককার ছিলেন। হিশামের শাহাদাতের পর একবার কতিপয় কুরাইশ ব্যক্তি খানায়ে কাবার পেছনে বসে তাদের দুই ভাইয়ের সম্পর্কে আলোচনা করছিল। এমন সময় তারা আমরকে তাওয়াফরত অবস্থায় দেখতে পেয়ে তাকে প্রশ্ন করলোঃ আপনাদের দুজনের মধ্যে কে উত্তম- আপনি না আপনার ভাই হিশাম? তিনি বললেনঃ আমার ও তার পক্ষ থেকে আমি বলছি। তার মা হাশেম ইবনুল মুগীরার মেয়ে, আর আমার মা একজন দাসী। আমাদের পিতা আমার চেয়ে ‍তাকে বেশী ভালোবাসতেন। আর প্রত্যেক পিতার তার সন্তানের ব্যাপারে দূরদৃষ্টির কথা তো তোমাদের জানা আছে। আমরা দুজন ভালো কাজে প্রতিযোগিতা করেছি, সব সময় সে আমাকে পরাজিত করেছে। আমি ও সে দুজনেই যুদ্ধে যোগদান করি এবং সারারাত দুজনই শাহাদাত লাভের জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করি। আল্লাহ তার দুআ কবুল করলেন এবং ‍আমার দুআ ব্যর্থ হলো। (আল ইসাবা-১/৬০৪)।

হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) তাদের দুই ভাইয়ের ঈমানী দৃঢ়তার সাক্ষ্য দিয়ে গেছেন। তিনি বলেছেনঃ আসের দুই পুত্র হিশাম ও আমর মুমিন।

হিশামের শাহাদতের খবর শুনে হযরত উমার ফারুক (রাঃ) মন্তব্য করেছিলেনঃ আল্লাহ তাঁর ওপর রহমত নাযিল করুন। তিনি ইসলামের একজন উত্তম সেবক ছিলেন।

       লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ
    আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
(বইঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথাদ্বিতীয় খন্ড)

কুদামাহ ইবন মাজউন (রাঃ)

নাম কুদামাহ, কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু উমার। পিতা মাজউন ইবন হাবীব এবং মা সুখাইলা বিনতুল আনবাস। (টীকাঃ সীরাতু ইবন হিশাম-১/২৫৩)। কুরাইশ বংশের বনী জুমাহ শাখার সন্তান। হযরত উমারের বোন সাফিয়্যা বিনতুল খাত্তাব তার স্ত্রী।

হযরত কুদামাহ ইসলামের সূচনা পর্বে ইসলাম গ্রহণ করেন। হযরত আবু বকর সিদ্দীকের (রাঃ) আহবানে যে সকল ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন উসমান ইবন মাজউন ও তার অন্য দুই ভাই কুদামাহ ও আবদুল্লাহ অন্যতম। তিনি দুই হিজরতের অধিকারী। ইসলাম গ্রহণের পর অন্য দুই ভায়ের সাথে প্রথমে তিনি হাবশায় হিজরত করেন। অতঃপর মক্কাবাসীরা সকলে ইসলামের দীক্ষা নিয়েছে এমন একটি মিথ্যা গুজব শুনে অনেকে হাবশা থেকে মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন। এই প্রত্যাবর্তনকারীদের মধ্যে কুদামাহও ছিলেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩৬৭)।

হযরত কুদামাহ হাবশা থেকে ফিরে মক্কায় বসবাস করতে থাকেন। বদর যুদ্ধের পূর্বে আবার মদীনায় হিজরত করেন এবং বদরে যোগদান করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। তারপর উহুদ, খন্দক সহ সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

খলীফা হযরত উমার (রাঃ) কুদামাহকে বাহরাইনের শাসনকর্তা নিয়োগ করেন। এই দায়িত্বে নিয়োজিত থাকাকালেই তিন মদ পানের অভিযোগে অভিযুক্ত হন এবং তার ওপর মদ পানের নির্ধারিত শাস্তি বা 'হদ' জারি করা হয়। তিনি হযরত উমারের ‍সামনে নিজের অপরাধ স্বীকার করেননি এবং বদরী সাহাবী হিসাবে তার আত্মপক্ষ সমর্থন বিশ্বাসযোগ্য হলেও সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে হযরত উমারের নিকট তার অপরাধ প্রমাণ হয়ে যায়। এ জন্য খলীফা তার ওপর 'হদ' জারী করেন। ঘটনার বর্ণনায় জানা যায়, একবার বনু আবদি কায়সের সরদার ‘জারুদ’ খলীফা উমারের নিকট উপস্থিত হয়ে কুদামাহর বিরুদ্ধে মদ পানের অভিযোগ দায়ের করেন। খলীফা জারুদকে বললেন, তুমি ছাড়া এ ঘটনার আর কোন স্বাক্ষী আছে কি? জারুদ হযরত আবু হুরাইরাকে (রাঃ) সাক্ষী মানলেন। উমার (রাঃ) আবু হুরাইরাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন। আবু হুরাইরা বললেন, তিনি কুদামাহকে কখনও মদ পান করতে দেখেননি, তবে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বমি করতে দেখেছেন। উমার (রাঃ) বললেন, শুধু এ সাক্ষ্যে অপরাধ প্রমাণ হয় না। আরও অনুসন্ধানের জন্য তিনি কুদামাহকে বাহরাইন থেকে মদীনায় ডেকে পাঠালেন। কুদামাহ মদীনায় পৌঁছলেন। জারুদ আবারও খলীফার নিকট তার ওপর 'হদ' জারী করার দাবী জানালো। উমার (রাঃ) তাকে বললেন তুমি সাক্ষী না বাদী? জারুদ বললো, সাক্ষী। খলীফা বললেন, তোমার দায়িত্ব তুমি পালন করেছো, এখন চুপ থাক। অতঃপর জারুদ আবারও খলীফার নিকট 'হদ' জারির ‍তাকিদ দিল। তার এই বাড়াবাড়ির ‍কারণে হযরত উমারের মনে সন্দেহ দেখা দিল। তিনি জারুদকে বললেনঃ তোমার জিহবা সংযত রাখ, অন্যথায় তোমাকে সতর্ক করে দিচ্ছি। প্রত্যুত্তরে জারুদ খলীফাকে বললো, উমার, আপনার চাচাতো ভাই মদ পান করেছে আর আপনি উল্টো আমাকে শাসাচ্ছেন- এ তো কোন ইনসাফের কথা নয়।

এ পর্যায়ে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) খলীফাকে বললেন, ইয়া আমীরুল মুমিনীন, আমাদের সাক্ষ্যের ব্যাপারে আপনি সংশয় পোষণ করলে কুদামাহর স্ত্রী তথা ওয়ালীদের মেয়ে হিন্দাকে ডেকে জিজ্ঞেস করতে পারেন। উমার (রাঃ) তাকে ডেকে পাঠান। তিনিও স্বামীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন। [আল-ইসাবা-৩/২২৮]।

এবার উমারের (রাঃ) আদল ও ইনসাফ বা সত্যনিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়ণতা উথলে উঠলো। তিনি কুদামাহকে বললেন, কুদামাহ, শাস্তি গ্রহণের জন্য তৈরী হয়ে যাও। জবাবে কুদামাহ বললেন, তাদের সাক্ষ্য অনুযায়ী যদি ধরেও নেওয়া যায় আমি মদ পান করেছি, তবুও আমার ওপর 'হদ' জারী করার কোন অধিকার আপনার নেই। উমার (রাঃ) প্রশ্ন করলেন, কেন? কুদামাহ পবিত্র কুরআনের সূরা মায়িদাহর ১১ নং আয়াতটি তিলাওয়াত করে শুনান। আল্লাহ বলছেনঃ যারা ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ বা সৎকাজ করেছে, তারা যা খেয়েছে তার জন্য তাদের কোন পাপ নেই। যখন তারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে, ঈমান এনেছে এবং আমলে সালেহ করেছে। (সূরা মায়িদা-১১)।

উমার (রাঃ) বললেন, কুদামাহ তুমি আয়াতটির অর্থ বিকৃত করছো। তুমি আল্লাহকে ভয় করলে অবশ্যই হারাম জিনিস থেকে বিরত থাকতে। হযরত কুদামাহ তখন অসুস্থ ছিলেন। এ কারণে খলীফা অন্যান্য সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে কিছুদিনের জন্য 'হদ' জারি বা শাস্তিদান মূলতবী রাখেন। কিন্তু অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর 'হদ' মূলতবী রাখা উমারের জন্য ছিল অসহনীয়। তিনি দ্বিতীয়বার সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করলেন। এবারও সকলে 'হদ' মূলতবী রাখার পক্ষে মত ব্যক্ত করলেন। কিন্তু খলীফা উমার বললেনঃ আমি আল্লাহর সাথে মিলিত হই, আর তার বোঝা আমার কাঁধে চাপুক, এ অবস্থার চেয়ে সে চাবুকের নিচে মৃত্যুবরণ করুক- এটাই আমার অধিক কাম্য। তিনি আর দেরী করলেন না। কুদামাহর অসুস্থতার মধ্যেই তার ওপর হদ জারি করেন এবং তার সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

এ ঘটনার কিছুদিন পর দুজন আবার এক সাথে হজ্জ আদায় করেন। মদীনায় ফেরার পথে উমার (রাঃ) এক স্থানে ঘুমিয়ে পড়েন এবং স্বপ্নে কুদামাহর সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নির্দেশ লাভ করেন। ঘুম থেকে জেগেই তিনি কুদামাহকে ডেকে পাঠান। কিন্তু কুদামাহ আসতে অস্বীকৃতি জানান। উমার (রাঃ) দ্বিতীয়বার লোক পাঠিয়ে বলেন, স্বেচ্ছায় না এলে জোর করে ধরে আনা হবে। কুদামাহ আসলেন। খলীফাই প্রথম আলোচনার সূচনা করলেন। অতঃপর দুজনের মধ্যে সম্পর্ক আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।

বর্ণিত আছে, হযরত রাসূলে কারীমের (সাঃ) ওফাতের পর একমাত্র কুদামাহ ছাড়া আর কোন বদরী সাহাবী মদ পানের অভিযোগে সাজা প্রাপ্ত হননি। (আল ইসাবা-৩/২২৯)।

হযরত কুদামাহর (রাঃ) মৃত্যুসন সম্পর্কে মতপার্থক্য আছে। প্রসিদ্ধমতে তিনি হযরত আলীর (রাঃ) খিলাফতকালে হিজরী ৩৬ সনে ৬৮ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন। অন্য একটি মতে তার মৃত্যুসন ৫৬ হিজরী।

       লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ
    আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
(বইঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথাদ্বিতীয় খন্ড)

হাজ্জাজ ইবন ইলাত (রাঃ)

নাম হাজ্জাজ, কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু কিলাব, মতান্তরে আবু মুহাম্মাদ ও আবু আবদুল্লাহ। পিতা ইলাত ইবন খালিদ। বনী সুলাইম গোত্রের সন্তান।

ইবন সাদ বলেন, রাসূল (সাঃ) যখন খাইবারে তখন তিনি তার খিদমতে ‍হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর মদীনায় বসতি স্থাপন করেন। ইবন শিহাব থেকে বর্ণিত। তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নবুওয়াত সত্য বলে স্বীকার করে তার কাছে লোক পাঠান। (আল ইসাবা-১/৩১৩)।

তার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে একটি চমকপ্রদ কাহিনী ইতিহাসে দেখা যায়। ইবন আব আদ-দুনিয়া ‘হাওয়াতিফুল জিন’ গ্রন্থে এবং ইবন আসাকির ওয়াসিলা ইবনুল আসকা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ হাজ্জাজের ইসলাম গ্রহণের ঘটনাটি ছিল এমন। তিনি একটি কাফিলার সাথে মক্কায় যাচ্ছেন। একটি নির্জন ভীতিজনক উপত্যকায় রাত হলে তারা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। হাজ্জাজের সঙ্গী-সাথীরা তাঁকে অনুরোধ করে বলে! আবু কিলাব, তুমি রাত জেগে বসে বসে তোমার নিজের ও সঙ্গীদের জন্য নিরাপত্তা ‍কামনা করতে থাক। হাজ্জাজ পাহারাদারীর দায়িত্ব নিয়ে জেগে জেগে নিম্নোক্ত কথাগুলি জপতে থাকেনঃ

"উয়িজু নাফসী ওয়া উয়িজু সাহবী,
মিন কুল্লি জিন্নিয়্যিন বিহাজান নাকবি,
হাত্তা আউবা ‍সালেমান ওয়া রাকবী।"

"আমি আমার নিজের ও আমার সঙ্গীদের জন্য পানাহ চাই, এই গিরিপথের সকল জিন থেকে, যাতে আমি ও আমার কাফিলা নিরাপদে ফিরে যেতে পারি"।

তিনি উপরোক্ত কথাগুলি জপছেন। এমন সময় অদৃশ্য থেকে কারও কন্ঠে কুরআনের নিম্নের ‍আয়াত তিলাওয়াত করতে শুনতে পানঃ

"ওহে জিন ও মানবজাতি! আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর সীমা তোমরা যদি অতিক্রম করতে পার, অতিক্রম কর! কিন্তু তোমরা তা পারবে না শক্তি ছাড়া"। (সূরা আর রাহমান-৩৩)।

তারা মক্কায় পৌঁছে কুরাইশদের মজলিসে ঘটনাটি বর্ণনা করেন। কুরাইশরা বলেঃ আবু কিলাব, তুমিও তো দেখছি বে-দ্বীন হয়ে গিয়েছ। এতো সেই বানী যা মুহাম্মাদের ধারণা মতে তার ওপর নাযিল হয়। জবাবে হাজ্জাজ বলেনঃ আল্লাহর কসম, আমি ও আমার সঙ্গীরা এই বাণীই শুনতে পেয়েছি। তাদের এ আলোচনার মাঝখানে আসী ইবন ওয়ালিল উপস্থিত হয়। লোকেরা তাকে বলেঃ আবু হিশাম, এই আবু কিলাব কি বলছে, শুনেছ? বিষয়টি সে জানতে চাইলে লোকেরা তাকে অবহিত করে। সবকিছু শুনে সে বলেঃ এতে অবাক হওয়ার কি আছে? তারা যার কাছ থেকে শুনেছে, সেই মুহাম্মাদের ওপর ভর করে তার মুখ দিয়ে বলে থাকে। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৫৭৬-৭৭, আল-ইসতিয়াব)। এই ঘটনার পর তিনি খাইবার, মতান্তরে মদীনায় গিয়ে ইসলামের ঘোষনা দেন।

হাজ্জাজের সহধর্মিণী তখনও মক্কায় বসবাস করেন। তার সকল সম্পদও সেখানে। ইসলাম গ্রহণের পর এসব সহায় সম্পদ মদীনায় সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন। অন্যথায় তাঁর ইসলাম গ্রহণের কথা কুরাইশরা জানতে পেলে সব হাতিয়ে নেবে। তাঁর সম্পর্কে মক্কাবাসী পৌত্তলিকরাও সন্দিহান ছিল। তাঁর অর্থ সম্পদ সহজে মক্কা থেকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভবও ছিল না। এ কারণে হাজ্জাজ মক্কা গিয়ে গুজব ছড়িয়ে দেন যে, খাইবারে মুহাম্মাদ (সাঃ) পরাজিত হয়েছে। মুহূর্তের মধ্যে খবরটি সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ে। মক্কার মুশরিকদের এভাবে খুশী করে তিনি বললেনঃ মুহাম্মাদের (সাঃ) সকল আসবাবপত্র বিক্রি হচ্ছে। আমার বাসনা, অন্য ব্যবসায়ীদের পৌঁছার পূর্বেই আমি সেগুলি খরিদ করি। মক্কার বিভিন্ন লোকের নিকট আমার বহু অর্থ কড়ি পাওনা আছে। তোমরা একটু চেষ্টা করলে সহজে আদায় হতে পারে। মক্কাবাসীরা এই ভাল কাজটির জন্য কোমর বেধে লেগে গেল। তারা চেষ্টা তদবীর করে তার পাওনা অর্থ আদায় করে দিল। 

রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সম্মানিত চাচা হযরত আব্বাস (রাঃ) তখন মক্কায়। তিনি নিজের বাড়ীতে বসে সব কিছু শুনছেন। তিনি এত ব্যাথা পেলেন যে, খবরের সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের জন্য ঘর থেকেও বের হলেন না। তিনি একটি ছেলের মাধ্যমে হাজ্জাজকে ডেকে পাঠালেন। হাজ্জাজ গেলেন এবং আব্বাসকে (রাঃ) আসল কথা খুলে বললেন। তিনি বললেনঃ আমার বকেয়া আদায়ের জন্য আমি এ কথা ছড়িয়েছি। আমি নিজেই ইসলাম গ্রহণ করেছি। মক্কাবাসীরা জানতে পেলে আমার প্রাপ্য এক কপর্দকও দেবে না। আল্লাহর ইচ্ছায় রাসূল (সাঃ) নিরাপদেই আছেন। খাইবারে মুসলিম বাহিনী বিজয়ী হয়েছে এবং রাসূল (সাঃ) খাইবারের নেতা হুয়াই ইবন আখতারের কন্যাকে বিয়ে করে তার সাথে দাম্পত্য জীবন যাপন করছেন। আমি কুরাইশদের ক্ষমতার আওতা থেকে বের হয়ে না যাওয়া পর্যন্ত এই গোপন তথ্য কারও নিকট প্রকাশ করবেন না।

অঙ্গীকার অনুযায়ী হযরত আব্বাস (রাঃ) তিনদিন সম্পূর্ণ চুপ থাকলেন। চতুর্থ দিন যখন নিশ্চিত হলেন যে, হাজ্জাজ মক্কাবাসীদের নাগালের বাইরে চলে গেছে, তখন তিনি পোশাক পাল্টে হাজ্জাজের বাড়ী গেলেন এবং তাঁর স্ত্রীর নিকট আসল ঘটনা প্রকাশ করলেন। তারপর তিনি কাবার চত্বরে আসলেন। সেখানে আগে থেকে এই বিষয়ে আলোচনা চলছিল। তিনি লোকদের বললেনঃ মুহাম্মাদ (সাঃ) খাইবার জয় করেছেন এবং হুয়াই ইবন আখতারের কন্যা এখন তার স্ত্রী। বনী আবী হাকীক তথা ইয়াসরিবের নেতৃবৃন্দের গর্দান উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। হাজ্জাজ তোমাদের ধোকা দিয়ে তাঁর অর্থ সম্পদ নিয়ে চম্পট দিয়েছে। লোকেরা প্রশ্ন করলো, আপনি কার কাছে এসব কথা শুনলেন? বললোঃ হাজ্জাজের কাছে। লোকেরা হাজ্জাজের স্ত্রীর নিকট জিজ্ঞেস করলে তিনিও সমর্থন করলেন। পঞ্চম দিনে মদীনা থেকেও খবর এসে গেল। কিন্তু এখন তাদের করণীয় কিছুই নেই। শিকার তাদের নাগালের বাইরে। তারা চুপ হয়ে গেল। (ইবন সাদ-৪/২, পৃঃ ১৪-১৫)।

খাইবার যুদ্ধের অল্প কিছুদিন পূর্বে হাজ্জাজ ইসলাম গ্রহণ করেন। এ যুদ্ধেই তিনি সর্বপ্রথম মুসলিম বাহিনীর সাথে যোগ দেন। মক্কা বিজয়ের সময় তিনি মদীনার বাইরে ছিলেন। হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তাকে মদীনায় ডেকে পাঠান। মক্কা বিজয়ের দিন হযরত খালিদ ইবন ওয়ালীদ (রাঃ) এক হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী নিয়ে বনী সুলাইমের পথে মক্কায় প্রবেশ করেন। এই বাহিনীতে আব্বাস ইবন মিরদাস, খুফাফ ইবন নুদবাহ ও হাজ্জাজ ইবন ইলাত- এ তিনজন তিনটি পতাকা বহন করেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/১৬৭)।

হাজ্জাজ ছিলেন ধনী ব্যক্তি। তিনি মক্কা থেকে তার সকল সম্পদ সরিয়ে আনতেও সক্ষম হয়েছিলেন। মদীনায় তিনি নিজের জন্য একটি বাড়ী ও একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। (আল ইসাবা-৩২৭)।

তার মৃত্যুকাল সম্পর্কে দুটি বর্ণনা আছে। একটি মতে তিনি হযরত উমার ফারুকের (রাঃ) খিলাফতকালের প্রথম দিকে মৃত্যুবরণ করেন। আর অন্য একটি মতে তিনি হযরত আলী (রাঃ) ও আয়িশার (রাঃ) মধ্যে সংঘটিত উটের যুদ্ধে শাহাদাত বরণ করেন। প্রথম বর্ণনাটি অধিকতর নির্ভরযোগ্য। উটের যুদ্ধে হাজ্জাজ নন বরং তাঁর ছেলে শহীদ হন।

       লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ
    আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
(বইঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথাদ্বিতীয় খন্ড)

উসমান ইবন তালহা (রাঃ)

নাম উসমান, পিতার নাম তালহা ইবন আবী তালহা এবং মাতার নাম উম্মু সাঈদ সালামা। মক্কার কুরাইশ বংশের বনু আমর শাখার সন্তান। জাহিলী যুগে পবিত্র কাবার হাজেব বা তত্ত্বাবধায়ক ও চাবির রক্ষক ছিলেন। ইসলামী যুগেও এ দায়িত্ব পালন করেন। (উসুদুল গাবা-৩/৩৭২)।

উসমান ইবন তালহার পিতা তালহা, তিন ভাই মুসাফি, কিলাব ও হারেস এবং তাঁর চাচা উসমান ইবন আবী তালহা উহুদ যুদ্ধে কাফির অবস্থায় মুসলিম বাহিনীর হাতে নিহত হয়। তাঁর পিতা তালহা হযরত আলীর (রাঃ) সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। আলী (রাঃ) তরবারির এক আঘাতে তাকে জাহান্নামে পৌঁছে দেন। (সীরাতু ইবন হিশাম ১ম খন্ড, টীকা নং-৩, পৃঃ ৪৭০)।

উসমান ইবন তালহার ইসলাম পূর্ব জীবন সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায়না। ইসলাম গ্রহণের পূর্বে মক্কায় মুসলমানদের ওপর অত্যাচার উৎপীড়নে শরীক হতেন কি না সে সম্পর্কেও ইতিহাসে তেমন কিছু পাওয়া যায় না। একটি ঘটনা জানা যায়, হযরত মুসয়াব ইবন উমাইর (রাঃ) মক্কায় দারুল আরকামে গোপনে ইসলাম গ্রহণের পর চুপে চুপে নামায আদায় করতেন। একদিন উসমান ইবনে তালহা তা দেখে ফেলেন এবং তার মা ও গোত্রের কানে পৌঁছে দেন। ফলে তারা মুসয়াবকে বন্দী করে তাঁর ওপর নির্যাতন চালায়। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩০১)।

হযরত উম্মু সালামার (রাঃ) মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত প্রসঙ্গ আলোচনা করতে গিয়ে সীরাত বিশেষজ্ঞরা উসমান ইবন তালহার নামটি বারবার উচ্চারণ করেছেন। ঘটনাটি সংক্ষেপে এই রকমঃ হযরত উম্মু সালামা (রাঃ) যখন মক্কার কুরাইশদের হাত থেকে ছাড়া পেয়ে স্বামী আবু সালামার (রাঃ) সাথে মিলিত হওয়ার জন্য একাকী মদীনার পথে রওয়ানা হয়ে মক্কার অদূরে তানয়ীমে পৌঁছেন, তখন এই উসমান ইবন তালহা এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করেনঃ আবু উমাইয়্যার মেয়ে, কোন দিকে যাবে? তিনি বললেনঃ মদীনায় স্বামীর কাছে। উসমান বললেনঃ তোমার সাথে আর কেউ নেই? উম্মু সালামা বললেনঃ আমার এই ছোট্ট শিশু সালামা ছাড়া আর কেউ নেই। অতঃপর উসমান উম্মু সালামার উটের রশি ধরে টেনে চলতে লাগলেন এবং মদীনার উপকন্ঠে কুবার বনী আমর ইবন আউফের পল্লীতে পৌঁছে উম্মু সালামাকে বললেনঃ আল্লাহর নামে প্রবেশ কর, তোমার স্বামী এখানে আছে। এ কথা বলে উসমান আবার মক্কার পথ ধরেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৬৯-৭০)।

হযরত উম্মু সালামা (রাঃ) যখন মদীনায় হিজরত করেন, উসমান তখনও অমুসলিম।

উসমান ইবন তালহার ইসলাম গ্রহণের সময়কাল সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন মতামত পরিলক্ষিত হয়। কোন মতে হুদাইবিয়ার সন্ধির সময়, কোন মতে হিজরী ৮ম সনে আবার কোন মতে মক্কা বিজয়ের দিন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায়, তিনি মক্কা বিজয়ের পূর্বে হিজরী অষ্টম সনে হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ও হযরত আমর ইবনুল আসের সাথে মদীনায় গিয়ে ইসলামের ঘোষণা দেন। খালিদ ইবনুল ওয়ালিদ বলেনঃ আমি যখন মক্কা থেকে মদীনায় গিয়ে ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলাম তখন মনে মনে বললামঃ রাসূলুল্লাহর (সাঃ) কাছে যাব কার সাথে? বিষয়টি নিয়ে সাফওয়ান ইবন উমাইয়্যার সাথে আলোচনা করলাম। সে আমার প্রস্তাব কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে বললো, কেউ আমার সাথে না থাকলেও আমি কক্ষনও তার অনুসারী হবো না। এরপর আমি ইকরামা ইবন আবী জাহলের নিকট গিয়ে একই কথা বললাম। সেও সাফওয়ানের মত জবাব দিল। তারপর আমি উসমান ইবন তালহার সাথে দেখা করে বললামঃ আমাদের অবস্থা তো এখন সেই খেকশিয়ালের মত যে একটি গর্তের মধ্যে আছে, আর সেই গর্তে পানি ঢালা হচ্ছে। এক সময় অবশ্যই তাকে বের হয়ে আসতে হবে। উসমান আমার কথা বুঝতে পেরে সায় দিল এবং আমার মত একই ইচ্ছা প্রকাশ করলো। আমি বললামঃ আগামী কাল ভোরেই আমি মদীনার পথে রওয়ানা হচ্ছি। অতঃপর আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, আগামীকাল ভোরে আমরা পৃথকভাবে মক্কা থেকে তিন মাইল দূরে ইয়াজুজ নামক স্থানে পৌঁছবো এবং সেখান থেকে এক সাথে যাত্রা করবো। কেউ আগে পৌঁছলে অন্যের জন্য অপেক্ষা করবো। প্রভাত হওয়ার পূর্বেই আমরা ‘ইয়াজুজ’ পৌঁছে যাত্রা শুরু করলাম। ‘হাদ্দা’ ‍নামক স্থানে পৌঁছে আমর ইবনুল আসের সাথে আমাদের দেখা হলো। আলাপ করে জানা গেল তিনিও একই উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন। তারপর আমরা তিনজন এক সাথে মদীনায় পৌঁছে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) খিদমতে হাজির হই। প্রথমে আমি, তারপর উসমান ও আমর রাসূলুল্লাহর (সাঃ) হাতে বাইয়াত বা আনুগত্যের শপথ করি। সে ছিল অষ্টম হিজরীর সফর মাস। (হায়াতুস সাহাবা-১/১৬১-৬২)। কবি আবদুল্লাহ ইবন যাবয়ারী তালহার ইসলাম গ্রহণকে স্বাগত জানিয়ে সে সময় একটি কাসীদা রচনা করেছিলেন। তার কিছু অংশ ইবন হিশাম তার সীরাত গ্রন্থে সংকলন করেছেন। (সীরাত-২/২৭৮)।

অন্য একটি বর্ণনামতে, উসমান হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় ইসলাম গ্রহণ করেন এবং খালিদ ও আমরের সাথে মদীনায় যান। (আল ইসাবা-৩/৪৬০)। অপর দিকে মক্কা বিজয় সম্পর্কিত বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় মক্কা বিজয়ের দিন রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নিকট থেকে উসমান কাবার চাবি লাভ করার পর সেই দিন ইসলাম গ্রহণ করেন। এতে বাহ্যতঃ প্রশ্ন দেখা দিতে পারে, মক্কা বিজয়ের পর একজন অমুসলিমের হাতে রাসূল (সাঃ) কাবার চাবি তুলে দিতে পারেন কি? চাবি দেওয়ার ঘটনা দ্বারা বুঝা যায় তিনি পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও প্রশ্ন হচ্ছে, মক্কা বিজয়ের পূর্বেও কাবার চাবি ছিল উসমানের নিকট। মক্কা বিজয়ের পূর্বে একজন মুসলমানের হাতে কাবার চাবি থাকবে, আর কুরাইশরা তা মেনে নেবে, এ কি সম্ভব? এ সব প্রশ্নের সমাধান এ ভাবে হতে পারে, তিনি খালিদ ও আমরের সাথে পূর্বেই মদীনায় গিয়ে ইসলামের ঘোষণা দিয়ে মক্কায় চলে আসেন? কিন্তু মক্কার লোকেরা তা হয়তো জানতো না। (আসাহহুস সিয়ার-৩০৪-৩০৬)।

জাহিলী যুগ থেকে মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত কাবার তত্বাবধান ও চাবি রক্ষকের দায়িত্ব উসমানের ওপর ন্যাস্ত ছিলো। মক্কা বিজয়ের দিন হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) কাবার অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য তাঁর নিকট চাবি চাইলেন। তিনি বাড়ীতে গিয়ে তাঁর মায়ের নিকট চাবি চাইলে তিনি দিতে অস্বীকার করেন। সম্ভবতঃ তখনও উসমানের মা ইসলাম গ্রহণ করেননি। উসমান কোষমুক্ত তরবারি উঁচু করে ধরে মাকে বললেন, চাবি দিন অন্যথায় এই তরবারি পিঠে বসিয়ে দেব। এ ভাবে উসমান মার নিকট থেকে জবরদস্তি চাবি আদায় করে নিয়ে হযরত রাসূলে কারীমের (সাঃ) হাতে অর্পণ করেন। রাসূল (সাঃ) দরজা খুলে কাবার ভেতরে প্রবেশ করেন। উসমানও সংগে ছিলেন। দরযা ভেতর থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়। তারপর কাবা পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন করার পর রাসূল (সাঃ) বের হয়ে আসেন। অতঃপর রাসূল (সাঃ) মসজিদে বসলেন। আলী (রাঃ) কাবার চাবিটি হাতে নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ), চাবিটি আমাদের দায়িত্বে অর্পণ করুন। সিকায়াহ ও হিজাবাহ (হাজীদের পানি পান ও কাবার রক্ষণাবেক্ষণ) উভয় দায়িত্ব এখন থেকে বনু হাশিমের হাতে দান করুন। সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব বলেন, সে দিন আববাস ইবনুল আবদুল মুত্তালিব কাবার চাবিটি হস্তগত করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন এবং তাঁকে সমর্থন করেছিল বনু হাশিমের আরও কিছু লোক। সিকায়াহ বা পানি পান করানোর দায়িত্ব পূর্ব থেকেই আব্বাসের ওপর ন্যস্ত ছিল।

বনু হাশিমের এ দাবীর মুখে হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) বললেনঃ উসমান ইবন তালহা কোথায়? উসমানকে ডাকা হলে রাসূল (সাঃ) তাঁর হাতে মতান্তরে উসমান ও তাঁর চাচাতো ভাই শাইবার হাতে চাবিটি দিয়ে বললেনঃ এই তোমার চাবি। এখন থেকে এই চাবি চিরদিনের জন্য তোমাদের হাতে থাকবে। কেউ তোমাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে সে হবে অত্যাচারী। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৪১১-১২)।

ইবন সাদ লিখেছেনঃ কাবার চাবি পূর্ব থেকেই উসমান ইবন তালহার দায়িত্বে ছিল। তিনি প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার কাবার দরজা খুলতেন। একবার রাসূল (সাঃ) তাঁকে ভিন্ন এক দিন দরযা খুলে দেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু তিনি অত্যন্ত শক্তভাবে তা প্রত্যাখ্যান করেন। রাসূল (সাঃ) সেদিন বলেছিলেন, ওহে উসমান এমন একদিন আসবে যখন এ চাবি আমারই আয়ত্বে থাকবে এবং আমি যাকে ইচ্ছা তাকেই অর্পণ করবো। উসমান বলেছিলেনঃ সম্ভবতঃ সেদিন গোটা কুরাইশ বংশের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। রাসূল (সাঃ) তার কথা প্রত্যাখ্যান করে বলেনঃ না, বরং সেই দিনটি হবে কুরাইশদের প্রকৃত ইযযত ও সম্মানের দিন। তাই মক্কা বিজয়ের দিন উসমান যখন রাসূলুল্লাহর (সাঃ) হাত থেকে চাবিটি নিয়ে চলে যাচ্ছিলেন তখন তিনি উসমানকে পুনরায় ডেকে অতীতের সেই ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। উসমান তখন বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ), নিশ্চয় আপনি আল্লাহর রাসূল।

আজও কাবার চাবি মক্কার শাইবী গোত্রের লোকের হাতে বিদ্যমান। এই শাইবী গোত্র হযরত উসমান ইবন তালহার (রাঃ) চাচাতো ভাই শাইবা ইবন উসমান ইবন আবী তালহার বংশধর। এই শাইবা ইবন উসমান হুনাইন যুদ্ধের সময় ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা উসমান ইবন আবী তালহা উহুদ যুদ্ধে কাফির অবস্থায় মুসলিম বাহিনীর হাতে নিহত হয়। আর তাঁর মা উহুদ যুদ্ধে শাহাদত বরণকারী প্রখ্যাত সাহাবী হযরত মুসআব ইবন উমাইরের বোন উম্মু জামীল হিন্দা বিনতু উমাইর। ঐতিহাসিক ওয়াকিদীর একটি বর্ণনা মতে হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) মক্কা বিজয়ের দিন কাবার চাবিটি শাইবা ও উসমান উভয়ের হাতে এক সাথে অর্পণ করেন। চাবিটি তখন উসমান ইবন তালহা ইবন আবী তালহার হাতে থাকে। তাঁর মৃত্যুর পর উসমানের চাচাতো ভাই শাইবা ইবন উসমান ইবন আবী তালহা গ্রহণ করেন। তখন থেকে তার অধঃস্তন পুরুষদের হাতে কাবার চাবি বিদ্যমান। (আসাহুস সিয়ার, পৃঃ ৩০৫)।

মক্কা বিজয়ের পর হযরত উসমান ইবন তালহা মদীনায় চলে যান এবং রাসূলুল্লাহর (সাঃ) জীবদ্দশা পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেন। রাসূলুল্লাহর (সাঃ) ইনতিকালের পর কাবার চাবি রক্ষকের দায়িত্ব পালনের জন্য আবার মক্কায় ফিরে যান এবং এখানে হিজরী ৪২ সনে ইনতিকাল করেন। অবশ্য অন্য একটি বর্ণনামতে তিনি খলীফা হযরত উমারের (রাঃ) খিলাফতকালের প্রথম দিকে আজনাদাইনের যুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১, টীকা-৩, পৃঃ ৪৭০)।

হযরত উসমান ইবন তালহার শিষ্টাচার, ভদ্রতা ও উন্নত নৈতিকতার প্রমাণ পাওয়া যায় হযরত উম্মু সালামার হিজরতের ঘটনার মধ্যে। হযরত উম্মু সালামা তার প্রশংসা করতে গিয়ে বলেছেন,"আল্লাহর কসম, তার চেয়ে অধিকতর কোন ভদ্র লোক আমি আরবে আর কখনও দেখিনি। যখন তিনি আমাকে সংগে নিয়ে কোন মানযিলে পৌঁছতেন, আমার নামার জন্য উট বসিয়ে দূরে সরে যেতেন। আমি উটের হাওদা থেকে নেমে একটু দুরে সরে গেলে তিনি আবার ফিরে এসে উটটি গাছের সাথে বাঁধতেন এবং আমার নিকট থেকে একটু দূরে কোন গাছের তলায় ‍শুয়ে পড়তেন। আবার যাত্রার সময় হলে উট প্রস্তুত করে আমার কাছাকাছি নিয়ে এসে তিনি সরে যেতেন এবং বলতেন; উটে আরোহন কর। আমি উটের পিঠে ঠিকমত বসার পর তিনি ফিরে আসতেন এবং লাগামটি ধরে নিয়ে চলা শুরু করতেন। এভাবে তিনি আমাকে মদীনায় পৌঁছে দেন"। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৪৬৯-৭০, হায়াতুস সাহাবা-১/৩৫৮-৩৫৯)। এই ছিল হযরত উসমান ইবন তালহার (রাঃ) ইসলাম পূর্ব জীবনে নৈতিকতার বাস্তব রূপ।

       লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ
    আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
(বইঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথাদ্বিতীয় খন্ড)

আমের ইবন রাবীয়া (রাঃ)

নাম আমের, কুনিয়াত আবু আবদিল্লাহ এবং পিতা রাবীয়া। তার খান্দান হযরত উমারের (রাঃ) পিতা খাত্তাব-এর ‍হালীফ বা চুক্তিবদ্ধ ছিল। খাত্তাব তাঁকে এত ভালোবাসতেন যে, তাঁকে ছেলে হিসেবে গ্রহণ করেন। এ কারণে প্রথম জীবনে আমের ইবনুল খাত্তাব (খাত্তাবের পুত্র আমের) নামে পরিচিত হন। কিন্তু কুরআন যখন প্রথা বাতিল করে প্রত্যেক মানুষকে তার জন্মদাতা পিতার নামে পরিচয় গ্রহণের নির্দেশ দেয়, তখন হযরত আমেরও খাত্তাবের পরিবর্তে নিজের জন্মদাতা পিতা রাবীয়ার নামে পরিচিত হন।

উল্লিখিত সম্পর্কের কারণে হযরত আমের ও হযরত উমারের মধ্যে শেষ জীবন পর্যন্ত অত্যন্ত মধুর সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। হযরত উমারের "বাইতুল মাকদাস" সফরের সময় হযরত আমের তাঁর সফরসঙ্গী ছিলেন। যে বছর হযরত উসমানকে স্বীয় স্থলাভিষিক্ত করে হযরত উমার হজ্জে যান, সঙ্গে আমেরও ছিলেন।

হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) হযরত আল আরকাম ইবন আবিল আরকামের বাড়ীতে আশ্রয় নেয়ার পূর্বে ইসলামের সেই সূচনাপর্বে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) আহবানে সাড়া দিয়ে যারা ইসলাম গ্রহণ করেন, হযরত আমের সেই সৌভাগ্যবানদেরই একজন।

শিরক ও তাওহীদের সংঘাত-সংঘর্ষ এবং কাফিরদের যুলুম নির্যাতনে তিনিও শান্তিতে মক্কায় বসবাস করতে পারেননি। তিনি স্ত্রী হযরত লায়লাকে সংগে করে শান্তি ও নিরাপত্তার সন্ধানে দুইবার ‍হাবশায় হিজরত করেন। ইবন ইসহাক বর্ণনা করেছেন। আমেরের স্ত্রী বলেনঃ আমরা হাবশায় হিজরতের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমের কোন প্রয়োজনে বাড়ীর বাইরে যান। এমন সময় উমার আমার সামনে এসে দাড়ায়। তখনও সে শিরকের ওপর। আমরা তার হাতে নিগৃহীত হতাম। উমার আমাকে বললোঃ আবদুল্লাহর মা, এ কি! তোমাদের চলে যাওয়ার প্রস্তুতি? বললামঃ হাঁ, আমরা আল্লাহর এক যমীন হতে অন্য যমীনের দিকে যাব। তোমরা আমাদের অনেক কষ্ট দিয়েছ, আমাদের ওপর যুলুম করেছ। দেখা যাক, আল্লাহ কোন উপায় বের করে দেন কি না। উমার বললোঃ আল্লাহ তোমাদের দিনটি মঙ্গলময় করুন। আমেরের স্ত্রী বলেনঃ আমি সেদিন উমারকে এত নরম দেখলাম যা আর কখনও দেখিনি। উমার চলে গেল। আমাদের দেশত্যাগে সে অত্যন্ত কষ্ট পায়। আমের বাড়ী ফিরলে আমি তাকে বললামঃ আবদুল্লাহর বাপ, এই মাত্র তুমি যদি উমারের বিষন্নতা ও আমাদের প্রতি তার দরদ দেখতে! আমের বললেনঃ তুমি তার ইসলাম গ্রহণের আশা করছো? বললামঃ হাঁ। তিনি বললেনঃ খাত্তাবের গাধা ইসলাম গ্রহণ করতে পারে, তবে তুমি যাকে দেখেছো সে ইসলাম গ্রহণ করবে না। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৫৬)।

হযরত আমের (রাঃ) হাবশা থেকে মক্কায় ফিরে এসে সস্ত্রীক আবার মদীনায় হিজরত করেন। ইবন ইসহাক বলেনঃ মুহাজিরদের মধ্যে সাবু সালামার পর সর্বপ্রথম মদীনায় আসেন আমের ইবন রাবীয়া ও আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ। (হায়াতুস সাহাবা-১/৩৬৩)। অনেকের মতে এটা সঠিক নয়। তার পূর্বে আরও কতিপয় ব্যক্তি মদীনায় পৌঁছেন। তবে এ কথা সত্য যে, তার স্ত্রী হযরত লায়লা মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতকারী প্রথম মহিলা।

বদর, উহুদ, খন্দক সহ সকল যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সংগে ছিলেন। তাছাড়া ছোট ছোট অভিযানেও তিনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। জীবন বাজি রেখে আল্লাহর বাণী বা কালেমা প্রচারের দায়িত্ব সার্থকভাবে পালন করেন। স্বীয় পুত্র আবদুল্লাহ ইবন আমেরের কাছে প্রায়ই নিজের গৌরবজনক কর্মকান্ডের কথা গর্বের সাথে বর্ণনা করতেন। একবার কথা প্রসঙ্গে বলেনঃ রাসূল (সাঃ) আমাদেরকে অভিযানে পাঠাতেন। দারিদ্রের কারণে পাথেয় হিসেবে সামান্য কিছু খেজুর দিতেন। প্রথম প্রথম আমরা এক এক মুট করে পেতাম, ‍তারপর কমতে কমতে একটি মাত্র খেজুরে এসে ঠেকতো। হযরত আবদুল্লাহ বিস্ময়ের সাথে প্রশ্ন করেনঃ একটা খেজুরে কিভাবে চলতো? জবাবে তিনি বললেনঃ প্রিয় বৎস! এমনটি বলো না। যখন খেজুর শেষ হয়ে যেত, তখন আমরা এই একটি খেজুরের জন্যও কাতর হয়ে পড়তাম।

হযরত উসমানের খিলাফতের শেষ দিকে যখন ফিতনা ও আত্মকলহ চরমরূপ ধারণ করে তখন হযরত আমের (রাঃ) নির্জন বাস গ্রহণ করেন। রাত দিন সব সময় রোযা, নামায ও ইবাদাতে মশগুল থাকতেন। একদা গভীর রাত পর্যন্ত ইবাদাতে মগ্ন ছিলেন, এ অবস্থায় একটু তন্দ্রাভাব আসে। তিনি স্বপ্নে দেখেন, কেউ যেন তাকে বলছেন, "উঠো, আল্লাহর কাছে দুআ কর, তিনি যেন তোমাকে এই ফিতনা থেকে বাঁচান- যিনি তার অন্য নেক বান্দাদের রক্ষা করেছেন"। হযরত আমের সংগে সংগে উঠে বসেন। এই ঘটনার পর তার নির্জনতা অবলম্বন ও ইবাদাতের মাত্রা আরও বেড়ে ‍যায়। এরপর থেকে কেউ আর তাঁকে ঘর থেকে বের হতে দেখেনি। এ অবস্থায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং হযরত উসমানের শাহাদাতের কয়েকদিন পর ইনতিকাল করেন। অতিরিক্ত নির্জনতা অবলম্বনের জন্য কেউ জানতে পারেনি তিনি কবে অসুস্থ হন এবং কবেই বা মৃত্যুবরণ করেন। হঠাৎ তার জানাযা দেখে লোকেরা অবাক হয়ে যায়।

মুসয়াব ইবন যুবাইর বলেনঃ আমের হিজরী ৩২ সনে মারা যান। আবু উবাইদার মতে তাঁর মৃত্যুসন হিজরী ৩৭। ওয়াকিদী বলেন, হযরত উসমানের শাহাদাতের অল্প কিছুদিন পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। (আল ইসাবা-২/ ২৪৯)।

হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার, আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর, আবু উমামা ইবন সাহল প্রমূখের সূত্রে তিনি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) হাদীস বর্ণনা করেছেন যা বুখারী ও মুসলিম সহ বিভিন্ন হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে।

আমের ইবন রাবীয়া থেকে বর্ণিত। আরবের এক ব্যক্তি তার নিকট আসে। আমের তার প্রতি যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করেন। লোকটি সে কথা রাসূলুল্লাহর (সাঃ) কাছে বর্ণনা করে। সে আবার ফিরে এসে আমেরকে বলে, আমি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) কাছে এমন একটি উপত্যকার মালিকানা চেয়েছি, যার থেকে উত্তম উপত্যকা আরবে দ্বিতীয়টি নেই। আমি ইচ্ছা করেছি তার কিছু অংশ আপনাকে দান করবো। যা আপনার ও আপনার পরবর্তী প্রজন্মের কাজে আসবে। আমের বললেনঃ তোমার ঐ জমির কোন প্রয়োজন আমার নেই। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে কুরআনের এ আয়াতটি নাযিল হয়ঃ "মানুষের হিসাব নিকাশ নিকটবর্তী হয়েছে অথচ এখনও তারা অমনোযোগী হয়ে প্রত্যাখ্যান করে চলেছে"। (সূরা আল আম্বিয়া-১)। আমের বলেন, এ আয়াত আমাদেরকে দুনিয়ার প্রতি নির্মোহ করে তোলে। (আল ইসাবা-২/২৫১-৫২)।

       লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ
    আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
(বইঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথাদ্বিতীয় খন্ড)

সালামা ইবন হিশাম (রাঃ)

নাম সালামা, ডাক নাম আবু হাশেম। পিতা হিশাম ইবন মুগীরা এবং মাতা দাবায়া বিনতু আমের। ইসলামের ঘোরতর শত্রু আবু জাহলের ভাই।

ডঃ মুহাম্মাদ হামীদুল্লাহ, সালামার মা দাবায়া বিনতু আমেরের জাহিলী জীবনের এক চমকপ্রদ কাহিনী বর্ণনা করেছেন। হাইসাম ও ইবনুল কালবী বর্ণনা করেছেনঃ মুত্তালিব ইবন আবী ওয়াদায়া ইবন আব্বাসকে বলেছেনঃ দাবায়া বিনতু আমের ছিলেন হাওজা ইবন আলীর স্ত্রী। হাওজা মারা গেলে দাবায়া উত্তরাধিকারী হিসাবে প্রচুর সম্পত্তি লাভ করেন। অতঃপর তিনি পিতৃ গোত্রে ফিরে আসেন। সেখানে আবদুল্লাহ ইবন জুদয়ান আত তাইমী দাবায়ার পিতার নিকট তাকে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। তার পিতা রাজী হন এবং আবদুল্লাহর সাথে তাকে বিয়ে দেন।

এদিকে দাবায়ার চাচাতো ভাই, হুযন ইবন আবদুল্লাহ দাবায়ার পিতার নিকট তাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। দাবায়ার পিতা বলেন, আমি তো তাকে ইবন জুদয়ানের সাথে বিয়ে দিয়েছি। হুযন তখন শপথ করে বলে, দাবায়া যদি ইবন জুদয়ানের কাছে যায় তাহলে আমি তার স্বামীর সামনেই তাকে হত্যা করবো।

দাবায়ার পিতা ঘটনাটি ইবন জুদয়ানকে জানালেন। ইবন জুদয়ানও পাল্টা জানিয়ে দিলেন, যদি তিনি দাবায়ার চাচাতো ভাইয়ের দাবী অনুযায়ী কাজ করেন তাহলে উকাজ মেলায় তার বিরুদ্ধে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগের ঝান্ডা উত্তোলন করা হবে। দাবায়ার পিতা তার চাচাতো ভাইয়ের নিকট বিষয়টি বর্ণনা করলে সে নমনীয় হয়ে যায় এবং তার দাবী প্রত্যাহার করে নেয়।

দাবায়াকে ইবন জুদয়ানের নিকট পাঠানো হলো। আল্লাহর মর্জি যতদিন ছিল, তিনি সেখানে থাকলেন। দাবায়া ছিলেন অতি সুন্দরী যুবতী। ইবন জুদয়ানের সাথে দাম্পত্য জীবন চলাকালে একদিন মক্কায় কাবার তাওয়াফ করছিলেন, এ সময় হিশাম ইবন মুগীরার নজরে পড়লেন। দাবায়ার রূপে হিশাম মুগ্ধ হলেন। কাবার চত্বরে তারা কিছুক্ষণ কথা বললেন, এক পর্যায়ে হিশাম বললেনঃ দাবায়া! এই রূপ ও যৌবন নিয়ে তুমি একজন বৃদ্ধের ঘর করছো? তার নিকট থেকে তালাক নিতে পারলে আমি তোমাকে বিয়ে করবো।

ঘরে ফিরে দাবায়া স্বামী ইবন জুদয়ানকে বললেনঃ আমি একজন যুবতী নারী, আর তুমি এক বৃদ্ধ। ইবন জুদয়ান বললেনঃ এ কথা কেন? আমি জানতে পেরেছি, তাওয়াফের সময় হিশাম তোমার সাথে কথা বলেছে। তুমি হিশামকে বিয়ে করবে না- যতক্ষণ তুমি আমার কাছে এ অঙ্গীকার না করছো, আমি তোমাকে তালাক দিচ্ছি না। তোমাকে আরও অঙ্গীকার করতে হবে, যদি তাকে বিয়ে কর তাহলে তুমি আমার এই শর্তগুলি পূরণ করবেঃ

১. উলঙ্গ হয়ে কাবা তাওয়াফ করবে।
২. এতগুলি উট কুরবানী করবে। 
৩. এত পরিমাণ পশমের সূতা কাটবে।

দাবায়া এই শর্তের কথা হিশামকে ‍জানালেন। হিশাম বললেনঃ প্রথম শর্তটির ব্যাপারে আমি কুরাইশদের সাথে আলোচনা করে কাবার চত্বর সম্পূর্ণ ফাঁকা করে দেব। তুমি শেষ রাতে অন্ধকারে একাকী উলঙ্গ হয়ে তাওয়াফ সেরে নেবে। কেউ দেখার সুযোগ পাবে না। আর তোমার পক্ষ থেকে উট আমি কুরবানী করে দেব। আর সূতা কাটার ব্যাপারটি, তা এটা কোন ধর্ম নয়। কুরাইশরা এটা তৈরী করেছে। আমার প্রতিবেশী মহিলারা তোমার পক্ষ থেকে এ কাজটি করে দেবে।

হিশামের প্রতিশ্রুতি পেয়ে দাবায়া স্বামী ইবন জুদয়ানকে বলেন, আমি তোমার শর্তে রাজী। হিশামকে বিয়ে করলে তোমার এ শর্ত সমূহ পূরণ করবো। এভাবে ইবন জুদয়ানের নিকট থেকে তালাক নিয়ে দাবায়া হিশামকে বিয়ে করেন। হিশাম কুরাইশদের সাথে কথা বলে কাবার চত্তর খালি করে দিলে দাবায়া উলঙ্গ হয়ে কাবা তাওয়াফ করেন। কালবী বলেনঃ মুত্তালিব ইবন আবী ওয়াদায়া বলেছেনঃ আমি তখন এক বালক। মসজিদের একটি দরযা দিয়ে উঁকি মেরে দেখছিলাম। দেখলাম, দাবায়া কাপড় খুলে ফেললো। এভাবে এক সপ্তাহ ধরে সে একটি শ্লোক আবৃত্তি করতে করতে ‍তাওয়াফ করলো। অন্য শর্ত দুটিও হিশাম পূরণ করেন। এই হিশামের ঔরষে দাবায়ার গর্ভে জন্ম গ্রহণ করেন সালামা ইবন হিশাম। উত্তরকালে এই সালামা হলেন পরীক্ষিত উত্তম মুসলমান।

হিশামের সাথে দাম্পত্য জীবন চলাকালে দাবায়ার পূর্ব স্বামী আবদুল্লাহ ইবন জুদয়ান মারা যান। তার ‍মৃত্যুর খবর শুনে দাবায়া মন্তব্য করেনঃ তিনি ছিলেন একজন আরব রমণীর এক চমৎকার স্বামী। এর কিছুদিন পর হিশাম মারা গেলে দাবায়া বিধবা হন।

পরবর্তীকালে দাবায়া ইসলাম গ্রহণ করেন। এদিকে পুত্র সালামাও বড় হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) সালামার নিকট তাঁর মাকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। সালামা তার মায়ের সাথে পরামর্শ করে তার মধ্যে অনীহার ভাব লক্ষ্য করে রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) জানান। রাসূল (সাঃ) প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেন। (ডঃ হামীদুল্লাহ সম্পাদিত আনসাবুল আশরাফ-১, টীকা নং-৩, পৃঃ ৪৬০-৪৬১)।

মক্কায় ইসলামী দাওয়াতের সূচনা পর্বেই সালামা ইসলাম গ্রহণ করেন। হাবশায় হিজরত করেন। কিছুদিন সেখানে থাকার পর আরও অনেক মুহাজিরদের সাথে তিনিও মক্কায় ফিরে আসেন। অনেকেই আবার হাবশায় ফিরে যান। সালামাও যেতে চান, কিন্তু আবু জাহল তাঁকে বাধা দেয়। তাঁর উপর অত্যাচার শুরু হয়। তাঁকে অনাহারে রাখা হয় এবং মারপিটও চলতে থাকে। তবে তাদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। তখন পর্যন্ত ইসলাম তেমন শক্তি অর্জন করতে পারেনি। রাসূলুল্লাহও (সাঃ) কোন রকম সাহায্য করতে সক্ষম ছিলেন না। তবে নামাযের পর সালামা ও তাঁর মত নির্যাতিতদের জন্য এই বলে দুআ করতেনঃ "হে আল্লাহ, ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদ, সালামা ইবন হিশাম ও আয়্যাশ ইবন রাবীয়াকে মক্কার মুশরিকদের কঠোরতা থেকে মুক্তি দাও"। ওয়ালীদের জীবনীতে সালামার মুক্তি ও মদীনায় হিজরতের ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

তিনি মক্কায় কাফিরদের হাতে বন্দী থাকা অবস্থায় বদর যুদ্ধ শেষ হয়। বদর যুদ্ধের পর, মতান্তরে খন্দক যুদ্ধের পর তিনি মদীনায় আসেন। মদীনায় আসার পর সংঘটিত সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুতার যুদ্ধে শত্রু বাহিনীর প্রচণ্ড আক্রমণে যারা ময়দান থেকে পালিয়েছিলেন তাদের মধ্যে তিনিও একজন। এই লজ্জা ও অনুশোচনায় পরবর্তী জীবনে তিনি ঘর থেকে বের হওয়া প্রায় ছেড়ে দেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মু সালামা থেকে ইবন ইসহাক বর্ণনা করেছেন। তিনি সালামা ইবন হিশামের স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেন, সালামার হয়েছে কি, আমি তাকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ও মুসলমানদের সাথে নামাযের জামায়াতে শামিল হতে দেখিনে কেন? সালামার স্ত্রী বললেনঃ আল্লাহর কসম, তিনি বের হতেই পারেন না। বের হলেই মানুষ তাঁকে দেখে চেঁচিয়ে বলতে থাকে-"ইয়া ফুররার, ফারারতুম ফী সাবীলিল্লাহ, ওহে পলাতক, আল্লাহর রাস্তা থেকে তোমরা পালিয়েছ"। এ কারণে তিনি বাড়ীতেই থাকেন, বাইরে কোথাও যান না। (সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩৮২-৮৩)। তবে হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) তাকে "কাররার" বা প্রচণ্ড আক্রমণকারী বলে সম্বোধন করতেন। (আল ইসাবা-২/৬৯)।

হযরত আবু বকর সিদ্দীকের (রাঃ) খিলাফতকালে তিনি শাম বা সিরিয়া অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। এই অভিযানের এক পর্যায়ে হযরত উমারের খিলাফতকালে হিজরী ১৪ সনের মুহাররম মাসে সংঘটিত "মারজে সফর" বা "মারজে রোম" নামক যুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন। তবে উরওয়া, মূসা ইবন উকবা, আবু যারয়া আদ দিমাশকীর মতে তিনি আজনাদাইন যুদ্ধে শহীদ হন। (আল ইসাবা-২৬৯)।

সালামার মা দাবায়া একটি কবিতায় বলেছেনঃ হে সম্মানিত কাবার প্রভূঃ কোন দুশ্চিন্তা নেই। সালামাকে প্রতিটি শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ী কর। অনিশ্চিত কর্মকান্ডে তাঁর দুটি হাত, যার একটি প্রকাশ পায় এবং অন্যটি দানশীল। (আনসাবুল আশরাফ-১/২০৮)।

      লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ
   আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
(বইঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথাদ্বিতীয় খন্ড)

ওয়ালীদ ইবনুল ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা (রাঃ)

নাম ওয়ালীদ, পিতা ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা। কুরাইশ গোত্রের বনী মাখযুম শাখার সন্তান। প্রখ্যাত সাহাবী ও সেনানায়ক হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ও হিশাম ইবনুল ওয়ালীদের ভাই। একটি বর্ণনায় জানা যায়, তিনি হিশামের সহোদর ও খালিদের বৈমাত্রীয় ভাই। 

হযরত রাসূলে কারীমের (সাঃ) মক্কী জীবনে ওয়ালীদ ইসলাম গ্রহণ করেননি। এ সময় মুসলমানদের সাথে তাঁর আচরণ কেমন ছিল, সীরাত গ্রন্থাবলীতে সে সম্পর্কে তেমন কিছু উল্লেখ নেই। তবে দেখা যায়, মক্কার কুরাইশ বাহিনীর সাথে যোগ দিয়ে বদর যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন এবং পরাজিত হয়ে হযরত আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ মতান্তরে সুলাইত ইবন কায়েসের (রাঃ) হাতে বন্দী হন। [আনসাবুল আশরাফ-১/৩০২]।

ওয়ালীদের অন্য দুই ভাই খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ও হিশাম ইবনুল ওয়ালীদ তাঁকে ছাড়িয়ে নিতে আসেন। আবদুল্লাহ ইবন জাহাশ চার হাজার দিরহাম মুক্তিপণ দাবী করেন। এত মোটা অংকের অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে খালিদ দ্বিধার ভাব প্রকাশ করেন। এতে হিশাম খুব রেগে গিয়ে খালিদকে বলেনঃ তোমার কি, তুমি তো আর তাঁর ভাই নও? আবদুল্লাহ যদি এর চেয়েও বেশি দাবী করে তবুও তাঁকে মুক্ত করতে হবে। ঐতিহাসিক ওয়াকিদী বলেনঃ ওয়ালীদ ‍তাঁর কাওমের ধর্মের ওপর থাকা অবস্থায় বন্দী হন এবং চার হাজার দিরহামের বিনিময়ে মুক্তিলাভ করেন। অন্য একটি বর্ণনা মতে, হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) ওয়ালীদের মুক্তির বিনিময়ে তার পিতার ঢাল, বর্ম ও তরবারী দাবী করেন। তাঁর ভাইয়েরা সেই দাবী পূরণ করে তাঁকে মুক্ত করেন। [আনসাবুল আশরাফ-১/২১০]।

ওয়ালীদ মুক্তি পেয়ে ভাইদের সাথে মক্কার পথে যাত্রা করলেন। যুল-হুলাইফা নামক স্থানে পৌঁছার পর ভাইদের নিকট থেকে পালিয়ে আবার মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নিকট ফিরে আসেন এবং ইসলাম গ্রহণ করেন। তাঁর ভাইয়েরা ফিরে এসে আবার তাঁর সাথে দেখা করে বলেন, যদি তোমার মুসলমান হওয়ার ইচ্ছা ছিল, তাহলে মুক্তিপণ দেওয়ার পূর্বে হলে না কেন? শুধু শুধু পিতার স্মৃতিচিহ্নগুলি নষ্ট করলে। ওয়ালীদ তাদেরকে বলেন, অন্য কুরাইশদের মত আমিও মুক্তিপণ প্রদান করে মুক্ত হতে চেয়েছিলাম। মুক্তির পূর্বে আমি ইসলামের ঘোষণা এ জন্য দেইনি যে, যাতে কুরাইশরা এমন কথা বলতে না পারে, আমি ফিদিয়া বা মুক্তিপণ দেওয়ার ভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছি।

ইসলাম গ্রহণের পর তিনি ভাইদের সাথে আবার মক্কার পথে যাত্রা করেন। পথে তাঁর ভাইয়েরা তো তেমন কিছু বললো না। কিন্তু মক্কায় পৌঁছে অন্যান্য অত্যাচারিত মুসলমানদের মত ‍তাঁঁকেও বন্দী করলো এবং তাঁঁর মত অন্য বন্দী-আইয়াশ ইবন রাবীয়া, হিশাম ইবনুল আস, সালামা ইবন হিশাম প্রমুখের সাথে এক ঘরে আটক করলো।

ঐতিহাসিকরা বলেছেন, এসব বন্দীদের ওপর কুরাইশরা অমানুষিক নির্যাতন চালাতো। তাদের হত্যারও হুমকি দেয়া হতো।

কালবী বলেনঃ যাদের কোন গোত্রীয় শক্তি বা জনবল ছিল না এমন একটি দূর্বল সম্প্রদায়কে ইসলাম গ্রহণের কারণে শাস্তি দেওয়া হয়েছিল। তাদের অনেকে দ্বীন ত্যাগ করেছে, অনেকে ইসলামে অটল থেকেছে, আবার অনেকে ঈমান না হারিয়ে তাদের আদেশ পালন করেছে। অভিজাত ঘরের অনেকে ইসলাম গ্রহণ করে পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছে। যেমনঃ সালামা ইবন হিশাম ইবনুল মুগীরা, ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদ ইবনুল মুগীরা, আইয়াশ ইবন রাবীয়া প্রমূখ। [আনসাবুল আশরাফ-১/১৯৭]।

ইবন ইসহাক বলেন, ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদ ইবন মুগীরা যখন ইসলাম গ্রহণ করেন, বনু মাখযুমের একদল লোক তাঁর ভাই হিশাম ইবন ওয়ালীদ ইবন মুগীরার নিকট যায় এবং ওয়ালীদকে হত্যার জন্য তাদের হাতে তুলে দেওয়ার আবদার জানায়। তাদের যুক্তি ছিল, তাঁকে হত্যা করলে অন্যদের ব্যাপারে তারা নিরাপদ হতে পারবে। হিশাম তাদের সেই আবদার অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন। তিনি আরও হুমকি দেন, কেউ তাঁর ভাই ওয়ালীদকে হত্যা করলে তিনি তাদের সর্বাধিক মর্যাদাবান এক ব্যক্তিকে হত্যা করে প্রতিশোধ নেবেন। এই চরম হুমকির মুখে তারা ওয়ালীদকে হত্যার আশা ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। [সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩২১]।

বদর যুদ্ধের পূর্বে হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) আইয়াশ ইবন রাবীয়া, সালামা ইবন হিশাম, হিশাম ইবন আস প্রমূখের মুক্তির জন্য আল্লাহর দরবারে দুআ করতেন। বদর যুদ্ধের পর ওয়ালীদ বন্দী হয়ে তাঁদের সাথে যুক্ত হলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর নাম ধরেও দুআ করতে লাগলেন। বায্‌যার আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নামাযে সালাম ফিরানোর পর মাথা উঁচু করলেন এবং কিবলামূখী অবস্থায় বললেনঃ হে আল্লাহ, তুমি সালামা ইবন হিশাম, আইয়াশ ইবন রাবীয়া, ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদ এবং ঐ সকল দূর্বল মুসলমানকে মুক্তি দাও যারা কোন কৌশল অবলম্বনে অক্ষম এবং যাদের কোন পন্থা জানা নেই। অন্য একটি বর্ণনা মতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সালাতুল ফজরে এই দুআ করতেন। [হায়াতুস সাহাবা-৩/৩৪৮]।

বেশ কিছুদিন তাঁর বন্দী দশায় কাটে। একদিন সুযোগ বুঝে তিনি মদীনায় পালিয়ে আসেন। হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) তাঁর কাছে আইয়াশ ও ‍সালামার অবস্থা জিজ্ঞেস করেন। ওয়ালীদ বলেন, তাঁদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। একটি বেড়ী দুজনের পায়ে লাগানো হয়েছে। হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) তাঁকে বললেনঃ তুমি আবার মক্কায় যাও। সেখানকার এক কর্মকার ইসলাম গ্রহণ করেছে। প্রথমে তাঁর ওখানে গিয়ে ওঠো। তারপর গোপনে আইয়াশ ও সালামার সাথে দেখা করে বল, তুমি আমার প্রতিনিধি, আমার সাথে চলো।

রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নির্দেশ মত ওয়ালীদ মক্কায় পৌঁছলেন এবং আইয়াশ ও সালামার সাথে দেখা করে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) বাণী তাঁদের কাছে পৌঁছে দিলেন। পরিকল্পনা মত তাঁরা মক্কা থেকে পালিয়ে মদীনার দিকে যাত্রা করলেন। খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ তাঁদের পিছু ধাওয়া করেন; কিন্তু ধরতে ব্যর্থ হয়ে মক্কায় ফিরে যান।

এদিকে ওয়ালীদ তাঁর সঙ্গীদ্বয়সহ একটানা ভ্রমণ ও অজানা শঙ্কায় ক্লান্তিতে অসাড় হয়ে পড়ছিলেন। এই সময় কবিতার একটি শ্লোক বারবার তাঁর মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছিলঃ ওহে আমার চরণ যুগল! আমাকে আমার কাওমের নিকট পৌঁছে দাও। আজকের এ দিনটির পর আর কখনও তুমি অলস দেখতে পাবে না।

আজবাস নামক স্থানে তিনি পড়ে গেলে একটি অঙ্গুলি মারাত্মকভাবে আহত হয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। তিনি আহত অঙ্গুলিটিকে উদ্দেশ্য করে একটি শ্লোক আওড়াতে থাকেনঃ ওহে, তুমি একটি অঙ্গুলি ছাড়া আর কিছু নও, যা থেকে রক্ত ঝরেছে। যা কিছু তুমি লাভ করেছ, তা সবই আল্লাহর রাস্তায়। [আনসাবুল আশরাফ-১/২০৯-২১০]।

হুদাইবিয়ার ‍চুক্তি অনুযায়ী হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) হিজরী সপ্তম সনে বিগত বছরের কাজা উমরা আদায় করতে মক্কায় যান। ওয়ালীদ এ সময় রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সফরসঙ্গী ছিলেন। তখনও তাঁর ভাই খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ ইসলাম গ্রহণ করেননি। এ সম্পর্কে হযরত খালিদ ইবনুল ওয়ালীদ বলেনঃ হুদাইবিয়ার সন্ধির পর আমি যখন দারুণ অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি, তখন হিজরী ৭ম সনে যুল-কাদাহ্‌ মাসে হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) উমরাতুল কাযা আদায়ের উদ্দেশ্যে মক্কায় প্রবেশ করলেন। তাঁদের কারও সামনে পড়তে হয় এই আশংকায় আমি আত্মগোপন করে থাকলাম। তাঁদের কারও সাথে আমার দেখা হলো না। আমার ভাই ওয়ালীদ ইবনুল ওয়ালীদ এই সফরে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সঙ্গী ছিলেন। তিনি আমাকে খুঁজে না পেয়ে আমাকে একটি চিঠি লিখেন। চিঠির বিষয়বস্তু নিম্নরূপঃ

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। অতঃপর ইসলামের ব্যাপারে আপনার এমন বিরূপ মনোভাব পোষণের কারণে আপনাকে আমার খুব আশ্চর্য মানুষ বলে মনে হয়েছে। অথচ আপনি একজন বড় বুদ্ধি ও প্রজ্ঞার অধিকারী ব্যক্তি। আপনার মত কোন ব্যক্তি কি ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতে পারে? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আপনার সম্পর্কে আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেনঃ খালিদ কোথায়? আমি বলেছিঃ শিগগিরই আল্লাহ তাঁকে নিয়ে আসবেন। তিনি তখন বললেনঃ তাঁর মত ব্যক্তি কি ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতে পারে? তাঁর বুদ্ধি ও চেষ্টা যদি মুসলমানদের পক্ষে হতো, তাহলে তা তাঁর কল্যাণ বয়ে আনতো এবং আমি তাঁকে অন্যদের চেয়ে বেশী মর্যাদা দিতাম। ভাই, যে ভালো কাজ আপনার হাতছাড়া হয়ে গেছে, এখনই আপনি এসে তাতে শরিক হউন। মূলতঃ এই চিঠি পেয়ে হযরত খালিদ ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন এবং অল্পদিনের মধ্যে মদীনার দিকে যাত্রা করেন। [হায়াতুস সাহাবা-১/১৬০, উসুদুল গাবা-৫/৯৩]।

হযরত ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদের মৃত্যুর সময়কাল সম্পর্কে দুটি বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনা মতে তিনি আইয়াশ ও সালামাকে মুক্ত করে মদীনায় ফিরে অল্প কিছুদিনের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। এই বর্ণনা মতে, মদীনায় পৌঁছে তিনি সরাসরি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নিকট হাজির হয়ে বলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমি মৃত, আপনার পরিত্যক্ত একটু কাপড় দিয়ে আমাকে কাফন দিন। অতঃপর তিনি মারা যান এবং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) স্বীয় কাপড় দিয়ে তাঁকে কাফন দেন। [আল-ইসাবা-৩/৬৪০, আনসাবুল আশরাফ-১/২১০-২১১]।

কিন্তু উপরোক্ত বর্ণনা সঠিক বলে মনে হয় না। কারণ, একাধিক বর্ণনায় জানা যায়, তিনি হিজরী ৭ম সনে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সাথে উমরাতুল কাযা আদায়ে শরিক ছিলেন। আল্লামা ইবন আবদিল বার লিখেছেনঃ আর এ কথা সঠিক যে, তিনি উমরাতুল কাযা রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সাথে অংশ গ্রহণ করেন। আর উমরাতুল কাযা হিজরী ৭ম সনের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে প্রথম বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় উমরাতুল কাযার দুই বছর পূর্বে হিজরী ৫ম সনে তাঁর ওফাত হয়।

তাছাড়া ওয়াকিদী বলেছেনঃ কেউ কেউ মনে করেন, ওয়ালীদ মক্কা থেকে পালিয়ে আবু বাসীরের দলের সাথে যোগ দেন। উল্লেখ্য যে, এই আবু বাসীর হুদাইবিয়ার সন্ধির পর মদীনায় আসেন। হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) সন্ধির শর্ত অনুযায়ী ‍তাঁকে মক্কায় ফেরত পাঠান। কিন্তু পথিমধ্যে তাঁর এক সঙ্গীকে হত্যা করে আবার মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নিকট ফিরে আসেন। তিনি আবু বাসীরকে মদীনা ত্যাগের নির্দেশ দেন। আবু বাসীর মদীনা ত্যাগ করে লোহিত সাগরের উপকূল এলাকায় চলে যান। এরপর মক্কার আরও কিছু নও মুসলিম যুবক তাঁর সাথে যোগ দেন। তাঁরা কুরাইশদের বাণিজ্য কাফিলা আক্রমণ করে লুটপাট করতেন। ফলে কুরাইশদের ব্যবসা-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। অতঃপর কুরাইশরা অনন্যোপায় হয়ে এই দলটিকে মদীনায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) অনুরোধ জানায়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁদেরকে মদীনায় ডেকে পাঠান। [আনসাবুল আশরাফ-১/২১০-২১১]। তবে বালাযুরী এই বর্ণনাকে সঠিক বলে মনে করেননি। যাই হউক হিজরী অষ্টম সনের পরে যে তিনি জীবিত ছিলেন এমন কোন প্রমাণ সীরাত গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায় না।

উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মু সালামা ছিলেন ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদের চাচাতো বোন। ওয়ালীদের মৃত্যুর পর তিনি রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! সে বিদেশ-বিভূঁয়ে মারা গেছে। তাঁর জন্য শোক প্রকাশের কেউ এখানে নেই। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে শোক প্রকাশের অনুমতি দান করেন। উম্মু সালামা রাসূলুল্লাহর (সাঃ) অনুমতি পেয়ে খাবার তৈরী করেন এবং পাড়ার অন্য মহিলাদের ডেকে ‍আনেন। হযরত উম্মু সালামা (রাঃ) একটি মরসিয়া বা শোকগাঁথা আবৃত্তি করতে শুরু করেন। তার দুটি শ্লোক নিম্নরূপঃ

ওহে চোখ, তুমি ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদ ইবন মুগীরার জন্য কাঁদ। আমাদের মধ্যে সে ছিল খরার সময় বৃষ্টি ও রহমত স্বরূপ। নামকাম ও গৌরবে সে ছিল তাঁর পিতার মত। সে তাঁর গোত্রের জন্য একাই যথেষ্ট।

হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) মরসিয়াটি শোনার সাথে সাথে বলে উঠলেনঃ উম্মু সালামা, এ কথা না বলে বরং বলঃ মৃত্যু যন্ত্রনা সত্যই আসবে। আর এ থেকেই তোমরা অব্যাহতি চেয়ে এসেছো। [সূরা কাফ-১৯, আনসাবুল আশরাফ-১/২১০-২১১, আল ইসাবা-৩/৬৪০]।

ইবন হিশাম বলেনঃ মুজাহিদের সূত্রে আমার নিকট পৌঁছেছে। তিনি বলেছেন সূরা ফাত্হ‌এর নিম্নের আয়াতটি ওয়ালীদ ইবন ওয়ালীদ, সালামা ইবন হিশাম, আইয়াশ ইবন রাবীয়া, আবু জান্দাল ইবন সুহাইল ও তাঁদের মত আর যাঁরা ছিলেন তাঁদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছেঃ তোমাদেরকে যুদ্ধের আদেশ দেওয়া হতো, যদি ‍না এমন কিছু মুমিন নর ও নারী থাকতো, যাদেরকে তোমরা জানো না। তোমরা অজ্ঞাতসারে তাদেরকে পদদলিত করতে। ফলে, তাদের কারণে তোমরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে।” [সূরা আল-ফাতহঃ ২৫, সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩২১]।

       লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ
   আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
(বইঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথাদ্বিতীয় খন্ড)

আমর ইবন আবাসা (রাঃ)

তাঁর নাম আমর, আবু নাজীহ কুনিয়াত বা ডাকনাম। পিতা ‍আবাসা ইবন আমের এবং মাতা রামলা বিনতুল ওয়াকীয়া। প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আবুযার আল-গিফারীর (রাঃ) বৈপিত্রীয় ভাই। [আল ইসাবা-৩/৫]।

জীবনের প্রথম থেকেই আমর ছিলেন সৎ প্রকৃতির লোক। জাহিলী যুগে যখন গোটা আরব মূর্তি পূজায় লিপ্ত তখনও তিনি এ কাজকে ঘৃণা এবং মূর্তি পূজারীদের পথভ্রষ্ট বলে মনে করতেন। তিনি নিজেকে ইসলামের চতুর্থ ব্যক্তি অথবা ইসলামের এক-চতুর্থাংশ বলে দাবী করতেন। তাঁর কাছে যখন জানতে চাওয়া হলো, আপনি কিসের ভিত্তিতে এ দাবী করেন? তিনি বললেনঃ জাহিলী যুগে আমি মানুষকে পথভ্রষ্ট বলে বিশ্বাস করতাম। মূর্তির কোন গুরুত্ব আমার কাছে ছিল না। আমি জানতাম, এগুলি যেমন কোন ক্ষতি করতে পারে না, তেমনি কোন উপকারও করতে পারে না। কারণ, তারা পাথরের মূর্তির পূজা করতো। এ সময় আমি একজন আহলি কিতাব বা ঐশী ধর্মে বিশ্বাসী ব্যক্তির নিকট সর্বোত্তম দ্বীন সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি বললেনঃ মক্কায় এক ব্যক্তির আবির্ভাব হবে। তিনি নিজ কাওমের ইলাহ বা উপাস্য পরিত্যাগ করে অন্য ইলাহর দিকে মানুষকে আহবান জানাবেন। তিনিই সর্বোত্তম দ্বীন নিয়ে আসবেন। তুমি তাঁর আবির্ভাবের কথা শুনতে পেলে তাঁকে অনুসরণ করবে।

আমর বলেন, এমন সময় আমি মক্কা থেকে একটি সংবাদ পেলাম। মক্কায় নতুন কোন ঘটনা ঘটেছে কিনা─ এ কথা আমি কারও কাছে জিজ্ঞেস করতে সাহস পেলাম না। অবশেষে পশুর পিঠে সওয়ার হয়ে আমি মক্কায় পৌঁছলাম। সেখানে এক আরোহীকে প্রশ্ন করলে সে বললোঃ এখানে এমন এক ব্যক্তির আবির্ভাব হয়েছে যে তাঁর কাওম বা স্বজাতীয় ইলাহকে ঘৃণা করে। আমি গোপনে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সাথে সাক্ষাত করলাম। কারণ, তখন তাঁর স্বজাতীয় লোকেরা চরমভাবে তাঁর বিরোধিতা করছে। অন্য একটি বর্ণনা মতে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সাথে আমরের এ সাক্ষাত হয় উকাজ মেলায়। প্রথম সাক্ষাতে তাদের কথোপকথন ছিল নিম্নরূপঃ

আমর প্রশ্ন করেনঃ আপনি কে?

-আমি আল্লাহর নবী।

-আল্লাহ কি আপনাকে পাঠিয়েছেন?

-হ্যাঁ।

-কি কি জিনিস সহকারে পাঠিয়েছেন?

-আল্লাহকে এক বলে বিশ্বাস করবে, তাঁর সাথে কোন কিছু শরিক করবে না, মূর্তি ভেঙ্গে ফেলবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখবে।

– কেউ কি এ দাওয়াত কবুল করেছে?

-হ্যাঁ, একজন আযাদ, একজন দাস।

আমর বলেন, সে দুজন হলেন আবু বকর ও বিলাল। অতঃপর আমর আরজ করেন, আমাকেও আল্লাহর উপাসকদের মধ্যে শরীক করে নিন। আমি আপনারই সাথে থাকবো। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, যখন চারদিক থেকে আমার বিরোধিতা চলছে তখন কিভাবে তুমি আমার সাথে থাকবে? এখন তোমার স্বদেশ ভূমিতে ফিরে যাও। যখন আমি প্রকাশ্যে দাওয়াত দিতে শুরু করি তখন আমার নিকট চলে এসো। আমর বলেন, এভাবে আমি ইসলাম গ্রহণ করি এবং নিজেকে ইসলামের এক-চতুর্থ হিসেবে দেখতে পাই। [আল ইসাবা-৩/৬, হায়াতুস সাহাবা-১/৭১-৭২]।

রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নির্দেশমত আমর ইসলাম গ্রহণ করে স্বগোত্রে ফিরে যান। তবে মক্কায় যাতায়াতকারীদের মাধ্যমে সব সময় রাসূলুল্লাহর (সাঃ) খোঁজ খবর রাখতেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মদীনায় হিজরতের পর ইয়াসরিব বা মদীনার কিছু লোক আমরের গোত্রে আসে। তিনি তাদের কাছে জিজ্ঞেস করেন, মক্কা থেকে যে লোকটি মদীনায় এসেছেন, তাঁর অবস্থা কি? তারা বললো, দলে দলে লোক তাঁর দিকে ছুটে আসছে। তাঁর স্বজাতি তো তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল! কিন্তু পারেনি। এখন তিনি মদীনায়।

তাঁদের কাছে এই খবর পেয়ে আমর মদীনায় রওয়ানা হয়ে গেলেন। মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নিকট উপস্থিত হয়ে নিজের পরিচয় দিলে তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, তোমাকে আমি চিনেছি, মক্কায় তুমি আমার সাথে দেখা করেছিলে। তখন থেকে আমর মদীনার স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে যান।

হযরত আমরের মদীনায় আগমনের সময় সম্পর্কে মতভেদ আছে। একটি মতে তিনি বদর যুদ্ধের পূর্বে মদীনায় আসেন এবং বদরে অংশগ্রহণ করেন। তবে প্রসিদ্ধ মতে তিনি খাইবার যুদ্ধের পরে এবং মক্কা বিজয়ের পূর্বে মদীনায় আসেন। [আল ইসাবা-৩/৫]।

বদর, উহুদ, হুদাইবিয়া, খাইবার সহ বিভিন্ন যুদ্ধ তাঁর স্বদেশ থাকাকালেই শেষ হয়ে যায়। মক্কা বিজয় অভিযানে তিনি সর্বপ্রথম অংশগ্রহণ করেন। তায়িফ অভিযানেও যে তিনি শরিক ছিলেন, এমন বর্ণনা পাওয়া যায়। তিনি নিজেই বর্ণনা করেছেন। তায়িফ অবরোধকালে হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) বললেনঃ যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় একটি তীর নিক্ষেপ করবে, তার জন্য জান্নাতের একটি দরযা খুলে যাবে। এই সুসংবাদ শুনে আমি ১৬টি তীর নিক্ষেপ করি। তায়িফ অভিযানের পর আর কোন যুদ্ধে তাঁর যোগদানের কথা সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। তবে এতটুকু জানা যায় যে, তিনি আরও কিছু যুদ্ধে যোগদান করেন।

হযরত আমর ইবন আবাসার (রাঃ) মৃত্যুর সময়কাল সঠিকভাবে জানা যায় না। সীরাত বিশেষজ্ঞরা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বলেছেন, তিনি খলীফা হযরত উসমানের (রাঃ) খিলাফতের শেষ দিকে মৃত্যুবরণ করেছেন। সুতরাং আল-ইসাবা ফী-তাময়ী যিস সাহাবা গ্রন্থকার আল্লামা ইবন হাজার আল-আসকালানী শুধু এই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে─ যেহেতু আলী (রাঃ)-মুয়াবিয়ার দ্বন্দ্ব এবং আমীর মুয়াবিয়ার খিলাফতকালে কোথাও তাঁকে দেখা যায় না─ উসমানী খিলাফতের শেষদিকে তাঁর মৃত্যুকাল উল্লেখ করেছেন। [আল ইসাবা-৩/৬]। কিন্তু মুসনাদে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের এক বর্ণনায় জানা যায়, আমীর মুয়াবিয়া ও রোমানদের মধ্যে একটি চুক্তি হয়। এই চুক্তির কারণে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আমীর মুয়াবিয়া রোমানদের ওপর আক্রমণ চালাতে পারতেন না। কিন্তু হযরত মুয়াবিয়া পরিকল্পনা করেন, তার বাহিনী রোমানদের সীমান্তে পৌঁছে যাবে, আর এদিকে চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়ে যাবে। অতঃপর তার বাহিনী সাথে সাথে হামলা চালিয়ে দেবে। এ সময় আমর ইবন আবাসা চিৎকার করে বলে বেড়াতেন, অঙ্গীকার পূর্ণ কর, ধোঁকা দিও না।

উপরোক্ত বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় তিনি আমীর মুয়াবিয়ার খিলাফতকাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। কিন্তু যদি আল-ইসাবা গ্রন্থকারের মতটি সত্য ধরা হয়, তাহলে এই ঘটনাটি ছিল উসমানী খিলাফতকালের, যখন হযরত মুয়াবিয়া শামের গভর্ণর ছিলেন। তখনও রোমানদের সাথে তার সংঘর্ষ হয়েছিল।

হযরত আমর ইবন আবাসা (রাঃ) রাসূলুল্লাহর (সাঃ) মুহাব্বত বা সাহচর্যের খুব বেশি সুযোগ পাননি। তবে যতটুকু পেয়েছেন তা পুরোপুরি কাজে লাগাতে চেষ্টা করেছেন। আমরা তার প্রমাণ পাই মদীনায় রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সাথে তাঁর প্রথম সাক্ষাতে। তিনি আরজ করেন─ আল্লিমনী মা আল্লামাকাল্লাহু─ আল্লাহ আপনাকে যা শিখিয়েছেন তার কিছু আমাকেও শিখিয়ে দিন। এ কারণে এত কম সময়ের সাহচর্য সত্ত্বেও হাদীসের গ্রন্থাবলীতে তার বর্ণিত মোট ৪৮টি হাদীস দেখা যায়।

সাহাবীদের মধ্যে ইবন মাসউদ, আবু উমামা আল বাহিলী, সাহল ইবন সাদ, এবং তাবেঈদের মধ্যে শুরাহবীল ইবন সামাত, সাদান ইবন আবী তালহা, সুলাইম ইবন আমের, আবদুর রহমান ইবন আমের, জুবাইর ইবন নাফীর, আবু সালাম ও অন্যরা তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। [আল ইসাবা-৩/৫]।

আবু নুঈম কাবের মাওলা বা আযাদকৃত দাস থেকে একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ একদিন আমর ইবন আবাসা পশু চরাতে গেলেন। আমি তাঁর খোঁজে দুপুরে বের হলাম। আমি দেখতে পেলাম, আমর একস্থানে ঘুমিয়ে আছেন এবং একখানি মেঘ তাঁর ওপর ছায়া দিচ্ছে। আমি তাকে জাগালাম। তিনি জেগে আমাকে বললেন, এই ব্যাপারটি আমার ও তোমার মধ্যে গোপন থাকুক। অন্য কারও নিকট প্রকাশ করলে তোমার ভালো হবে না। আমি তাঁর জীবদ্দশায় এ কথা কারও নিকট বলিনি। [আল-ইসাবা-৩/৬]।

      লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ
   আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
(বইঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথাদ্বিতীয় খন্ড)

সাওবান ইবন নাজদাহ (রাঃ)

নাম সাওবান, পিতার নাম নাজদাহ, কুনিয়াত বা ডাকনাম আবু আবদিল্লাহ। ইয়েমেনের প্রসিদ্ধ হিময়ার গোত্রের সন্তান। [আসাহ্‌হুস্‌ সিয়ার-৫৯৯]। কোন কারণে তিনি দাসে পরিণত হন। হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) তাকে খরীদ করেন এবং পরে আযাদ করে দেন। আযাদ করার সময় তিনি সাওবানকে বলেন, ইচ্ছা করলে তুমি স্বগোত্রীয় লোকদের কাছে চলে যেতে পার অথবা আমার সাথে থাকতে পার। আমার সাথে থাকলে আমার পরিবারের সদস্য বলে গণ্য হবে। সাওবান নিজ গোত্রে ফিরে যাওয়ার চেয়ে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সাহচর্যে থাকাকেই শ্রেয় মনে করেন।

হযরত রাসূলে কারীমের ওফাতের পর অল্প কিছুদিন তিনি মদীনায় ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ছাড়া মদীনা তাঁর কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। তিনি মদীনা ছেড়ে শামের রামলা নামক স্থানে বসবাস শুরু করেন। মিসর অভিযানে তিনি অংশগ্রহণ করেন এবং রামলা’ ছেড়ে হিমসে বসতি স্থাপন করেন। এই হিমসে হিজরী ৫৪ সনে তিনি ইনতিকাল করেন।

হযরত সাওবান ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাঃ) বিশেষ খাদেম। ভেতর বাহির সর্ব অবস্থায় তিনি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সঙ্গ লাভের সুযোগ পান। এ কারণে স্বাভাবিকভাবে উলুমে নববী বা নবীর জ্ঞান সমূহে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তার থেকে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) ১২৭টি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি হাদীস হিফজ বা মুখস্থ করার সাথে সাথে প্রচার ও প্রসারের দায়িত্বও পালন করতেন। আল্লামাহ্‌ ইবন আবদিল ‍বার বলেছেন, সাওবান সেই সব লোকদের একজন যাঁরা হাদীস মুখস্থ করণের সাথে সাথে তার প্রচারের কাজও করেছেন।

হযরত সাওবানের প্রচুর হাদীস মুখস্থ থাকায় অসংখ্য লোক তা শোনার জন্য তাঁর নিকট আসতো। একবার লোকেরা তাঁর নিকট হাদীস শোনার আগ্রহ প্রকাশ করলে তিনি বলেনঃ কোন মুসলমান আল্লাহর উদ্দেশ্যে একটি সিজদাহ করলে আল্লাহ তাঁর একটি মর্যাদা বৃদ্ধি করে দেন এবং তাঁর গোনাহ সমূহও মাফ করে দেন। [মুসনাদে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল-৫/২৭৬]।

হযরত সাওবানের যুগের প্রখ্যাত মুহাদ্দিসগণ অন্যদের নিকট থেকে শ্রুত তাঁদের হাদীস সমূহের সত্যাসত্য তাঁর নিকট থেকে যাচাই করতেন। সা’দান ইবন তালহার মত উচু স্তরের একজন হাদীস বিশারদ হযরত আবু দারদার (রাঃ) নিকট থেকে একটি হাদীস শোনেন এবং তাঁর সত্যাসত্য যাচাই করেন হযরত সাওবানের নিকট থেকে। হযরত রাসূলে কারীমের (সাঃ) ওফাতের পর তিনি মদীনার অন্যতম মুজতাহিদ সাহাবী হিসাবে পরিগণিত হন। [আলামুল মুওয়াক্কিরীন -১/১৫]।

হযরত সাওবানের ছাত্রদের গন্ডিও ‍সুপ্রশস্ত। সা’দান ইবন তালহা, রাশেদ ইবন সাদ, জুবাইর ইবন নুদাইর, আব্দুর রহমান ইবন গানাম, আবু ইদরীস প্রমূখ ছিলেন তাঁর উল্লেখযোগ্য ছাত্র।

হযরত রাসূলে কারীমের (সাঃ) প্রতি তাঁর এত বেশি ভক্তি ও শ্রদ্ধা ছিল যে, রাসূলুল্লাহর (সাঃ) প্রতি বিন্দুমাত্র অশ্রদ্ধার ভাব প্রকাশ পায় এমন কোন একটি শব্দও তিনি অমুসলিমের মুখ থেকে শুনে সহ্য করতে পারতেন না। একবার এক ইয়াহুদী রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নিকট এসে বললোঃ আসসালামু আলাইকা ইয়া মুহাম্মাদ। সাথে সাথে সাওবান ক্রোধে ফেটে পড়লেন। তিনি সেই ইয়াহুদীকে এমন জোরে এক ধাক্কা দিলেন যে বেচারা পড়তে পড়তে কোন রকম টাল সামলাল। লোকটি একটু স্থির হয়ে তাঁর এত রাগের কারণ কি তা জানতে চাইলো। সাওবান বললেনঃ তুমি কেন ইয়া রাসূলুল্লাহ না বলে ইয়া মুহাম্মাদ বললে? লোকটি বললো, এতে এমন কি অপরাধ হয়েছে? আমি তাঁর খান্দানী নামই উচ্চারণ করেছি। রাসূল (সাঃ) তার কথায় সায় দিয়ে বললেন, হ্যাঁ, আমার খান্দানী নাম মুহাম্মাদ।

নবুওয়াতের সম্মান তো বিরাট ব্যাপার। রাসূূলুল্লাহর (সাঃ) সাথে তাঁর যে গোলামী বা দাসত্বের সম্পর্ক ছিল তাও যদি কেউ উপেক্ষা বা অবহেলার দৃষ্টিতে দেখতো, তিনি তাঁকে সতর্ক করে দিতেন। হিমসে অবস্থান কালে একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। হিমসের তৎকালীন ওয়ালী আবদুল্লাহ ইবন কারাত ইযদী যখন তাঁকে দেখতে এলেন না, তখন তিনি একটি চিঠিতে লিখলেনঃ যদি মূসা ও ঈসার দাস তোমার এখানে থাকতো, তুমি তাঁর অসুস্থতা সম্পর্কে খোঁজ নিতে বা দেখতে যেতে। এই চিঠি পেয়ে ওয়ালী এমন ব্যস্ততার সাথে বাড়ী থেকে বের হন যে, লোকেরা মনে করে নিশ্চয় বিরাট কোন কিছু ঘটেছে। এ অবস্থায় তিনি হযরত সাওবানের বাড়ী পৌঁছেন এবং দীর্ঘক্ষণ তাঁর পাশে বসে থাকেন।

হযরত রাসূলে কারীমের (সাঃ) নির্দেশ পালনের ব্যাপারে তিনি এত বেশি সচেতন ছিলেন যে, একবার যে নির্দেশ তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে লাভ করেছেন আজীবন তা পালন করেছেন এবং কোন নির্দেশ অমান্য করার বিন্দুমাত্র আশংকা থাকে এমন কাজ তিনি কখনও করেননি। তাবারানী আবু উমামা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেনঃ কে বাইয়াত করবে? সাওবান বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমরা তো বাইয়াত করেছি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেনঃ কারও কাছে কোন কিছু চাইবে না─ এ কথার উপর বাইয়াত। সাওবান বললেনঃ কিসের জন্য ইয়া রাসূলুল্লাহ! বললেনঃ জান্নাতের জন্য। সাওবান এ কথার উপর বাইয়াত করলেন। আবু উমামা বলেনঃ আমি তাঁকে মক্কায় মানুষের ভিড়ের মধ্যে সওয়ারী অবস্থায় দেখেছি। এ অবস্থায় তাঁর হাত থেকে চাবুকটি পড়ে যায়। সম্ভবতঃ তা এক ব্যক্তির ঘাড়ের উপর পড়ে এবং সে চাবুকটি ধরে ফেলে। অতঃপর সে তা সাওবানের হাতে তুলে দিতে চায়! কিন্তু তিনি তা গ্রহণ না করে বাহন থেকে নেমে এসে নিজ হাতে তুলে নেন। [হায়াতুস সাহাবা-১/২৪২]।

অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেনঃ মানুষের কাছে সাওয়াল করবে না, এ নিশ্চয়তা যে আমাকে দেবে আমি তাকে জান্নাতের নিশ্চয়তা দিচ্ছি। এ কথা শুনে সাওবান বলে উঠলেনঃ আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি। এরপর তিনি কারও কাছে কিছু চাইতেন না। [আল ইসাবা-১/২০৪]।

ইউসুফ ইবন আবদিল হামীদ বর্ণনা করেছেন। সাওবান আমাকে বলেছেন, একবার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর আহল বা পরিবারবর্গের জন্য দুআ করলেন। আমি বললাম, আমিও তো আহলি বাইতের (আপনার পরিবারবর্গের) অন্তর্গত। তৃতীয়বার তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, তুমি আমার পরিবারের অন্তর্গত। তবে ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ তুমি কোন বন্ধ দরজায় না দাঁড়াবে অথবা কোন আমীরের কাছে কিছু চাইতে না যাবে। [আল-ইসাবা-১/২০৪]।

এই সব নির্দেশের পর তিনি জীবনে আর কখনও কারও নিকট কোন কিছু চাননি বলে ইতিহাসে জানা যায়।

        লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবু
    আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
(বইঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথাদ্বিতীয় খন্ড)

তুলাইব ইবন উমাইর (রাঃ)

নাম তুলাইব, ডাকনাম আবু আদী। পিতা উমাইর ইবন ওয়াহাব, মাতা রাসূলুল্লাহর (সাঃ) ফুফু আরওয়া বিনতু আবদুল মুত্তালিব। কুরাইশ বংশের বনী-আবদী শাখার সন্তান। [আনসাবুল আশরাফ-১/৮৮]।

হযরত তুলাইবের জন্ম ও ইসলাম পূর্ব জীবন সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। ইসলামের সূচনা পর্বেই যে তিনি এ কাফিলায় শরিক হন সে কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়। ইতিহাসে বর্ণিত কিছু কিছু ঘটনা দ্বারা বুঝা যায়, তার মামাতো ভাই মুহাম্মাদ (সাঃ) ও তাঁর দ্বীনের প্রতি ছিল তাঁর সীমাহীন ভক্তি ও ভালোবাসা। রাসূলুল্লাহর (সাঃ) প্রতি কুরাইশদের বৈরী আচরণে তুলাইব ছিলেন সব সময় ক্রুদ্ধ। রাসূলুল্লাহর (সাঃ) প্রতি কুরাইশদের রূঢ় আচরণের কঠিন জবাবও তিনি মাঝে মাঝে দিতেন। আর এসব কাজে তাঁর নেককার মা তাঁকে সব সময় সমর্থন জানাতেন।

আল-হারেস আত-তাঈমী বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মক্কার দারুল আরকাম বা আরকামের গৃহে অবস্থানকালে তুলাইব’ ইবন উমাইর ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর সেখান থেকে বের হয়ে সোজা মা আরওয়া বিনতু আবদুল মুত্তালিবের নিকট উপস্থিত হন। মাকে বলেনঃ মা, আমি মুহাম্মাদের (সাঃ) অনুসরণ করেছি, আল্লাহর নিকট নিজেকে সমপর্ণ করেছি। মা বললেনঃ তোমার সাহায্য ও সহযোগিতার জন্য সবচেয়ে বেশি উপযুক্ত ব্যক্তি হচ্ছেন তোমার মামার ছেলে। পুরুষদের যে শক্তি ও ক্ষমতা আছে আমার তা থাকলে আমি অবশ্যই মানুষের হাত থেকে তাকে বাঁচাতাম। তুলাইব বললেনঃ মা, ইসলাম গ্রহণ করে তার অনুসারী হতে আপনার সামনে কিসের বাধা? আপনার ভাই হামযা, তিনি তো ইসলাম গ্রহণ করেছেন। মা বললেনঃ আমার অন্য বোনেরা কি করে, আমি সেই প্রতীক্ষায় আছি। আমি তাদের সাথে সাথেই থাকবো।

তুলাইব বললেনঃ যতক্ষণ আপনি তাঁর নিকট গিয়ে তাঁকে সালাম করে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর সাক্ষ্য না দেবেন, আমি ততক্ষণ আল্লাহর কাছে আপনার জন্য দুআ করতে থাকবো। সন্তানের এই অনুরোধ ভাগ্যবতী মা প্রত্যাখ্যান করতে পারলেন না। তিনি ঘোষণা করলেনঃ আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান রাসূলুল্লাহ─ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ্‌ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল বা প্রেরিত বান্দা। এই দিন থেকে তিনি তাঁর যবান দ্বারা রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) সব রকম সহায়তা করতে শুরু করেন এবং পুত্র তুলাইবকে সর্ব অবস্থায় রাসূলুল্লাহর (সাঃ) পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন।  [তাবাকাত-৩/১২৩, আল ইসাবা-২/২৩৩-২৩৪]।

মক্কায় ইসলামের প্রথম পর্বে যারা ইসলাম গ্রহণ করেন, তারা নানাভাবে কুরাইশদের হাতে নির্যাতিত হন। একদিন তুলাইব ও হাতেব ইবন আমর মক্কার আজইয়াদে আসগার এলাকায় নামায আদায় করছেন। মক্কার তৎকালীন চরম দুই সন্ত্রাসী ইবনুল আসদা ও ইবনুল গায়তালা তা দেখে ফেলে। তারা তুলাইব ও হাতেবের ওপর পাথর নিক্ষেপ করে আক্রমণ চালায়। হাতেব ও তুলাইব প্রায় এক ঘন্টা যাবত সে আক্রমণ প্রতিহত করেন এবং প্রাণ বাঁচিয়ে কোন রকমে পালিয়ে যান। [আনসাবুল আশরাফ-১/১১৭]।

মক্কার উকবা ইবন আবী মুয়াইত ছিল রাসূলুল্লাহর (সাঃ) চরম দুশমন। তাছাড়া সে ছিল অত্যন্ত নীচ প্রকৃতির। নানাভাবে সে রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) কষ্ট দিত। একদিন সে এক ঝুড়ি ময়লা নিয়ে এসে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) বাড়ীর দরজায় ফেলতে শুরু করে। ব্যাপারটি তুলাইবের নজরে পড়ে। তিনি ছুটে গিয়ে উকবার হাত থেকে ঝুড়িটি ছিনিয়ে নিয়ে তার দুটি কান মলে দেন। উকবা খুব ক্ষেপে গিয়ে তুলাইবের পিছু পিছু তাঁর মায়ের কাছে গিয়ে নালিশ জানায় এই বলেঃ তুমি কি দেখনা, তোমার ছেলে মুহাম্মাদের পক্ষ নিয়েছে? আবদুল মুত্তালিবের ভাগ্যবতী মেয়ে জবাব দিলেনঃ আচ্ছা তুমিই বল, তার পক্ষ নেওয়ার জন্য তুলাইবের চেয়ে অধিকতর উপযুক্ত ব্যক্তি আর কে আছে? মুহাম্মাদ (সাঃ) তো তার মামাত ভাই। আমাদের অর্থ কড়ি, জীবন সবই তো মুহাম্মাদের জন্য নিবেদিত। তারপর তিনি একটি শ্লোক আবৃত্তি করেন। যার অর্থঃ তুলাইব ‍তাঁর মামাতো ভাইকে সাহায্য করেছে, সে তাঁর রক্ত ও অর্থের ব্যাপারে সমবেদনা জানিয়েছে।

উল্লেখ্য যে, এই উকবা বদর যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয় এবং রাসূলুল্লাহর (সাঃ) বিশেষ নির্দেশে তাকে হত্যা করা হয়। [আনসাবুল আশরাফ-১/১৪৭]।

হযরত তুলাইব (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের পর বেশ কিছুদিন কুরাইশদের সকল অত্যাচার নিপীড়ন প্রতিরোধ করে মক্কায় অবস্থান করেন। কিন্তু অত্যাচারের মাত্রা যখন চরম রূপ ধারণ করে এবং মক্কায় টিকে থাকা একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়ে তখন হাবশাগামী দ্বিতীয় দলটির সাথে হাবশায় হিজরত করেন। সেখানে কিছুকাল অবস্থানের পর মক্কাবাসীদের সকলে ইসলাম গ্রহণ করেছে, এমন একটি গুজব শুনে যারা হাবশা থেকে মক্কায় ফিরে আসেন তাদের মধ্যে তুলাইবও ছিলেন। [সীরাতু ইবন হিশাম-১/৩২৪, ৩৬৬]।

হাবশা থেকে ফিরে কিছুকাল মক্কায় অবস্থান করেন। তারপর আবার মদীনায় হিজরত করেন। মদীনায় তিনি হযরত আবদুল্লাহ্ ইবন সালামা আল-আজলানীর অতিথি হন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মুনজির ইবন আমর আস-সায়েদীর সাথে তাঁর মুওয়াখাত বা ইসলামী ভ্রাতৃ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেন। 

মুহাম্মাদ ইবন উমারের বর্ণনা মতে হযরত তুলাইব বদর যুদ্ধে যোগদান করেন। তাবারী বলেনঃ বদর যুদ্ধে তাঁর যোগদানের ব্যাপারটি প্রমাণিত সত্য। অবশ্য মূসা ইবন উকবা, মুহাম্মাদ ইবন ইসহাক ও আবূ মাশার বদর যুদ্ধে যাঁরা যোগদান করেন তাদের নামের তালিকায় তুলাইবের নামটি উল্লেখ করেননি। [তাবাকাত-৩/১২৩]।

বদর যুদ্ধের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর কর্মকান্ডের আর কোন তথ্য সীরাত গ্রন্থসমূহে পাওয়া যায় না। তবে ধারণা করা যায়, তাঁর মত এমন তেজোদীপ্ত পুরুষ কখনও চুপ করে বসে ‍থাকতে পারেন না। আমরণ সকল অভিযানে অংশগ্রহণ করেন।

হিজরী ১৩ সনে জামাদিউল উলা মাসে আজনাদাইন যুদ্ধে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। তবে মুসয়াব ইবন আবদিল্লাহ বলেনঃ তিনি ইয়ারমুক যুদ্ধে শহীদ হন। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর। তিনি কোন সন্তানাদি রেখে যাননি। [তাবাকাত-৩/১২৪, আল-ইসতীয়াব]।

       লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ
    আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
(বইঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথাদ্বিতীয় খন্ড)