Thursday, June 13, 2019

আবু রাফে (রাঃ)

হযরত আবু রাফে’র (রাঃ) প্রকৃত নামের ব্যাপারে প্রচুর মতভেদ দেখা যায়। যেমনঃ ইবরাহীম, আসলাম, সিনান, ইয়াসার, সালেহ, আবদুর রহমান, কারমান, ইয়াযীদ, সাবেত, হুরমুয ইত্যাদি। এর মধ্যে আসলাম নামটিই সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। [আল ইসাবা-৪/৬৭]। আবু রাফে তার কুনিয়াত বা ডাকনাম। বংশ কৌলিন্যের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, হযরত রাসূলে কারীমের (সাঃ) খিদমত করার সৌভাগ্য তাঁর হয়েছিল। রাসূল (সাঃ) তাকে স্বীয় পরিবারের মধ্যে শামিল করে নেন। এর বেশি খান্দানী শরাফত কোন মানুষের জন্য আর হতে পারে ‍না। আসলে তিনি ছিলেন একজন হাবশী দাস।

হযরত আবু রাফে প্রথম হযরত আব্বাসের (রাঃ) দাস ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) হিবা বা দান করেন। পরে হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) হযরত আব্বাসের (রাঃ) ইসলাম গ্রহণের খুশীতে আবু রাফেকে আযাদ করে দেন।

তাঁর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, হযরত রাসূলে পাকের (সাঃ) পবিত্র মুখমন্ডলের দীপ্তি দেখে যাঁরা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন, আবু রাফে তাদের অন্যতম। এ সম্পর্কে আবু রাফে নিজেই বলেছেনঃ একবার কুরাইশরা আমাকে ‍তাদের কোন একটি কাজে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নিকট পাঠায়। রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) দেখা মাত্র আমার অন্তর ইসলামের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমি আর ফিরে যাব না। তিনি বললেনঃ ‘আমি কাসেদ বা দূতকে ঠেকিয়ে রাখি না এবং প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করি না। এখন তুমি ফিরে যাও। এভাবে যদি কিছু দিন তোমার অন্তরে ইসলামের প্রতি আবেগ বিদ্যমান থাকে তাহলে চলে এসো। তখনকার মত তো তিনি ফিরে গেলেন এবং কিছুদিন পর আবার ফিরে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন।

হযরত আবু রাফে অত্যাচারী কুরাইশ শক্তির ভয়ে বদর যুদ্ধ পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণের কথা গোপন রাখেন। বদর যুদ্ধ সবে মাত্র শেষ হয়েছে এমন সময় একদিন তিনি কাবার পাশে যমযম কুয়োর ঘরে বসে তীর তৈরী করছেন। হযরত আব্বাসের স্ত্রী তার পাশেই বসা। এ সময় নরাধম আবু লাহাব সেখানে এসে বসে। আবু লাহাব তার কাছে বদর যুদ্ধের অবস্থা জিজ্ঞেস করতে লাগলো। উল্লেখ্য যে, আবু লাহাব বদর যুদ্ধে নিজে যোগদান না করে প্রতিনিধি হিসাবে ‘আস ইবন হিশামকে’ পাঠায়। আবু লাহাবের জিজ্ঞাসার জবাবে আবু সুফইয়ান বললোঃ তুমি কি জিজ্ঞেস করছো, মুসলমানরা আমাদের সকল শক্তি চুরমার করে দিয়েছে, অনেককে হত্যা ও বহু লোককে বন্দী করেছে। এ প্রসঙ্গে এক অভিনব কাহিনী বলা হয় যে, ভূমি থেকে আকাশ পর্যন্ত ‍সাদা-কালো পোশাকের অশ্বারোহীতে পরিপূর্ণ ছিল। তার এ কথা শুনে আবু রাফে অকস্মাৎ বলে ওঠেন, তারা ফিরিশতা। আর যায় কোথায়! সঙ্গে সঙ্গে আবু সুফইয়ান আবু রাফের গালে প্রচণ্ড থাপ্পড় বসিয়ে দেয়। আবু রাফে আঘাতটা সামলে নিয়ে রুখে দাঁড়ান; কিন্তু তিনি ছিলেন দূর্বল। আবু লাহাব তাঁকে মাটিতে ফেলে দেয় এবং বুকের ‍উপর উঠে বসে আচ্ছামত মার দেয়। হযরত আব্বাসের স্ত্রী এ অত্যাচার দেখে সহ্য করতে পারলেন না। তিনি একটি খুঁটি তুলে নিয়ে নরপশু আবু লাহাবের মাথায় কষে মারলেন এক বাড়ি। পাপাচারী আবু লাহাবের মাথা কেটে গেল। হযরত আব্বাসের স্ত্রী তখন বলতে লাগলেন, আবু রাফে’র মনিবের অনুপস্থিতির সুযোগে তাকে দুর্বল মনে করে মারছো? এ ঘটনার এক সপ্তাহ পর ‘আদাসী’ (বসন্ত) নামক রোগে আবু লাহাবের মৃত্যু হয়। [হায়াতুস সাহাবা-৩/৫৩০-৩১]।

তাবারানী ইবন আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহর (সাঃ) হিজরতের পঞ্চম বছরে আমরা রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সাথে মিলিত হই। সেটা ছিল আহযাব যুদ্ধের সময়। আমি ছিলাম আমার ভাই ফদল ইবন আব্বাসের সাথে। আমাদের সাথে আমাদের গোলাম আবু রাফে’ও ছিল। মদীনায় পৌঁছে আমরা রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) খন্দকের মধ্যে পেলাম। এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় যে, আবু রাফে হিজরী ৫ম সনে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। [হায়াতুস সাহাবা-১/৩৭৩]।

তবে ইবন হিশাম হযরত আয়িশার (রাঃ) একটি বর্ণনা নকল করেছেন। হযরত আয়িশা (রাঃ) বলেছেন, রাসূল (সাঃ) মদীনায় হিজরতের কিছুদিন পর একটু স্থির হয়ে আমাদেরকে নেওয়ার জন্য যায়িদ ইবন হারিসা ও আবু রাফেকে মদীনা থেকে মক্কায় পাঠান। [সীরাতু ইবন হিশাম]।

এ বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় আবু রাফে ৫ম হিজরীর পূর্বেই মদীনায় পৌঁছেন। মদীনায় তিনি হযরত রাসূলে কারীমের (সাঃ) সাথে বসবাস করতে থাকেন।

একমাত্র বদর যুদ্ধ ছাড়া উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধে তিনি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সাথে অংশগ্রহণ করেন। খাইবারের যুদ্ধ সম্পর্কে আবু রাফে বর্ণনা করেনঃ আমরা আলীর নেতৃত্বে খাইবারে গেলাম। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) স্বীয় পতাকা আলীর হাতে দিয়ে খাইবারে পাঠান। আমরা দূর্গের কাছাকাছি গেলে দূর্গবাসীরা বের হয়ে এসে আমাদের সাথে যুদ্ধ শুরু করলো। আলী দূর্গের একটি দরজা ছিড়ে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত সেটা তাঁর হাতে ছিল। তারপর ফেলে দেন। আমরা আটজন প্রাণপণ চেষ্টা করেও সেটা উল্টাতে সক্ষম হইনি। [হায়াতুস সাহাবা-১/৫৪৬]।

হিজরী সপ্তম সনে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হুদাইবিয়ার সন্ধির চুক্তি অনুযায়ী মক্কায় গিয়ে ‘উমরাতুল কাদা’ আদায় করেন। আবু রাফে এই সফরেও রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সঙ্গী ছিলেন। এই সফরে মক্কায় অবস্থানকালে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সাথে হযরত মায়মুনার শাদী মুবারক অনুষ্ঠিত হয়। মক্কায় অবস্থানের মেয়াদ শেষ হলে হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) আবু রাফেকে মক্কায় রেখে ‘সারফে’ চলে যান। পরে আবু রাফে হযরত মায়মুনাকে (রাঃ) নিয়ে ‘সারফে’ পৌঁছেন এবং সেখানেই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। তারপর সকলে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন। [সীরাতু ইবন হিশাম-২/৩৭২]।

হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) হযরত আলী’র (রাঃ) নেতৃত্বে যে বাহিনীটি ইয়েমেনে পাঠান তাতে আবু রাফে’ও ছিলেন। হযরত আলী (রাঃ) নিজের অনুপস্থিতিতে আবু রাফে’কে বাহিনীর নেতৃত্ব দান করেন।

ইসলাম দাস তথা দূর্বল শ্রেণীর লোকদের উন্নতির যে সুযোগ দান করেছে, আবু রাফে তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি দাস ছিলেন, তবে মর্যাদা ও যোগ্যতায় ছিলেন আযাদ লোকদের সমকক্ষ। হাদীসের গ্রন্থসমূহে তার বর্ণিত ৬৮টি হাদীস পাওয়া যায়। তার মধ্যে একটি ইমাম বুখারী ও তিনটি ইমাম মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন।

দাসত্ব থেকে মুক্তির পরও তিনি হযরত রাসূলে কারীমের (সাঃ) খিদমতের গৌরব হাতছাড়া করেননি। এ কারণে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) প্রাত্যাহিক ক্রিয়াকলাপ ও অভ্যাস সম্পর্কে তাঁর জানা ছিল অনেক। বিশিষ্ট সাহাবীরা এ বিষয়ে তাঁর কাছে জানার জন্য ভিড় করতেন। হযরত ইবন আব্বাস (রাঃ) একজন সেক্রেটারী সংগে করে তাঁর কাছে আসতেন এবং জিজ্ঞেস করতেন, রাসূূল (সাঃ) অমুক অমুক দিন কি কি কাজ করতেন? আবু রাফে বলতেন আর সেক্রেটারী তা লিখে নিতেন। [আল ইসাবা-৪/৯২]।

রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে আযাদ করে দেওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজেই রাসূলুল্লাহর (সাঃ) খিদমতে আবদ্ধ থাকেন। রাসূল (সাঃ) যখন তাকে মুক্তি দেন, তখন আবু রাফের দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে থাকে। লোকেরা তাঁকে বলে, দাসত্ব থেকে মুক্তি পাচ্ছ, এতে কান্নার কি আছে! তিনি বললেন, আজ একটি সোয়াব আমার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এরপর থেকে যদিও তিনি আইনগতভাবে মুক্ত বা স্বাধীন হয়ে যান, তবে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) খিদমতের মর্যাদা শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে থাকেন। সফরের সময় রাসূলুল্লাহর (সাঃ) তাঁবু তিনিই তৈরী করতেন। রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সাথে তাঁর এই গোলামীর সম্পর্কটা এত মধুর ও প্রিয় ছিল যে, আমরণ তিনি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) গোলাম বা দাস বলে নিজের পরিচয় দিতেন।

হযরত রাসূলে কারীম (সাঃ) সাহাবী নাওফিল ইবন হারিসকে এক মহিলার সাথে বিয়ে দিলেন। বিয়ের পর খাওয়ার মত কোন কিছু তার কাছে চাইলেন; কিন্তু পেলেন না। তখন রাসূল (সাঃ) স্বীয় বর্মটি আবু রাফে ও আবু আইয়ুবের হাতে দিয়ে বিক্রির জন্য পাঠালেন। তাঁরা বর্মটি এক ইয়াহুদীর নিকট বন্ধক রেখে তিরিশ সা’ যব নিয়ে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নিকট পৌঁছলেন। রাসূল (সাঃ) যবগুলি নাওফিলের হাতে তুলে দিলেন। নাওফিল বলেন, আমরা সেই যবগুলি অর্ধ বছর খেয়েছিলাম। তারপর ওজন করে দেখলাম তা মোটেই কমেনি, পূর্বের মতই আছে। এ কথা রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) বললে তিনি মন্তব্য করলেন, যদি ওজন না করতে তাহলে সারা জীবন খেতে পারতে। [হায়াতুস সাহাবা-৩/৬৩০)]

হযরত আবু রাফে জীবনের এক পর্যায়ে দারুণ অভাব ও অর্থ কষ্টে পড়েন। এমনকি মানুষের কাছে হাত পেতে সাদকা ও সাহায্য গ্রহণ করেছেন। তবে কক্ষণো প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্রহণ করেননি। তার জীবনের এ পর্যায় সম্পর্কে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) ভবিষ্যদ্বাণী ছিল। আবু রাফে বলছেন, একদিন রাসূল (সাঃ) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ ‘ওহে আবু রাফে’, যখন তুমি দরিদ্র হয়ে যাবে তখন কেমন হবে? আবু রাফে বললেন, আমি কি সে অবস্থায় সাদকা গ্রহণ করবো? রাসূল (সাঃ) বললেনঃ হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আমার ‍দারিদ্র্য কখন আসবে? বললেন, আমার মৃত্যুর পরে। বর্ণনাকারী আবু সুলাইম বলেন, আমি তাঁকে দরিদ্র অবস্থায় দেখেছি। পথের ধারে বসে তিনি বলতেন, অন্ধ বৃদ্ধকে কে সাদকা করতে চায়, কে সেই ব্যক্তিকে দান করতে চায় যাকে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলে গেছেন যে, সে ভবিষ্যতে দরিদ্র হবে? তিনি আরও বলে গেছেন, ধনী ব্যক্তির জন্য সাদকা গ্রহণ বৈধ নয় এবং বৈধ নয় সুস্থ্য ব্যক্তির জন্যও। আবু সুলাইম বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে দেখলাম, সে আবু রাফেকে চারটি দিরহাম দান করলো; কিন্তু তিনি একটি দিরহাম ফেরত দিলেন। লোকটি বললো, আবদুল্লাহ, আমার দান আপনি ফেরত দেবেন না। আবু রাফে বললেন, রাসূল (সাঃ) আমাকে অতিরিক্ত সম্পদ জমা করতে নিষেধ করেছেন। আবু সুলাইম আরও বলেন, আমি শেষ পর্যন্ত আবু রাফেকে ধনী ব্যক্তি হিসেবে দেখেছি এবং তাঁকে বলতে শুনেছি, আফসুস, আবু রাফে যদি দরিদ্র অবস্থায় মারা যেত! [হায়াতুস সাহাবা-২/২৫৩-৫৪]।

ওয়াকিদীর মতে হযরত আবু রাফে খলীফা উসমানের (রাঃ) মৃত্যুর অল্প কিছুদিন আগে বা পরে, আর ইবন হিব্বানের মতে হযরত আলীর খিলাফতকালে মদীনায় ইনতিকাল করেন। [আল ইসাবা-৪/৬৭]।

      লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ
   আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
(বইঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথাদ্বিতীয় খন্ড)

No comments:

Post a Comment