Saturday, November 9, 2019

সূরা নূহ [(নবী) নূহ]

[মক্কায় অবতীর্ণ- আয়াত ২৮, রুকু ০২] [কোরআনে অবস্থান ৭১, অবতীর্ণের অনুক্রম ৭১]

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ্‌র নামে-

১. অবশ্যই আমি নূহকে তার জাতির কাছে পাঠিয়েছিলাম, (তাকে বলেছিলাম, হে নূহ), তোমার জাতির ওপর এক ভয়াবহ আযাব আসার আগেই তুমি তাদের সাবধান করে দাও।

২. (নূহ তার জাতিকে বললো,) হে আমার জাতি, আমি হচ্ছি তোমাদের জন্যে একজন সুস্পষ্ট সতর্ককারী ব্যক্তি,

৩. তোমরা আল্লাহর এবাদাত করো, তাঁকেই ভয় করো, তোমরা আমার আনুগত্য করো,

৪. (এতে করে) আল্লাহ তায়ালা তোমাদের গুনাহখাতা মাফ করে দেবেন এবং (এ দুনিয়ায়) তিনি তোমাদের এক সুনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবকাশ দেবেন; হ্যাঁ, আল্লাহর সেই নির্দিষ্ট সময় যখন এসে যাবে তখন তাকে পিছিয়ে দেয়া যাবে না। কত ভালো হতো যদি তোমরা বুঝতে পারতে!

৫. (নিরাশ হয়ে) সে বললো, হে আমার রব, আমি আমার জাতিকে দিবানিশি (ঈমানের) দাওয়াতই দিয়েছি,

৬. (কিন্তু) আমার এ (দিবানিশি) দাওয়াত তাদের (সত্য থেকে) পালানো ছাড়া আর কিছুই বৃদ্ধি করেনি।

৭. যতোবার আমি তাদের (তোমার পথে) ডেকেছি- (ডেকেছি) যেন তুমি (তাদের অতীত কৃতকর্ম) ক্ষমা করে দাও, তারা (ততোবারই) কানে আংগুল ঢুকিয়ে দিয়েছে এবং (অজ্ঞতার) আবরণ দিয়ে নিজেদের ঢেকে দিয়েছে, (শুধু তাই নয়), তারা জেদ ও অহমিকাও প্রদর্শন করেছে, (হেদায়াতকে অবজ্ঞা করার) ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছে,

৮. তারপর আমি আবারও তাদের কাছে প্রকাশ্যভাবে (দ্বীনের) দাওয়াত পেশ করেছি,

৯. তাদের জন্যে আমি (দ্বীনের) প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছি, আমি চুপে চুপেও তাদের কাছে (দ্বীনের দাওয়াত) পেশ করেছি,

১০. পরন্তু আমি তাদের বলেছি, তোমরা তোমাদের মালিকের দুয়ারে (নিজেদের অপরাধের জন্যে) ক্ষমা প্রার্থনা করো; নিসন্দেহে তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল,

১১. (তদুপরি) তিনি তোমাদের ওপর আকাশ থেকে অঝোর বৃষ্টিধারা বর্ষণ করবেন,

১২. ধনসম্পদ ও সন্তান সন্ততি দিয়ে তিনি তোমাদের সাহায্য করবেন, তিনি তোমাদের জন্যে বাগবাগিচা ও উদ্যানমালা স্থাপন করবেন, (বিরান ভূমিতে) তিনি নদীনালা প্রবাহিত করবেন;

১৩. এ কি হলো তোমাদের! তোমরা কি আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে মানমর্যাদা পাওয়ার আশা করো না?

১৪. অথচ তিনিই পর্যায়ক্রমে তোমাদের (মানুষ) বানিয়েছেন।

১৫. তোমরা কি দেখতে পাও না, কিভাবে আল্লাহ তায়ালা সাত আসমান বানিয়ে স্তরে স্তরে (তাকে সাজিয়ে) রেখেছেন-

১৬. এবং কিভাবে এর মাঝে তিনি চাঁদকে আলো ও সূর্যকে প্রদীপ বানিয়েছেন।

১৭. আল্লাহ তায়ালাই তোমাদের (একটি বিশেষ পদ্ধতিতে) মাটি থেকে উদগত করেছেন,

১৮. আবার তিনি তোমাদের তার মাঝেই ফিরিয়ে নেবেন এবং তা থেকেই একদিন তিনি তোমাদের বের করে আনবেন।

১৯. আল্লাহ তায়ালা তোমাদের জন্যে যমীনকে বিছানার মতো (সমতল করে) বানিয়েছেন,

২০. যাতে করে তোমরা এর উন্মুক্ত (ও প্রশস্ত) পথ ধরে চলাফেরা করতে পারো

২১. নূহ বললো, হে আমার রব, আমার জাতির লোকেরা আমার বিরুদ্ধাচরণ করেছে, তারা এমন কিছু লোকের অনুসরণ করেছে যাদের ধন সম্পদ ও সন্তান সন্ততি তাদের বিনাশ ছাড়া অন্য কিছুই বৃদ্ধি করেনি,

২২. তারা (সত্যের বিরুদ্ধে) সাংঘাতিক ধরনের ষড়যন্ত্র করেছে,

২৩. তারা বলে, তোমরা তোমাদের দেবতাদের কোনো অবস্থায়ই পরিত্যাগ করো না- ‘ওয়াদ’ ‘সূয়া’ (নামক দেবতাদের) উপাসনা কিছুতেই ছেড়ে দিয়ো না, ‘ইয়াগুস’ ‘ইয়াউক’ ও ‘নাছর’ নামের দেব দেবীকেও (ছাড়বে) না,

২৪. (হে মালিক,) এরা অনেককেই পথভ্রষ্ট করেছে, তুমিও আজ এ যালেমদের জন্যে পথভ্রষ্টতা ছাড়া আর কিছুই বাড়িয়ে দিয়ো না।

২৫. (অতপর) তাদের নিজেদের অপরাধের জন্যেই তাদের (মহাপ্লাবনে) ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে, (পরকালেও) তাদের জাহান্নামের কঠিন অনলে প্রবেশ করানো হবে, (অবস্থায়) তারা আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্য কাউকেই সাহায্যকারী হিসেবে পাবে না।

২৬. নূহ বললো, হে আমার রব, এ যমীনের অধিবাসী একজন (যালেম)-কেও তুমি (আজ শাস্তি থেকে) রেহাই দিয়ো না,

২৭. (আজ) যদি তুমি এদের (শাস্তি থেকে) রেহাই দাও, তাহলে এরা (পুনরায়) তোমার বান্দাদের পথভ্রষ্ট করবে, (শুধু তাই নয়), এরা (ভবিষ্যতেও) দুরাচার পাপী কাফের ছাড়া কাউকেই জন্ম দেবে না।

২৮. হে আমার রব, তুমি আমাকে, আমার পিতামাতাকে- তোমার ওপর ঈমান এনে যারা আমার (সাথে ঈমানের এই) ঘরে আশ্রয় নিয়েছে, এমন সব ঈমানদার পুরুষ ও মহিলাদের ক্ষমা করে দাও, যালেমদের জন্যে চূড়ান্ত ধ্বংস ছাড়া কিছুই তুমি বৃদ্ধি করো না।

অনুবাদকঃ হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ।
প্রকাশনাঃ আল কোরআন একাডেমী লন্ডন।

সূরা আল-জ্বীন [জ্বীন সম্প্রদায়]

[মক্কায় অবতীর্ণ- আয়াত ২৮, রুকু ০২] [কোরআনে অবস্থান ৭২, অবতীর্ণের অনুক্রম ৪০]

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ্‌র নামে-

১. (হে নবী,) তুমি বলো, আমার কাছে এ মর্মে ওহী নাযিল করা হয়েছে যে, জ্বীনদের একটি দল (কোরআন) শুনেছে, অতপর তারা (নিজেদের লোকদের) বলেছে, আমরা আজ এক বিস্ময়কর কোরআন শুনে এসেছি,

২. যা সঠিক (ও নির্ভুল) পথ প্রদর্শন করে, তাই আমরা তার ওপর ঈমান এনেছি এবং আমরা আর কখনো আমাদের মালিকের সাথে কাউকে শরীক করবো না,

৩. (আমরা বিশ্বাস করি,) আমাদের মালিকের মর্যাদা সকল কিছুর ঊর্ধ্বে, তিনি কাউকে স্ত্রী কিংবা পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেননি,

৪. (আমরা এও জানি,) আমাদের (কতিপয়) নির্বোধ আল্লাহ তায়ালার ওপর অসত্য ও বাড়াবাড়িমূলক কথাবার্তা আরোপ করে,

৫. আমরা মনে করেছিলাম, মানুষ ও জ্বীন (এ দুই জাতি তো) আল্লাহ তায়ালার ওপর মিথ্যা আরোপ করতেই পারে না,

৬. মানুষদের মাঝে কতিপয় (মূর্খ) লোক (বিপদে আপদে) জ্বীনদের কিছু সদস্যের কাছে আশ্রয় চাইতো, (এতে করে) মানুষরা তাদের গুনাহকে আরো বাড়িয়ে দিতো,

৭. জ্বীনরা মনে করতো- যেমনি মনে করতে তোমরা (মানুষরা)- যে, (মৃত্যুর পর) আল্লাহ তায়ালা কখনো কাউকে পুনরুজ্জীবিত করবেন না,

৮. (জ্বীনরা আরো বললো,) আমরা আকাশমন্ডল ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি, আমরা একে কঠোর প্রহরী ও উল্কাপিন্ড দ্বারা পরিবেষ্টিত পেয়েছি,

৯. আমরা আগে তার বিভিন্ন ঘাটিতে কিছু শোনার প্রত্যাশায় বসে থাকতাম; কিন্তু এখন আমাদের কেউ যদি (এসব ঘাটিতে বসে) কিছু শোনার চেষ্টা করে, তাহলে সে প্রতিটি জায়গায় তার জন্যে (পেতে রাখা এক) একটি জ্বলন্ত উল্কাপিন্ড (দেখতে) পায়,

১০. আমরা বুঝতে পারছিলাম না, পৃথিবীর মানুষদের কোনো অনিষ্ট সাধনের উদ্দেশেই কি এসব (উল্কাপিন্ড বসিয়ে রাখা) হয়েছে?- না (এর মাধ্যমে) তাদের মালিক তাদের সঠিক পথ দেখাতে চান,

১১. (মানুষদের মতো) আমাদের মধ্যেও কিছু আছে সৎকর্মশীল, আর কিছু আছে এর ব্যতিক্রম; (পাপ পুণ্যের দিক থেকে) আমরা ছিলাম দ্বিধাবিভক্ত,

১২. আমরা বুঝে নিয়েছি, এ ধরার বুকে আমরা আল্লাহ তায়ালাকে কখনো অক্ষম করতে পারবো না- না আমরা (কখনো তার থেকে) পালিয়ে গিয়ে তাঁকে পরাভূত করতে পারবো,

১৩. আমরা যখন হেদায়াতের বাণী (সম্বলিত কোরআন) শুনলাম, তখন আমরা তার ওপর ঈমান আনলাম; (কেননা) যে ব্যক্তি তার মালিকের ওপর ঈমান আনে, তার কোনো কিছু কম পাওয়ার আশংকা থাকে না, (পরকালেও) তার লাঞ্ছনা থাকবে না,

১৪. আমাদের মধ্যে কিছু আছে যারা (আল্লাহর অনুগত) মুসলিম, আবার কিছু আছে যারা সত্যবিমুখ (কাফের); যারা (আল্লাহর) আনুগত্যের পথ বেছে নিয়েছে তারাই হচ্ছে সেসব (ভাগ্যবান) মানুষ যারা মুক্তি ও সৎপথই বাছাই করে নিয়েছে,

১৫. আর যারা সত্যবিমুখ তারা অবশ্যই জাহান্নামের ইন্ধন (হবে),

১৬. লোকেরা যদি সত্য (ও নির্ভুল) পথের ওপর সুদৃঢ় থাকতো, তাহলে আমি তাদের (আসমান থেকে) প্রচুর পানি পান করাতাম,

১৭. যেন আমি এর দ্বারা তাদের (ঈমানের) পরীক্ষা নিতে পারি; যদি কোনো মানুষ তার মালিকের স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তিনি তাকে কঠোর আযাবে প্রবেশ করাবেন,

১৮. মাসজিদসমূহ আল্লাহ তায়ালার এবাদাতের জন্যে (নির্দিষ্ট), অতএব তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডেকো না,

১৯. যখন আল্লাহর এক বান্দা তাকে ডাকার জন্যে দাঁড়ালো, তখন (মানুষ কিংবা জ্বীনের) অনেকেই তার পাশে ভীড় জমাতে লাগলো;

২০. (এদের) তুমি বলো, আমি শুধু আমার রবকেই ডাকি, আর আমি (কখনো) তাঁর সাথে কাউকে শরীক করি না।

২১. তুমি বলো, আমি তোমাদের ক্ষতিসাধনের যেমন ক্ষমতা রাখি না, তেমনি আমি তোমাদের ভালো করার ক্ষমতাও রাখি না।

২২. তুমি বলো, আমাকে আল্লাহর পাকড়াও থেকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না। আমি কখনো তিনি ছাড়া আর কোনো আশ্রয়স্থল (খুঁজে) পাবো না,

২৩. (আমার কাজ) এ ছাড়া আর কি (আছে) যে, আমি আল্লাহর কাছ থেকে তাঁর বাণী ও হেদায়াত পৌঁছে দেবো, কেউ যদি আল্লাহ তায়ালা এবং তার রসূলকে অমান্য করে, তার জন্যে রয়েছে জাহান্নামের (কঠিন) আগুন, যেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে;

২৪. এভাবে (সত্যি সত্যিই) যখন তারা (সে দিনটি), দেখতে পাবে যার প্রতিশ্রুতি তাদের দেয়া হচ্ছে, তখন তারা অবশ্যই জানতে পারবে কার সাহায্যকারী কতো দুর্বল এবং কার বাহিনী কতো কম!

২৫. তুমি বলো, আমি (নিজেই) জানি না, তোমাদের (কেয়ামতের) যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে তা কি (আসলেই) সন্নিকটে, না আমার মালিক তার জন্যে কোনো মেয়াদ ঠিক করে রেখেছেন।

২৬. তিনি (সমগ্র) গায়বের (একক) জ্ঞানী, তাঁর (সে) অদৃশ্য জগতের কোনো কিছুই তিনি কারো কাছে প্রকাশ করেন না,

২৭. অবশ্য তাঁর রসূল ছাড়া- যাকে তিনি বাছাই করে নিয়েছেন, কিন্তু তারও আগে-পিছে তিনি (অতন্দ্র) প্রহরী নিযুক্ত করে রেখেছেন,

২৮. এ (প্রহরা) দিয়ে তিনি এ কথাটা জেনে নিতে চান, তাঁর নবী রসূলরা (মানুষের কাছে) তাদের মালিকের পক্ষ থেকে হেদায়াতের বাণী (ঠিক ঠিক) পৌঁছে দিয়েছে কিনা, তিনি তো এমনিই তাদের সব কিছু পরিবেষ্টন করে রয়েছেন এবং (এ সৃষ্টি জগতের) সবকিছুকেই তিনি গুনে রেখেছেন।

অনুবাদকঃ হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ।
প্রকাশনাঃ আল কোরআন একাডেমী লন্ডন।

সূরা আল-মুযযাম্মিল [বস্ত্রাচ্ছাদনকারী/বস্ত্রাচ্ছাদিত/বস্ত্রাবৃত]

[মক্কায় অবতীর্ণ- আয়াত ২০, রুকু ০২] [কোরআনে অবস্থান ৭৩, অবতীর্ণের অনুক্রম ০৩]

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ্‌র নামে-

১. হে বস্ত্ৰ আচ্ছাদনকারী (মুহাম্মাদ,)

২. রাতে (নামাযের জন্যে উঠে) দাঁড়াও, কিছু অংশ বাদ দিয়ে-

৩. তার অর্ধেক অংশ- অথবা তার চাইতে আরো কিছু কম করো,

৪. কিংবা তার ওপর (আরো কিছু) বাড়িয়ে দাও, তুমি কোরআন তেলাওয়াত করো থেমে থেমে;

৫. (হে মোহাম্মদ!) অচিরেই আমি তোমার ওপর একটি ভারী (গুরুত্বপূর্ণ) কিছু রাখতে যাচ্ছি।

৬. অবশ্যই রাতে বিছানা ত্যাগ! তা আত্মসংযমের জন্যে বেশী কার্যকর (এ সময় দোয়া ও কোরআন) পাঠেরও সুবিধা থাকে বেশী;

৭. অবশ্যই দিনের বেলায় তোমার প্রচুর কর্মব্যস্ততা থাকে।

৮. তুমি তোমার মালিকের নাম স্মরণ করো এবং একনিষ্ঠভাবে তাঁর দিকেই মনোনিবেশ করো;

৯. আল্লাহ তায়ালা পূর্ব পশ্চিমের রব, তিনি ছাড়া আর কোনো মাবুদ নেই, অতএব তাঁকেই তুমি অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করো।

১০. এ (নির্বোধ) লোকেরা যেসব কথাবার্তা বলে তাতে তুমি ধৈর্য ধারণ করো এবং সৌজন্য সহকারে তাদের পরিহার করো।

১১. মিথ্যা সাব্যস্তকারী ও সম্পদের অধিকারীদের (সাথে ফয়সালার) ব্যাপারটা তুমি আমাকে ছেড়ে দাও এবং কিছুদিনের জন্যে তুমি তাদের অবকাশ দিয়ে রাখো।

১২. অবশ্যই আমার কাছে (এদের পাকড়াও করার জন্যে) শেকল আছে, আছে (আযাব দেয়ার জন্যে) জাহান্নাম,

১৩. (আরো রয়েছে) গলায় আটকে যাবে এমন খাবার ও যন্ত্রণা দেবে এমন ধরনের আযাব,

১৪. (যেদিন এ ঘটনা ঘটবে) সেদিন পৃথিবী ও (তার) পাহাড়সমূহ প্রকম্পিত হতে থাকবে এবং পাহাড়সমূহ হবে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকা কতিপয় বালুর স্তূপ।

১৫. অবশ্যই আমি তোমাদের কাছে (তোমাদের কাজকর্মের) সাক্ষ্যদাতা হিসেবে একজন রসূল-পাঠিয়েছি, যেমনি করে ফেরাউনের কাছেও আমি একজন রসূল পাঠিয়েছিলাম;

১৬. অতপর ফেরাউন (আমার) রসূলকে অমান্য করেছে, (এর শাস্তি হিসেবে) আমি তাকে কঠোরভাবে পাকড়াও করেছি।

১৭. তোমরা যদি (আজ) সেদিনকে অস্বীকার করো তাহলে (আযাব থেকে) কিভাবে তোমরা বাঁচতে পারবে, (অথচ অবস্থার ভয়াবহতা) সেদিন কিশোর বালকদেরও বৃদ্ধ বানিয়ে দেবে;

১৮. যেদিন তার সাথে আসমান ফেটে ফেটে পড়বে, (এ) হচ্ছে আল্লাহর প্রতিশ্রুতি, আর তা সংঘটিত হবেই।

১৯. এ হচ্ছে একটি উপদেশমাত্র, কোনো ব্যক্তি চাইলে (এর মাধ্যমে) নিজের মালিকের দিকে যাওয়ার একটা রাস্তা ধরতে পারে।

২০. (হে নবী,) অবশ্যই তোমার মালিক (একথা) জানেন যে, তুমি এবং তোমার সাথে তোমার সাথীদের এক দল (এবাদাতের জন্যে কখনো) রাতের দুই-তৃতীয়াংশ, (কখনো) অর্ধেক অংশ, আবার (কখনো) এক-তৃতীয়াংশ দাঁড়িয়ে থাকো; (মূলত) রাত দিনের এ হিসাব তো আল্লাহ তায়ালাই ঠিক করে রাখেন; তিনি (এও) জানেন, তোমরা কখনো এর সঠিক হিসাব করতে সক্ষম হবে না, তাই তিনি (এ ব্যাপারে) তোমাদের ওপর ক্ষমাপরায়ণ হয়েছেন, অতএব (এখন থেকে) কোরআনের যে পরিমাণ অংশ তেলাওয়াত করা তোমাদের জন্যে সহজ, ততোটুকুই তোমরা তেলাওয়াত করো; আল্লাহ তায়ালা তোমাদের অবস্থা জানেন, তোমাদের ভেতর কেউ অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে, আবার পরবর্তী কেউ আল্লাহর অনুগ্রহ (জীবিকা) সন্ধানের উদ্দেশ্যে সফরে বের হতে পারে, আবার একদল লোক আল্লাহর পথে যুদ্ধে নিয়োজিত হবে, (এ পরিপ্রেক্ষিতে) তা থেকে যেটুকু অংশ পড়া তোমাদের জন্যে সহজ ততোটুকুই তোমরা পড়ো; তোমরা নামায প্রতিষ্ঠা করো, যাকাত আদায় করো এবং আল্লাহকে উত্তম ঋণ দিতে থাকো, (মনে রাখবে), যা কিছু ভালো ও উত্তম কাজ তোমরা আগেভাগেই নিজেদের জন্যে আল্লাহর কাছে পাঠিয়ে রাখবে, তাই তোমরা তাঁর কাছে (সংরক্ষিত দেখতে) পাবে, পুরস্কার ও এর বর্ধিত পরিমাণ হিসেবে তা হবে অতি উত্তম, তোমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, নিসন্দেহে আল্লাহ তায়ালা অতীব দয়ালু, অধিক ক্ষমাশীল।

অনুবাদকঃ হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ।
প্রকাশনাঃ আল কোরআন একাডেমী লন্ডন।

Wednesday, November 6, 2019

সূরা আল-মুদ্দাসসির [(কম্বল/চাদর/বস্ত্র) আচ্ছাদিত/আবৃত]

[মক্কায় অবতীর্ণ- আয়াত ৫৬, রুকু ০২] [কোরআনে অবস্থান ৭৪, অবতীর্ণের অনুক্রম ০৪]

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ্‌র নামে-

১. হে কম্বল আবৃত (মুহাম্মাদ),

২. (কম্বল ছেড়ে) তুমি ওঠো এবং মানুষদের (পরকালের আযাব সম্পর্কে) সাবধান করো,

৩. তোমার মালিকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো,

৪. তোমার পোশাক আশাক পবিত্র করো-

৫. এবং মলিনতা ও অপবিত্রতা পরিহার করো,

৬. কখনো বেশী পাওয়ার লোভে কাউকে কিছু দান করো না,

৭. তোমার মালিকের (খুশীর) উদ্দেশ্যে ধৈর্য ধারণ করো;

৮. যেদিন (সবকিছু ধ্বংস করে দেয়ার জন্যে) শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া হবে,

৯. সেদিনটি (হবে) সত্যিই বড় সাংঘাতিক,

১০. (এ দিনকে) যারা অস্বীকার করেছে তাদের জন্যে এটি মোটেই সহজ (বিষয়) হবে না।

১১. যাকে আমি অনন্য ধরনের (করে) পয়দা করেছি, (তার সাথে বুঝাপড়া করার জন্যে) তুমি আমাকেই ছেড়ে দাও,

১২. তাকে আমি বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ দান করেছি,

১৩. (তাকে আরো দান করেছি) সদা সংগী (এক দল) পুত্র সন্তান,

১৪. আমি তার জন্যে (সচ্ছলতার উপকরণ) সুগম করে দিয়েছি,

১৫. (তারপরও) সে লোভ করে যে, তাকে আমি আরো অধিক দিতে থাকবো,

১৬. না, কখনো নয়; কেননা সে আমার আয়াতসমূহের বিরুদ্ধাচরণে বদ্ধপরিকর ছিলো,

১৭. অচিরেই আমি তাকে (শাস্তির) চূড়ায় আরোহণ করাবো;

১৮. সে তো (সত্য গ্রহণের ব্যাপারে কিছুটা) চিন্তা-ভাবনাও করেছিলো, তারপর সে (নিজের গোঁড়ামিতে থাকার) সিদ্ধান্ত করলো,

১৯. তার ওপর অভিশাপ, (সত্য চেনার পরও) কেমন করে সে (পুনরায় এ) সিদ্ধান্ত করলো!

২০. আবারও তার ওপর অভিশাপ! কিভাবে সে এমন সিদ্ধান্ত করলো,

২১. সে (লোকদের প্রতি) চেয়ে দেখলো,

২২. (দম্ভভরে) সে তার ভ্রুকুঞ্চিত করলো, (অবজ্ঞাভরে) মুখটাকে বিকৃত করে ফেললো,

২৩. অতপর সে পিছিয়ে গেলো এবং অহংকার করলো,

২৪. সে (আরো) বললো, এ তো (আসলে) আগের লোকদের থেকে প্রাপ্ত যাদু (-বিদ্যার খেল) ছাড়া কিছুই নয়,

২৫. এ তো মানুষের কথা ছাড়া (আর কিছুও) নয়;

২৬. অচিরেই আমি তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবো

২৭. তুমি কি জানো জাহান্নাম (-এর আগুন) কি ধরনের?

২৮. যা (এর অধিবাসীদের অক্ষত অবস্থায়) ফেলে রাখবে না, আবার (শাস্তি থেকে) রেহাইও দেবে না,

২৯. বরং তা মানুষদের গায়ের চামড়াকে ভীষণভাবে জ্বালিয়ে দেবে,

৩০. তার ওপর (নিয়োজিত আছে) ঊনিশ (সদস্যের ফেরেশতাদল);

৩১. আমি দোযখের প্রহরী হিসেবে ফেরেশতাদের, ছাড়া (অন্য কাউকেই) নিযুক্ত করিনি এবং তাদের (এই ঊনিশ) সংখ্যাকে আমি অবিশ্বাসীদের জন্যে একটি পরীক্ষার মাধ্যম বানিয়ে দিয়েছি, যেন এর মাধ্যমে যাদের ওপর আমার কিতাব নাযিল হয়েছে তারা (আমার কথায়) দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে এবং যারা (আগে থেকেই আমার ওপর) ঈমান এনেছে তাদের ঈমানও এতে করে বৃদ্ধি পেতে পারে, (সর্বোপরি) এর ফলে আহলে কিতাব এবং মোমেনরাও যেন কোনোরকম সন্দেহে নিমজ্জিত না হতে পারে, (অবশ্য) যাদের মনে সন্দেহের ব্যাধি রয়েছে এর ফলে তারা এবং সত্য প্রত্যাখ্যানকারী ব্যক্তিরা বলবে, এ (অভিনব) উক্তি দ্বারা আল্লাহ তায়ালা কী বুঝাতে চান? (মূলত) এভাবেই আল্লাহ তায়ালা যাকে চান তাকে গোমরাহ করেন, (আবার) তিনি যাকে চান তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন; তোমার মালিকের (বিশাল) বাহিনী সম্পর্কে তিনি ছাড়া আর কেউই জানে না, (আর দোযখের বর্ণনা-) এ তো শুধু মানুষদের উপদেশের জন্যেই-

৩২. না, তা কখনো নয়, (আমি) চাঁদের শপথ (করে বলছি),

৩৩. (আরো) শপথ (করছি) রাতের, যখন তা অবসান হতে থাকে,

৩৪. শপথ (করছি) প্রভাতকালের যখন তা (দিনের) আলোয় উদ্ভাসিত হয়,

৩৫. নিসন্দেহে (মানুষের জন্যে) তা হবে কঠিনতম বিপদসমূহের মধ্যে একটি,

৩৬. মানুষের জন্যে (তা হবে) ভয় প্রদর্শনকারী,

৩৭. তোমাদের সে ব্যক্তির জন্যে, যে (কল্যাণের পথে) অগ্রসর হতে চায় এবং (অকল্যাণের পথ থেকে) পিছু হটতে মনস্থ করে;

৩৮. (মূলত) প্রত্যেক মানুষই নিজের কর্মফলের হাতে বন্দী হয়ে আছে,

৩৯. অবশ্য ডান দিকে অবস্থানকারী (নেককার) লোকগুলো ছাড়া;

৪০. তারা অবস্থান করবে (চিরস্থায়ী) জান্নাতে। (সেদিন) তারা পরস্পরকে জিজ্ঞেস করবে-

৪১. (জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত) পাপিষ্ঠদের সম্পর্কে,

৪২. (হে জাহান্নামের অধিবাসীরা,) তোমাদের আজ কিসে এ আযাবে উপনীত করেছে?

৪৩. তারা বলবে, আমরা নামাযীদের দলে শামিল ছিলাম না,

৪৪. অভাবী (ক্ষুধার্ত) ব্যক্তিদের আমরা খাবার দিতাম না,

৪৫. (সত্যের বিরুদ্ধে) যারা অন্যায় অমূলক আলোচনায় উদ্যত হতো আমরা তাদের সাথে যোগ দিতাম,

৪৬. (সর্বোপরি) আমরা আখেরাতকেও মিথ্যা প্রতিপন্ন করতাম,

৪৭. এমনি (করতে করতে একদিন) চূড়ান্ত সত্য (হিসেবে মৃত্যু) আমাদের কাছে হাযির হয়ে গেলো

৪৮. কোনো সুপারিশকারীর সুপারিশই (আজ) তাদের কোনো উপকারে আসবে না;

৪৯. এদের কি হয়েছে, এরা (সত্য) বাণী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে কেন?

৫০. এরা যেন (বনের) কতিপয় পলায়নপর (ভীত সন্ত্রস্ত) গাধা,

৫১. যারা সিংহের আক্রমণ থেকে পালাতে ব্যস্ত;

৫২. কিন্তু তাদের প্রতিটি ব্যক্তিই চায়, তাকে (আলাদা করে) উন্মুক্ত গ্রন্থ দেয়া হোক,

৫৩. এটা (কখনো) সম্ভব নয়, (আসলে) এ লোকেরা শেষ বিচারের দিনকেই ভয় করে না;

৫৪. না, কখনো নয়, এটি একটি নসীহত মাত্র,

৫৫. অতএব (এক্ষণে) যার ইচ্ছা সে যেন (এ থেকে) শিক্ষা গ্রহণ করে;

৫৬. (সত্যি কথা হচ্ছে,)  আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা ব্যতিরেকে তারা কখনো (এ থেকে) শিক্ষা গ্রহণ করবে না; একমাত্র তিনিই ভয় করার যোগ্য এবং একমাত্র তিনিই হচ্ছেন ক্ষমার মালিক।

অনুবাদকঃ হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ।
প্রকাশনাঃ আল কোরআন একাডেমী লন্ডন।

Tuesday, November 5, 2019

সূরা আল-ক্বিয়ামাহ [কিয়ামত/পুনরুত্থান]

[মক্কায় অবতীর্ণ- আয়াত ৪০, রুকু ০২] [কোরআনে অবস্থান ৭৫, অবতীর্ণের অনুক্রম ৩১]

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ্‌র নামে-

১. আমি শপথ করছি কেয়ামত দিবসের,

২. আমি শপথ করছি সে নফসের, যে (ক্রটি বিচ্যুতির জন্যে) নিজেকে ধিক্কার দেয়;

৩. মানুষ কি ধরে নিয়েছে যে, (সে মরে গেলে) আমি তার অস্থিমজ্জাগুলো আর কখনো একত্রিত করতে পারবো না;

৪. হ্যাঁ, অবশ্যই (আমি তা পারবো), আমি তো বরং তার আংগুলের গিরাগুলোকেও পুনর্বিন্যস্ত করে দিতে পারবো

৫. এ সত্বেও মানুষ তার সম্মুখের দিনগুলোতে (শুধু) পাপাচারেই লিপ্ত হতে চায়

৬. সে জিজ্ঞেস করে, কেয়ামত কবে আসবে?

৭. (তুমি বলো,) যেদিন (সবার) দৃষ্টি ধাঁধাযুক্ত হয়ে যাবে,

৮. (যেদিন) চাঁদ নিষ্প্রভ হয়ে যাবে,

৯. চাঁদ ও সুরুজ একাকার হয়ে যাবে,

১০. (সেদিন) মানুষগুলো সব বলে উঠবে (সত্যিই তাো! কেয়ামত এসে গেছে), কোথায় আজ পালানোর জায়গা (আমাদের)?

১১. (ঘোষণা আসবে) না, (আজ পালাবার জায়গা নেই,) নেই কোনো আশ্রয়স্থলও;

১২. (আজ) আশ্রয়স্থল ও ঠাঁই আছে (একটাই এবং তা) শুধু তোমার মালিকের কাছে,

১৩. সেদিন প্রতিটি মানুষকে জানিয়ে দেয়া হবে, কি (আমল) নিয়ে সে আজ হাযির হয়েছে, আর কি (কি আমল) সে পেছনে রেখে এসেছে;

১৪. মানুষরা তো বরং নিজেদের কাজকর্মের ব্যাপারে নিজেরাই পর্যবেক্ষক,

১৫. যদিও সে নিজের (সপক্ষে সেদিন) নানা অজুহাত পেশ করতে চাইবে;

১৬. (হে নবী, ওহীর ব্যাপার,) তুমি তাতে তাড়াহুড়ো করার উদ্দেশ্যে তার সাথে তোমার জিহ্‌বা নাড়িয়ো না;

১৭. এর একত্র করা ও (ঠিকমতো তোমাকে) তা পড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব আমার ওপর,

১৮. অতএব আমি যখন (জিবরাঈলের মাধ্যমে তোমার কাছে) কোরআন পড়তে থাকি, তখন তুমি সে পড়ার অনুসরণ করার চেষ্টা করো,

১৯. অতপর (তোমাকে) এর ব্যাখ্যা বলে দেয়ার দায়িত্বও আমার ওপর;

২০. না, কক্ষণো না, তোমরা পর্থিব জগতকেই বেশী ভালোবাসো-

২১. এবং পরকালীন জীবনকে তোমরা উপেক্ষা করো!

২২. সেদিন কিছু সংখ্যক (মানুষের) চেহারা উজ্জ্বল আলোয় ভরে উঠবে,

২৩. এ (ভাগ্যবান) ব্যক্তিরা তাদের মালিকের দিকে তাকিয়ে থাকবে,

২৪. আবার এদিন কিছু মানুষের চেহারা হয়ে যাবে (উদাস ও) বিবর্ণ,

২৫. তারা ভাবতে থাকবে, (এক্ষুণি বুঝি) তাদের সাথে কোমর বিচূর্ণকারী (আযাবের) আচরণ (শুরু) করা হবে;

২৬. না, কখনো নয়, মানুষের প্রাণ (যখন) তার কণ্ঠনালী পর্যন্ত এসে যাবে,

২৭. তাকে বলা হবে, (এ সময় যাদুটোনা ও) ঝাড় ফুঁক দেয়ার মতো কেউ কি আছে?

২৮. সে (তখন) বুঝে নেবে যে, অবশ্যই (পৃথিবী থেকে এটাই) তার বিদায় (নেয়ার সময়),

২৯. (আর এভাবেই) তার (এ জীবনের শেষ) পা’ (পরের জীবনের প্রথম) পা’র সাথে জড়িয়ে যাবে,

৩০. আর সে দিনটিই হবে তোমার মালিকের দিকে (তার অনন্ত) যাত্রার (প্রথম) সময়!

৩১. (আসলে) এ (জাহান্নামী) ব্যক্তিটি সত্য স্বীকার করেনি এবং (সত্যের দাবী মোতাবেক) সে নামায প্রতিষ্ঠা করেনি,

৩২. বরং (তার বদলে) সে (সত্যকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে এবং (সত্য থেকে) সে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে,

৩৩. সে অত্যন্ত দম্ভ ও অহমিকাভরে নিজের পরিবার পরিজনের কাছে ফিরে গেলো,

৩৪. (আল্লাহ তায়ালা বলবেন,) হ্যাঁ, (এ পরিণাম ঠিক) তোমাকেই মানায় এবং এটা তোমারই প্রাপ্য।

৩৫. অতপর এ আচরণ শুধু তোমারই সাজে, (এটা) তোমার জন্যেই মানায়;

৩৬. মানুষ কি ধরে নিয়েছে যে, তাকে এমনি ছেড়ে দিয়ে রাখা হবে;

৩৭. সে কি (এক সময়) এক ফোঁটা স্খলিত শুক্রবিন্দুর অংশ ছিলো না?

৩৮. তারপর তা হলো রক্তপিন্ড, অতপর আল্লাহ তায়ালা (দেহ সৃষ্টি করে তাকে) সুবিন্যস্ত করলেন,

৩৯. এরপর তিনি তার থেকে নারী পুরুষের জোড়া পয়দা করেছেন।

৪০. (যিনি এদের বানিয়েছেন) তিনি কি মৃতদের পুনরুজ্জীবিত করতে সক্ষম হবেন না?

অনুবাদকঃ হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ।
প্রকাশনাঃ আল কোরআন একাডেমী লন্ডন।

Monday, November 4, 2019

সূরা আল-ইনসান অথবা সূরা আদ্‌-দাহর [মানুষ অথবা কাল]

[মদীনায় অবতীর্ণ- আয়াত ৩১, রুকু ০২] [কোরআনে অবস্থান ৭৬, অবতীর্ণের অনুক্রম ৯৮]

পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ্‌র নামে-

১. কালের (পরিক্রমায়) কোনো একটি সময় মানুষের ওপর দিয়ে এসেছে কি- যখন সে (এবং তার অস্তিত্ব) উল্লেখ করার মতো কিছুই ছিলো না!

২. আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি (নারী পুরুষের) মিশ্রিত শুক্র থেকে, যেন আমি তাকে (তার ভালো মন্দের ব্যাপারে) পরীক্ষা করতে পারি, অতপর (পরীক্ষার উপযোগী করে তোলার জন্যে) তাকে আমি শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন করে পয়দা করেছি।

৩. আমি তাকে (চলার) পথ দেখিয়ে দিয়েছি, সে চাইলে (আল্লাহর) কৃতজ্ঞ হবে, না হয় (অকৃতজ্ঞ) কাফের হয়ে যাবে।

৪. কাফেরদের জন্যে আমি শেকল, বেড়ি ও আগুনের লেলিহান শিখার ব্যবস্থা করে রেখেছি।

৫. নিসন্দেহে যারা সৎকর্মশীল তারা (জান্নাতে) এমন সুরা পান করবে যার সাথে (সুগন্ধযুক্ত) কর্পূর মেশানো থাকবে,

৬. এ পানি হবে প্রবাহমান (এক) ঝর্ণা, যার (প্রবাহ) থেকে আল্লাহর নেক বান্দারা সদা পানীয় গ্রহণ করবে, তারা (যেদিকে যখন ইচ্ছা) এ (ঝর্ণাধারা)-টা প্রবাহিত করে নেবে।

৭. (এরা হচ্ছে সেসব লোক) যারা ‘মানত’ পূরণ করে এবং এমন এক দিনকে ভয় করে, যে দিনের ধ্বংসলীলা হবে সুদূরপ্রসারী।

৮. এরা শুধু আল্লাহর ভালোবাসায় (উদ্বুদ্ধ হয়েই ফকীর) মেসকীন, এতীম ও কয়েদীদের খাবার দেয়।

৯. (এরা বলে,) আমরা শুধু আল্লাহ তায়ালারর সন্তুষ্টির জন্যেই তোমাদের খাবার দিচ্ছি, (বিনিময়ে) আমরা তোমাদের কাছ থেকে কোনো রকম প্রতিদান চাই না- না (চাই) কোনো রকম কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন।

১০. আমরা সে দিনটির ব্যাপারে আমাদের মালিককে ভয় করি, যে দিনটি হবে অতীব ভয়ংকর।

১১. আল্লাহ তায়ালা আজ তাদের সেদিনের (ভয়ংকর আযাব ও) অনিষ্ট থেকে রক্ষা করবেন, তিনি তাদের সজীবতা ও আনন্দ দান করবেন,

১২. এরা যে ধৈর্য প্রদর্শন করেছে (তার পুরস্কার হিসেবে আল্লাহ তায়ালা) তাদের জান্নাত ও রেশমী বস্ত্র দান করবেন,

১৩. (সেখানে) তারা (সুসজ্জিত) আসনে হেলান দিয়ে বসবে, সেখানে সূর্যের (তাপ) যেমন তারা দেখবে না, তেমনি দেখবে না কোনোরকম শীত (-এর প্রকোপও),

১৪. তাদের ওপর (জান্নাতে) তার গাছের ছায়া ঝুঁকে থাকবে, তার ফল-পাকড়া তাদের আয়ত্তাধীন করে দেয়া হবে।

১৫. তাদের (সামনে খাবার) পরিবেশন করা হবে রৌপ্য নির্মিত পাত্রে ও কাঁচের পেয়ালায়, তা হবে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ,

১৬. রূপালী স্ফটিক পাত্র, (যার সবটুকুই) পরিবেশনকারীরা যথাযথভাবে পূর্ণ করে রাখবে।

১৭. সেখানে তাদের এমন এক (অপূর্ব) সুরা পান করানো হবে, যার সাথে মেশানো হবে ‘যানজাবীল’ (নামের মূল্যবান সুগন্ধ),

১৮. তাতে রয়েছে (জান্নাতের) এক (অমিয়) ঝর্ণা, যার নাম রাখা হয়েছে ‘সালসাবীল’

১৯. তাদের চারদিকে ঘোরাঘুরি করবে একদল কিশোর বালক, যারা চিরকাল কিশোরই থাকবে, যখনি তুমি তাদের দিকে তাকাবে মনে হবে এরা কতিপয় ছড়ানো ছিটানো মুক্তা।

২০. সেখানে যখন যেদিকে তুমি তাকাবে, দেখবে শুধু নেয়ামতেরই সমারোহ, দেখবে (নেয়ামত উপচেপড়া) এক বিশাল সাম্রাজ্য।

২১. বেহেশতবাসীদের পরনের কাপড় হবে অতি সূক্ষ্ণ সবুজ রেশম ও মোটা মখমল, তাদের পরানো হবে রূপার কংকণ, তাদের মালিক সেদিন তাদের ‘শরাবান তহুরা’ (পবিত্র ও উৎকৃষ্ট পানীয়) পান করাবেন।

২২. (আল্লাহ তায়ালা বলবেন, হে আমার বান্দারা,) এ হচ্ছে তোমাদের জন্যে (আমার) পুরস্কার এবং তোমাদের (যাবতীয়) চেষ্টা সাধনার স্বীকৃতি!

২৩. (হে নবী,) আমি অবশ্যই (এ মহাগ্রন্থ) কোরআনকে তোমার ওপর ধীরে ধীরে নাযিল করেছি,

২৪. সুতরাং তুমি ধৈর্যের সাথে তোমার মালিকের নির্দেশের অপেক্ষা করো, আর এদের মধ্যে যারা পাপী ও সত্যের পথ প্রত্যাখ্যানকারী, কখনো তাদের আনুগত্য করবে না,

২৫. তুমি সকাল সন্ধ্যা শুধু তোমার মালিকের নাম স্মরণ করতে থাকো,

২৬. রাতের একাংশ তাঁর সামনে সাজদাবনত থাকো এবং রাতের দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করতে থাকো।

২৭. এরা বৈষয়িক স্বার্থের পার্থিব জগতকেই বেশী ভালোবাসে এবং পরে যে তাদের ওপর একটা কঠিন দিন আসছে তা উপেক্ষা করে!

২৮. আমিই এদের সৃষ্টি করেছি এবং এদের জোড়াগুলো ও তার বাঁধন আমিই মযবুত করেছি, আবার আমি যখন ইচ্ছা করবো তখন এদের (এ বাঁধন শিথিল করে তাদের) আকৃতি বদলে দেবো

২৯. অবশ্যই এটি হচ্ছে একটি উপদেশ, অতএব যার ইচ্ছা সে (একে আঁকড়ে ধরে) নিজের মালিকের কাছে যাওয়ার পথ করে নিতে পারে।

৩০. আর আল্লাহ তায়ালা যা চান সেটা ছাড়া তোমরা তো কিছুই চাইতেও পারো না; অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা সব কিছু জানেন, তিনি প্রজ্ঞাময়।

৩১. তিনি যাকে চান তাকে তাঁর রহমতের মাঝে প্রবেশ করান; যালেমদের জন্যে তিনি কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রেখেছেন।

অনুবাদকঃ হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ।
প্রকাশনাঃ আল কোরআন একাডেমী লন্ডন।

Saturday, November 2, 2019

সূরা আল-মুরসালাত [প্রেরিত]

[মক্কায় অবতীর্ণ- আয়াত ৫০, রুকু ০২] [কোরআনে অবস্থান ৭৭, অবতীর্ণের অনুক্রম ৩৩]

পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ্ নামে-

. মৃদুমন্দ ক্রমাগতভাবে পাঠানো (কল্যাণবাহী) বাতাসের শপথ,

. প্রলয়ংকরী ঝঞা বাতাসের শপথ,

. মেঘমালা বিস্তৃতকারী বাতাসের শপথ,

. (মেঘমালাকে) যে (বাতাস) টুকরো টুকরো করে আলাদা করে দেয়- তার শপথ,

. (মানুষের অন্তরে) ওহী নিয়ে আসে যেসব (ফেরেশতা-) তাদের শপথ,

. (এটা মোমেনদের-) ওযর (আপত্তির সুযোগ না রাখা) কিংবা কাফেরদের সতর্ক (করার জন্যে),

. নিসন্দেহে তোমাদের (পরকাল দিবসের) যে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে তা সংঘটিত হবে;

. যখন আকাশের তারাগুলোকে জ্যোতিহীন করে দেয়া হবে,

. যখন আকাশ বিদীর্ণ হয়ে যাবে,

১০. যখন পাহাড়গুলোকে (ধুলার মতো) উড়িয়ে দেয়া হবে,

১১. যখন নবী রসূলদের সবাইকে নির্ধারিত সময়ে জড়ো করা হবে;

১২. (বলতে পারো)-কোন্ (বিশেষ) দিনটির জন্যে ( কাজটি) মূলতবী করে রাখা হয়েছে?

১৩. (হ্যাঁ, সেটা রাখা হয়েছে) চূড়ান্ত ফয়সালার দিনটির জন্যে,

১৪. তুমি কি জানো সে ফয়সালার দিনটি কেমন?

১৫. যারা (একে) মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে সেদিন তাদের ধ্বংস (অবধারিত)

১৬. আমি কি আগের (অবিশ্বাসী যালেম) লোকদের ধ্বংস করে দেইনি?

১৭. অতপর আমি পরবর্তী লোকদেরও (ধ্বংসের পথে) পূর্ববর্তীদের সঙ্গী করে দেবো

১৮. (হ্যাঁ সকল যুগের) অপরাধী ব্যক্তিদের সাথে আমি (একই) ব্যবহার করি।

১৯. (যাবতীয়) দুর্ভোগ সেদিন তাদের জন্যে যারা (সত্যকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে!

২০. আমি কি তোমাদের (এক ফোঁটা) তুচ্ছ পানি থেকে সৃষ্টি করিনি?

২১. অতপর সেই (তুচ্ছ পানির) ফোঁটাকেই আমি একটি সংরক্ষিত স্থানে (সযত্নে) রেখে দিয়েছি,

২২. (রেখে দিয়েছি) একটি সুনির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত,

২৩. তারপর (তাকে) পরিমাণমতো সব (কিছু দিয়ে আমি পূর্ণাংগ একটি মানুষ হিসেবে তৈরী) করতে সক্ষম হয়েছি, কতো সক্ষম ( নিপুণ) স্রষ্টা আমি!

২৪. (যাবতীয়) দুর্ভোগ সেদিন তাদের জন্যে যারা (সত্যকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে!

২৫. আমি কি ভূমিকে (প্রয়োজনীয় সামগ্ৰীসমূহের) ধারণকারী করে বানিয়ে রাখিনি?

২৬. জীবিত ব্যক্তিদের যেমনি (সে ধারণ করে আছে) তেমনি মৃত ব্যক্তিদেরও (সে ধারণ করে),

২৭. আমি তাতে উঁচু উঁচু পর্বতমালা সৃষ্টি করে রেখেছি এবং আমি তোমাদের সুপেয় পানি পান করিয়েছি

২৮. দুর্ভোগ তাদের জন্যে, যারা (এসব সত্যকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে।

২৯. (চূড়ান্ত বিচারের পর বলা হবে,) এবার চলো সেই জিনিসের দিকে যাকে তোমরা দুনিয়ায় মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে,

৩০. চলো সেই ধূম্রপুঞ্জের ছায়ার দিকে, যার রয়েছে তিনটি (ভয়ংকর) শাখা,

৩১. ছায়া (কিন্তু) সুনিবিড় কিছু নয়, এটা (তাকে) আগুনের লেলিহান শিখা থেকে বাঁচাতে পারবে না;

৩২. (বরং) তা (তার ওপর) বৃহৎ প্রাসাদতুল্য আগুনের স্ফুলিংগ নিক্ষেপ করতে থাকবে,

৩৩. (মনে হবে) তা যেন হলুদ বর্ণের (কতিপয়) উটের পাল;

৩৪. দুর্ভোগ তাদের জন্যে, যারা (একে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে।

৩৫. হচ্ছে সেই (মহাবিচারের) দিন, যেদিন কেউ কোনো কথা বলবে না,

৩৬. কাউকে সেদিন (নিজেদের পক্ষে) ওযর আপত্তি (কিংবা সাফাই) পেশ করার অনুমতি দেয়া হবে না যে, তারা কিছু ওযর পেশ করবে।

৩৭. দুর্ভোগ সেদিন তাদের জন্যে যারা (একে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে।

৩৮. (সেদিন পাপীদের বলা হবে,) আজকের দিন হচ্ছে চূড়ান্ত ফয়সালার দিন, তোমাদের সাথে তোমাদের পূর্ববর্তী সকল মানুষকে আজ আমি (এখানে) একত্রিত করেছি।

৩৯. আজ যদি (আমার বিরুদ্ধে) তোমাদের কোনো অপকৌশল প্রয়োগ করার থাকে তাহলে তা প্রয়োগ করো

৪০. দুর্ভোগ তাদের জন্যে, যারা (একে) মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে।

৪১. (আল্লাহকে) যারা ভয় করেছে (সেদিন) তারা (সুনিবিড়) ছায়ার নীচে এবং (প্রবাহমান) ঝর্ণাধারার মাঝে অবস্থান করবে,

৪২. তাদের জন্যে ফলফলারির ব্যবস্থা থাকবে, যা চাইবে তারা তাই (সেখানে) পাবে;

৪৩. (তাদের বলা হবে, দুনিয়ায়) তোমরা যা করে এসেছো তার পুরস্কার হিসেবে (আজ) তোমরা তৃপ্তির সাথে এসব খাও পান করো

৪৪. অবশ্যই আমি ভালো মানুষদের এমনিভাবেই পুরস্কার দিয়ে থাকি।

৪৫. সেদিন দুর্ভোগ তাদের জন্যে, যারা (এসব সত্যকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে!

৪৬. (হে অবিশ্বাসীরা,) কিছুদিন তোমরা এখানে খেয়ে নাও এবং কিছু ভোগ আস্বাদনও করে নাও, নিসন্দেহে তোমরা অপরাধী!

৪৭. দুর্ভোগ সেদিন তাদের (জন্যে) যারা (এসব সত্যকে) মিথ্যা সাব্যস্ত করেছে।

৪৮. এদের যখন বলা হয়, তোমরা (আল্লাহর দরবারে) নত হও, তখন তারা নত হয় না।

৪৯. (যাবতীয়) দুর্ভোগ সেদিন তাদের জন্যে, যারা (এসব সত্যকে) মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে!

৫০. (তুমিই বলো,) এরপর আর এমন কোন্ কথা আছে যার ওপর এরা ঈমান আনবে!

অনুবাদকঃ হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ।
প্রকাশনাঃ আল কোরআন একাডেমী লন্ডন