সুলতান মাহমুদ গজনীর রাজত্বকালের কথা। সুলতান মাহমুদের একজন গােলাম ছিলাে আয়াজ নামে। সুলতান মাহমুদ আয়াজকে খুব ভালবাসতেন।
আগেকার দিনে ক্রীতদাস প্রথা প্রচলিত ছিলাে। দুশমনের সাথে যুদ্ধের পর বন্দী
পাওয়া গেলে তাদের অন্যান্য শহরে নিয়ে গােলাম হিসেবে বিক্রয় করা হতাে।
এই কেনা দাস-দাসীদের মালিক যদি স্বেচ্ছায় আল্লার ওয়াস্তে মুক্তি না দিতাে
তাহলে তারা বাধ্য হতাে সারা জীবন মনিবের গােলামী, খেদমত ও যে কোন হুকুম
পালন করতে। মনিব ইচ্ছে করলে তাদের বাজারে নিয়ে গিয়ে পশুর মতাে বিক্রয়ও
করতে পারতাে। এই গােলাম ও দাস-দাসীদের মধ্যে অনেক সময় বহু গুণী-জ্ঞানী,
শিল্পী ও বুদ্ধিমান লােকও দেখা যেতাে। তারা দাস-দাসী হলেও স্বীয় গুণে ও
দক্ষতায় যেখানেই থাকুক না কেনো ধীরে ধীরে নিজেদের প্রিয় ও আদরণীয় করে
তুলতাে, এমনকি কখনো কখনাে বড় বড় দায়-দায়িত্বেও নিয়ােজিত হতাে।
আয়াজও ছিলাে তেমন একজন কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস। ছােট বেলায় এক যুদ্ধে বন্দী
হয়ে ক্রীতদাস হিসেবে হাটে বাজারে বিক্রি হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ঘটনাচক্রে
তার কপাল তাকে সুলতান মাহমুদ গজনীর শাহী দরবারে পৌঁছায়। সে সুলতান
মাহমুদের গােলাম হিসেবে খেদমত শুরু করে। আয়াজ ছিলাে খুবই বুদ্ধিমান, কর্মঠ
ও চরিত্রবান। দিন দিন সে সুলতানের সুনজরে পড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত সে
বাদশার একান্ত ব্যক্তিগত গােলামে পরিণত হয়। বাদশার খাস গােপন বিষয়াদি
দেখাশুনার দায়িত্ব অর্পিত হয় তার ওপর, যাকে বলে নাদিম। শাহী দরবারের
একান্ত বিশ্বস্ত গােলামদের বলা হতাে নাদিম।
আয়াজ সুলতান মাহমুদের
কাছে এতাে প্রিয় হয়ে ওঠে যে, সে সব সময় বাদশার সাথে সাথে থাকতাে। তার
প্রতি বাদশার এতাে ভালবাসা ও আদর দেখে অনেকেই তার প্রতি ঈর্ষা ও
বিদ্বেষপরায়ণ হয়ে ওঠে। দরবারের আমীর-ওমরাহ, উজীর-নাজিররা বলাবলি করতাে,
“এর কি অর্থ আছে যে, সুলতান এক কাফ্রী ক্রীতদাসকে এতাে ভালবাসবেন এবং সব
কাজেই তাকে ডেকে পাঠাবেন। এর ফলে তার হুকুম শাহী দরবারের অন্যান্য কর্মচারী
ও দায়িত্বশীলদের মেনে চলতে হচ্ছে।” তাদের অন্তরে যেহেতু হিংসা-বিদ্বেষ
ছিলাে সেহেতু আয়াজের ভালাে দিকগুলাে তাদের চোখে পড়তাে না। উল্টো তার দোষ
অন্বেষণ ও বদনাম করতাে। বলতাে, সুলতান মাহমুদ আয়াজের প্রেমে পড়েছে, আরাে
কত কি। সুলতান মাহমুদ ও আয়াজকে নিয়ে অনেক মশহুর গল্প আছে। কবিরা এ
দু’জনকে আশেক-মাশুক অর্থাৎ প্রিয়-প্রিয়ার প্রতীক হিসেবে কবিতাও লিখে
গেছেন।
সুলতান মাহমুদ বহুবার আয়াজের বুদ্ধিমত্তা, চিন্তা দর্শন,
কর্ম-নিপুণতা ও সততা পরীক্ষা করেছেন। আয়াজও প্রমাণ দিয়েছে যে, সে অন্যদের
চেয়ে অনেক ভালাে ও মূল্যবান। সুলতান মাহমুদ ও আয়াজ সম্পর্কে বহু গল্পের
একটি এখানে বলছি।
একবার মাহমুদ ও তার সঙ্গীরা ঘােড়ায় চড়ে সফরে
বের হয়েছেন। আয়াজও সাথে ছিলাে। দ্রুত ঘােড়া হাঁকিয়ে তারা এক মরু
বিয়াবানে গিয়ে উপস্থিত। ঘােড়া চলছে তাে চলছেই। হঠাৎ সুলতান মাহমুদের
মাথায় এক খেয়াল চাপলাে। সাথে স্বর্ণমুদ্রা আশরাফীর যে বস্তা ছিলাে তার
মুখ খুলে মুঠি মুঠি আশরাফী জমিনের ওপর ছিটানাে শুরু করলেন আর পিছু না
তাকিয়ে সামনের পানে চলতে লাগলেন।
কয়েক মিনিট এভাবে চলার পর সুলতান
মাহমুদ পিছু ফিরে তাকিয়ে দেখলেন তার সঙ্গী ঘােড় সওয়ারগণের কাউকে দেখা
যাচ্ছে না। কেবল আয়াজই সাথে আছে। মাহমুদ জিজ্ঞেস করলেন, সঙ্গীরা কই?
আয়াজ বললাে, তারা পিছু পিছু আসছেন। মনে হয় আশরাফী কুড়ানােতে মশগুল।
সুলতান বললেন, তবে তুই কেনো তাদের সাথে যােগ দিলিনে? আমার সাথে সাথে কেনো ছুটে এলি?
আয়াজঃ “তারা নেয়ামত দেখতে পেয়েছেন তাই খেদমত ভুলে গেছেন। কিন্তু আমার
দায়িত্ব শুধু সুলতানের খেদমত করা। তাই আমার কাজে আমি উপস্থিত থাকছি।”
মাহমুদঃ সে কেমন কথা! তুইতাে দেখতেই পেয়েছিস আমার হালাল মাল স্বর্ণমুদ্রা
মাটিতে ছিটকে পড়ছে ও হারিয়ে যাচ্ছে। তবে কেনো এর একটা উপায় খুঁজে বের
করলিনে?
আয়াজঃ তা কেমন করে হয়? যদি মুদ্রার থলিতে ছিদ্র থাকতাে
এবং আপনার অজ্ঞাতে ছিটকে পড়তাে তাহলে নিশ্চয়ই খবর দিতাম। কিন্তু যখন
দেখতে পাচ্ছি সুলতান নিজেই মাটিতে ছিটাচ্ছেন তখন ভেবে দেখেছি নিশ্চয়ই এতে
কোন কল্যাণ আছে।
সুলতান মাহমুদঃ মরু বিয়াবানে টাকাকড়ি ছিটানােতে আবার কি ধরনের কল্যাণ থাকতে পারে?
আয়াজঃ তা জানিনে। তবে জানি যে, সুলতান বুদ্ধিমান, জ্ঞানী বাদশাহ। তাই
নিশ্চয়ই এতে কোন হেকমত থাকতে পারে। যেমন, কখনাে যদি কোন দুশমন কাউকে তাড়া
করতে আসে তখন এ ধরনের অর্থ পথিমধ্যে পড়ে থাকলে শত্রু অর্থের লােভে তার
আসল কাজ ভুলে অর্থ সংগ্রহে লেগে যাবে।
মাহমুদঃ যদি কাউকে তেমন কোন শত্ৰু পিছু না নেয় তখন একাজের কি ফায়দা?
আয়াজঃ অবশ্যই ফায়দা আছে, বন্ধুদের বন্ধুত্ব ও দায়-দায়িত্ব পরখ করা যায়।
এ ধরনের আরাে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে সুলতানের কাছে আয়াজ দিন দিন
আরাে প্রিয় ও আদরণীয় হয়ে ওঠে। একবার সুলতান মাহমুদ শিকারে বের হওয়ার
ইচ্ছে করলেন। মাহমুদ তার আমীর ওমরাহ ও সভাসদদের বিশজনকে দাওয়াত করলেন এবং
বললেন, আগামীকাল শিকারে যাবাে, সবাই তৈরি থাকুন।
পরের দিন শিকারের
উদ্দেশ্যে সুলতান রওয়ানা হলেন। শহর থেকে বের হয়ে সামনের দিকে এগিয়েই
আমীর-ওমরাহগণ দেখতে পেলেন যে, তাদের আগে আগে সুলতানের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে
ঘােড়া চালাচ্ছে আয়াজ। কৃষ্ণাঙ্গ গােলাম তাদের আগে আগে ও সুলতানের
পাশাপাশি চলায় তারা বিরক্ত হলেন। পরস্পর বলতে লাগলেন, “এটা কিন্তু ভালাে
নয়। সুলতান যেখানে সেখানে এই কাফ্রী গােলামকে সঙ্গে নিয়ে চলেন, এমনকি
শিকারের সময়ও! অথচ আমরা সবাই হচ্ছি তার চেয়ে অনেক জ্ঞানী গুণী ও
বুদ্ধিমান। আমরা আমীর-ওমরাহ, সেনাপতি ও অধিনায়ক। এ গােলামের চেয়ে বহুগুণে
খেদমত করার ক্ষমতা রাখি আমরা। এ ছাড়া আমরা যুদ্ধের ময়দানে তার চেয়ে
বেশি ক্ষমতাবান। বুঝতেই পারছিনে এ ধরনের পদমর্যাদাহীন গােলামকে কেনো
শিকারের ময়দানে নিয়ে আসা হচ্ছে?”
এরপর তারা তাদেরই একজনকে বাছাই
করলেন যাতে সুলতানের কাছে গিয়ে কথাটি তাকে বুঝিয়ে বলেন। সুলতানকে যেনাে
জানানাে হয়, আয়াজকে যে সম্মান দেখানাে হচ্ছে তা আমীরদের প্রতি অবমাননা ও
অবজ্ঞাস্বরূপ। আয়াজ ঘরে ভালাে খেদমত করতে পারে বলে কি শিকারের ময়দানেও
তাকে আনতে হবে! শিকারের ময়দানে আমরাই তাে সুদক্ষ ও উপযুক্ত।
নির্বাচিত ব্যক্তি তার ঘােড়া হাঁকিয়ে সামনে গেলেন এবং সুলতানের অনুমতি
নিয়ে পাশাপাশি চলতে লাগলেন এবং আমীরদের বাণী তাকে জানানাের লক্ষ্যে বললেনঃ
“আমীরগণ বলছেন, আমরা যদি জানতে পারতাম যে, আয়াজের প্রতি সুলতানের স্নেহের
কারণ কি তাহলে হয়তাে বিরক্ত হতাম না। কিন্তু এই যে কারণহীন মান সম্মান
তাকে দেয়া হচ্ছে এর ফলে সুলতানের প্রতি আমাদের যে ভক্তি শ্রদ্ধা ও আকর্ষণ
তা ক্ষুণ্ণ হতে পারে। আমরাই তাে যুদ্ধ করে থাকি, আমরাই শিকার করে থাকি,
আমরাই বড় বড় কাজ আঞ্জাম দেই এবং সুলতানকে যে কোন ক্ষয়ক্ষতি থেকে হেফাজত
করি। অথচ কিনা এই আয়াজ আমাদের ওপরও ফখর করছে। এর কি কোন কারণ থাকতে পারে?”
গজনী মাহমুদ আমীরের কথা শুনে বললেন, “ঠিকই বলেছেন। এখন বিষয়টি যেহেতু এ
পর্যায়েই পৌঁছেছে তখন ভালাে হয় একটি পরীক্ষা হয়ে যাক। যদি আমার ভুল হয়ে
থাকে তা আমি জেনে যাবো। আর যদি আমি সঠিক কাজ করে থাকি তাহলে কারাে কোন
আপত্তি থাকবে না। এ কাজের যে কারণ রয়েছে তা সবার কাছেই পরিষ্কার হয়ে
যাবে।”
সুলতান হুকুম করলেন, শিকার বহর যেনাে দাঁড়ায়। এরপর সুলতান
মাঠের ডান দিকে বেশ কিছু দূরের একটি গাছ দেখিয়ে আয়াজকে বললেন, “আয়াজ
শুন্, ঐ গাছটি দেখছিস তাে? দ্রুতবেগে ঐ গাছের তলায় ছুটে যা এবং গাছের দিকে
সটান মুখ করে দাঁড়াবি। যখন তরবারী ও বর্শার শব্দ পাবি কেবল তখনি তাের
তরবারী ঐ গাছের তলায় রেখে ছুটে আসবি আমার কাছে।”
আয়াজ “জো হুকুম”
বলেই তার ঘােড়া ছুটালাে গাছের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাে গাছ
তলায় আর সেখানে সটান দাঁড়িয়ে রইলাে গাছের দিকে তাকিয়ে।
সুলতান
মাহমুদ এ সময় সকল আমীর ও অধিনায়কদের সমবেত করে বললেনঃ “আজ সবার চেষ্টায়
একটি সমস্যার সমাধান করবাে। যদি এতে কোন ভুল ভ্রান্তি থেকে থাকে তাও
ফয়সালা করবাে।”
আমীরগণ একবাক্যে জবাব দিলেন, “বাদশার যা মর্জি তাই হােক”।
সুলতানঃ শুনুন, আপনারা সবাই আমার কাছে প্রিয় ও সম্মানিত এবং সমান সমান।
তবে আমাদের কথাবার্তায় সুচারু দৃষ্টি রাখার জন্য আপনাদের মধ্য থেকে এমন
একজনকে প্রধান নির্বাচিত করুন যার ওপর আপনাদের বিশ্বাস আছে। এ কাজ দ্রুত
শেষ করুন।”
সবাই বললেনঃ “জো হুকুম বাদশাহ নামদার।”
এরপর সবাই
মিলে যাকে নির্বাচিত করলেন তিনি হলেন সেই আমীর যিনি সবার পক্ষ হয়ে
সুলতানকে আয়াজ সম্পর্কে বলেছিলেন। তিনি বয়সেও সবার বড়, কাজে কর্মে সৎ ও
কল্যাণকামী।
সুলতান নির্বাচিত আমীরকে বললেনঃ “এখন আপনি বিশজন আমীরের
প্রতিনিধি। আসুন, তাদের কাছ থেকে পঞ্চাশ কদম দূরে সরে দাঁড়াই এবং নিজেদের
কাজ শুরু করি।” আমীরগণই পঞ্চাশ কদম দূরে সরে গেলেন। সুলতান মাহমুদ
নির্বাচিত আমীরকে বললেন, “ঐ যে দেখতে পাচ্ছেন, দূরের রাস্তা ধরে একটি
কাফেলা পথ চলছে। আমি জানতে চাই কাফেলাটি কোথা থেকে এসেছে? দ্রুত সেখানে
গিয়ে খবর নিয়ে আসুন।”
আমীর ফরমায়েশ শুনেই দ্রুত ঘােড়া ছুটালেন
কাফেলার উদ্দেশে এবং কাফেলার কাছে গিয়ে কাফেলার প্রধান থেকে প্রশ্নের জবাব
নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব ফিরে এলেন সুলতানের কাছে এবং বললেন, “সুলতানের মঙ্গল
হােক! কাফেলা খােরাসান থেকে এসেছে।”
সুলতানঃ “বুঝতে পেরেছেন কি কোথায় যাচ্ছে?”
আমীরঃ “জিজ্ঞেস করিনি।”
সুলতানঃ “বেশ ভালাে কথা। আপনি আমার কাছেই দাঁড়িয়ে থাকুন।”
সুলতান মাহমুদ এরপর আরেকজন আমীরকে ডাকলেন এবং বললেনঃ “ঐ যে কাফেলাটি দেখছেন, দ্রুত সেখানে যান আর খোঁজ নিয়ে আসুন কোথায় যাচ্ছে।”
আমীর দ্রুত ছুটে গেলেন কাফেলার কাছে এবং খোঁজ নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব ফিরে
এলেন আর বললেন, “কাফেলা খােরাসান থেকে এসেছে এবং মদীনা যাচ্ছে।”
সুলতানঃ “কাফেলায় কতজন লােক রয়েছে?”
আমীরঃ “জিজ্ঞেস করিনি।”
সুলতানঃ “বেশ ভালো কথা। এখানেই দাঁড়িয়ে থাকুন।”
এরপর তৃতীয় আমীরকে ডেকে আনলেন ও বললেনঃ “ঐ যে কাফেলা দেখছেন সেখানে যান।
আমি জানতে চাই ঐ কাফেলায় কয়জন লােক আছে। দ্রুত খবর নিয়ে আসুন।”
আমীর দ্রুত ছুটে গিয়ে ফিরে এলেন এবং বললেনঃ “বাদশার মঙ্গল হােক, তারা একশাে আশি জন। খােরাসান থেকে হেজাজ যাচ্ছে।”
বাদশাহঃ “তারা কি ব্যবসায়ী, না মুসাফির? হেজাজে কি নিয়ে যাচ্ছে?”
আমীরঃ জিজ্ঞেস করিনি।”
সুলতানঃ “বেশ, এখানেই আমার কাছে দাঁড়ান।”
এরপর চতুর্থ আমীরকে ডেকে আনলেন ও বললেনঃ “ঐ দেখুন একটি কাফেলা, তারা
খােরাসান থেকে হেজাজ যাচ্ছে। আমি জানতে চাই তারা মুসাফির না ব্যবসায়ী ?
তাদের বােঝায় কি আছে? দ্রুত জবাব নিয়ে ফিরে আসুন।”
চতুর্থ আমীর
ছুটে গিয়ে কাফেলার কাছে পৌঁছালেন আর প্রশ্নোত্তর নিয়ে দ্রুতবেগে ফিরে
এলেন এবং বললেন, “তাদের বেশির ভাগই ব্যবসায়ী। খােরাসান থেকে পাথরের
হাঁড়ি-পাতিল, রেশমী কাপড়, ফরাশ-গালিচা, পেস্তা বাদাম ও অন্যান্য দ্রব্য
নিয়ে হেজাজে যাচ্ছে।”
সুলতানঃ “জিজ্ঞেস করেননি যে, তারা খােরাসান থেকে কবে রওয়ানা হয়েছে ও কয়দিনে এখানে পৌঁছেছে?”
আমীরঃ “জ্বি না, জিজ্ঞেস করিনি।”
সুলতান মাহমুদঃ “ঠিক আছে, আমার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকুন।”
সুলতান এরপর একে একে প্রত্যেক আমীরকে ডেকে একটি করে প্রশ্নসহ কাফেলার কাছে
পাঠিয়ে দেন আর আমীরগণ ফিরে এসে যার যার প্রশ্নের জবাব পেশ করেন। সুলতান
মাহমুদ গজনভী তখন সবাইকে লক্ষ্য করে বললেনঃ “এখন আমরা আসল বিষয়ে আসবাে।
আপনাদের নির্বাচিত ব্যক্তি সবকিছুই লক্ষ্য করেছেন। এখন আপনারাও যার যার কাজ
সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন। সবাই এখানে উপস্থিত রয়েছেন। তাহলে সবাই মিলে
পরস্পরের তরবারী ও বর্শাগুলােতে আঘাত হানুন যাতে আওয়াজ শুনে আয়াজ ফিরে
আসে।”
সুলতানের হুকুমে সবাই তাই শুরু করলেন। ওদিকে আয়াজ এসব শব্দের
অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলাে এবং আমীরদের কার্যকলাপ ও কথাবার্তার কিছুই
শুনতে পায়নি। তরবারী ও বর্শার আওয়াজ কানে যেতেই সে তার তরবারী গাছের ডালে
ঝুলিয়ে ছুটে এলাে দলের কাছে। সুলতান আয়াজকে সবার সামনেই বললেনঃ “আয়াজ! ঐ
যে চেয়ে দ্যাখ একটি কাফেলা পথ চলছে। আমি জানতে চাই কাফেলাটি কোথেকে এসেছে
ও কোথায় যাবে? দ্রুত গিয়ে খবর নিয়ে আয়। এক্ষুণি আমরা রওয়ানা হবাে।”
আয়াজ দ্রুত ঘােড়া হাঁকিয়ে ছুটে গেলাে কিন্তু অন্যদের চেয়ে কিছু সময়
দেরিতে ফিরে এলাে। সুলতানকে লক্ষ্য করে বললােঃ “সুলতানের মঙ্গল হােক,
কাফেলা খােরাসান থেকে হেজাজের দিকে যাচ্ছে।”
সুলতানঃ “বুঝতে পারছিস কয়জন লােক?”
আয়াজঃ “জিজ্ঞেস করেছি, একশাে সত্তরজন পুরুষ ও দশজন মহিলা।”
সুলতানঃ “তারা ব্যবসায়ী, না মুসাফির?”
আয়াজঃ “জিজ্ঞেস করেছি, কিছুসংখ্যক মুসাফির-হজ্ব করতে যাচ্ছে। আর বেশির ভাগই ব্যবসায়ী।”
সুলতানঃ “খুবই ভালাে হতাে যদি জিজ্ঞেস করতি তারা হেজাজে কি নিয়ে যাচ্ছে?”
আয়াজঃ “জিজ্ঞেস করেছি। তাদের কাছে রেশমী কাপড়, খােরাসানী ফরাশগালিচা,
পাথরের থালাবাসন ও হাঁড়ি পাতিল, পেস্তাবাদাম এবং বিভিন্ন শুকনো ফলমূল
রয়েছে।”
সুলতানঃ “তারা কবে রওয়ানা হয়েছে বুঝতে পেরেছিস?”
আয়াজঃ “নিশ্চয়ই! তারা রজব মাসের সাত তারিখ রওয়ানা হয়েছে, দু'মাস যাবৎ
পথ চলছে এবং এক সপ্তাহ এই শহরে কেনাকাটার জন্য অবস্থান করেছে।”
সুলতান আরাে কয়েকটি প্রশ্ন করলে আয়াজ সবগুলােরই জবাব দিলাে। তখন সুলতান বললেনঃ “বেশ ভালাে কথা তাের তরবারী কই?”
আয়াজঃ “ঐ গাছের ডালে ঝুলিয়ে রেখেছি।”
সুলতানঃ “শিগগির তরবারী নিয়ে আয়। রওয়ানা হতে হবে।”
আয়াজঃ দূরে যেতেই সুলতান গজনী মাহমুদ আমীরদের বললেনঃ “একটা কথা অবশ্যই
বলা প্রয়ােজন। আয়াজকে কেনাে ভালবাসি তার কারণ জানতে চেয়েছেন আর পরীক্ষার
ফলাফলও দেখেছেন। আপনারা বিশ জন আমীর-ওমরাহ ও অধিনায়ক ছিলেন। আয়াজ এক
কাফ্রী গােলাম। আমি আপনাদের প্রত্যেককে একেকটি প্রশ্ন দিয়ে পাঠিয়েছিলাম
যা আয়াজ জানতাে না। কিন্তু আপনাদের জবাব ও খবর ছিলাে অপূর্ণাঙ্গ ও ভাঙ্গা
ভাঙ্গা। সে যা অনুসন্ধান ও জিজ্ঞেস করেছে আপনারাও তা করতে পারতেন। কিন্তু
তা করেননি। শুধু যার যার একক প্রশ্নের জবাবই এনেছেন। আমি চাইনে আপনাদের
কাউকে অপদস্থ ও অসম্মান করতে। আপনারা প্রত্যেকেই বিভিন্ন কাজের দক্ষতা ও
ক্ষমতা রাখেন যা আয়াজের নেই। আপনারা অনেক কাজ ও শিল্প নৈপুণ্য জানেন যা
তার জানা নেই। তবে সে যে কাজ জানে ও যা তার পক্ষে সম্ভব তা সঠিক ও
পূর্ণাঙ্গভাবেই সম্পাদন করে থাকে। এরপরও কি ব্যাখ্যার প্রয়ােজন আছে?”
আমীরদের প্রতিনিধি বললেনঃ “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, সুলতানই ন্যায় পথে
আছেন। যে কোন লােক তার কাজ যত ছােট ও গুরুত্বহীনই হােক না কেনো যদি তা সঠিক
ও পূর্ণাঙ্গভাবে আঞ্জাম দেয় তাহলে স্থান-কাল ভেদাভেদে সে প্রিয়, ও
সম্মানিত হবেই, হওয়াই উচিত।”
লেখকঃ মোঃ ফরিদ উদ্দিন খান (সুলতান মাহমুদের দাড়ি)
গল্পটি মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমির “মসনবী” কাব্যগ্রন্থ থেকে অনুবাদ কৃত।
No comments:
Post a Comment