Wednesday, November 28, 2018

কেশর ও লেজবিহীন সিংহ

এক ছিলো চিত্রকর। তবে সে বর্তমান কালের চিত্রকর নয়। মানুষের শরীরে চিত্র অঙ্কন ছিলো তার পেশা। প্রাচীনকালে অজ্ঞ, মূর্খ ও বোকা লোকেরা সমাজে বাহাদুরী দেখানো ও নাম প্রকাশের জন্য নিজেদের চামড়ার ওপর চিত্র আঁকতো। বিভিন্ন রকমের চিত্র বাহুতে, বুকে, পেটে, পিঠে ও অন্যান্য অঙ্গে যার যেখানে ইচ্ছে এঁকে নিতো। কেউ আঁকতো বাঘ, ভল্লুক বা সিংহের ছবি। কেননা তা ছিলো বীরত্বের ও সাহসের চিহ্ন। আবার কেউ আঁকতো কোন নারী, ফুল, সূর্য বা অন্য কিছুর ছবি। কোন কোন কুস্তিগীর পালোয়ান নিজের গায়ে তলোয়ার, চাকু ও তীর-ধনুকের ছবিও আঁকতো। এ ছাড়া যার যা মনে চাইতো সে দৃশ্যের চিত্রই গায়ে অঙ্কন করতো। 

এসব চিত্র যারা এঁকে দিতো তাদের ফারসী ভাষায় বলেদাল্লাকদাল্লাকরা সাধারনতঃ পাবলিক গোসলখানার কর্মচারী। বাংলাদেশের মতো এতো দীঘি, পুকুর ও নদীনালা ইরান-আরবে নেই। বাড়িতে বাড়িতে পুকুর থাকা তো দূরের কথা বহু গ্রাম মিলেও সেখানে পুকুর নেই। লোকজন তাই পাবলিক গোসলখানায় গোসল করতে বাধ্য হয়। এই দাল্লাকরা গোসলখানার কাজকর্ম করা ছাড়া এই চিত্রকর্মেও বেশ পারদর্শী ছিলো। মানুষের শরীরে চিত্র আঁকার নিয়ম এই যে, প্রথমতঃ শরীরের যেখানে চিত্র আঁকতে হয় তা ভালো করে গরম পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হয়। এরপর যে চিত্র অঙ্কনের কথা তা কালি দিয়ে ঐ স্থানে এঁকে দেয়া হয়। এরপর সুঁই দিয়ে অঙ্কিত রেখার ওপর চামড়া ফুটো বা ছিদ্র করা হয়। কালি দিয়ে অঙ্কিত চিত্রের সবটুকু সুঁই দিয়ে ফুটো করেই বিশেষ ধরনের লতাপাতার রস দিয়ে তা মালিশ করা হয়। এরপর যখন চামড়ার ব্যথা বেদনা চলে যায় তখন সুঁই দিয়ে ছিদ্র করা জখমসমূহের ওপর এমন এক ধরনের পাকা কালি লাগানো হয় যা শরীরের এ স্থানে চিরকালের জন্য লেগে যায়। আর কোন কিছু দিয়েই ঐ চিত্রের রং সাফ করা যায় না।

অবশ্য এ ধরনের চিত্র অঙ্কন ছিলো প্রাচীনকালের মূর্খ লোকদের রেওয়াজ। সভ্য জ্ঞানী মানুষ কখনো নিজের শরীরে এমন চিত্র আঁকে না। যাহোক, তখনকার দিনে এসব ছিলো মূর্খদের জন্য গর্ব-অহঙ্কারের বিষয়।

এবার আসা যাক আমাদের মূল গল্পে। একদিন এক যুবক এলো ঐ চিত্রকর বা দাল্লাকের কাছে। এসে বললো, আমার শরীরে চিত্র আঁকতে হবে। 

দাল্লাক বললো, বেশ ভালো কথা, তবে কিসের চিত্র আঁকতে চাও?

যুবক বললো, আমি একজন কুস্তিগীর পালোয়ান। সিংহের মতো অকুতোভয় ও শক্তি আমার। তাই সিংহের ছবিই এঁকে দাও।

দাল্লাক বললোঃ বহুত আচ্ছা, সাব্বাস! এখন বলো শরীরের কোথায় আঁকবো সিংহ?

পালোয়ানঃ আমার ডান হাতের পেশীতে।

দাল্লাকঃ বেশ কথা, ঐখানে বাহু খুলে বস গিয়ে।

পালোয়ান যথাস্থানে গিয়ে বসলো চিত্রকর তার কাজ শুরু করলো। পালোয়ানের বাহু গরম পানি দিয়ে ধুয়ে চামড়া নরম করল এবং সুঁইটি ফুটন্ত পানিতে ডুবিয়ে দিলো। কালির দোয়াতও তৈরী। কলম ও কালি দিয়ে পালোয়ানের বাহুতে সিংহের পুরো ছবি সুন্দর করে আঁকলো। এরপর হাত দিলো আসল কাজে।

দাল্লাক যেইমাত্র তার সুঁই দিয়ে পালোয়ানের বাহুতে প্রথম ফুটোটি করলো পালোয়ান চিৎকার দিয়ে উঠলো, ওরে মা! আমার হাত অবশ হয়ে গেলো! করছিস কি দাল্লাক?

দাল্লাকঃ তোমার কথামতোই কাজ করছি। তুমি কি সিংহ আঁকতে বলোনি?

পালোয়ানঃ তাতো বলেছি। এখন বল কোথা থেকে শুরু করেছিস?

দাল্লাকঃ সিংহের লেজ থেকেই শুরু করেছি। লেজের ঠিক শেষ মাথাতে সুঁই বসিয়েছি।

সুঁইয়ের আঘাতে ততক্ষণে পালোয়ানের হাত অবশ। জ্বালাপোড়ায় অস্থির সে। চিত্রকরকে বললো, বেশ হয়েছে, এখন লেজ বাদ দিয়ে মাথা বা শরীরের কোথাও থেকে শুরু কর। আমার সিংহ লেজ ছাড়াই হবে। মনে করবো এ সিংহ লেজকাটা।

দাল্লাকঃ আমার কি বাপু! তোমার ইচ্ছে না থাকলে লেজ ছাড়াই আঁকবো। এবার দাল্লাক সিংহের লেজ ছেড়ে মাথা থেকে শুরু করলো। যেই সিংহের কেশর ও ঘাড় বরাবর সুঁই ঢুকিয়েছে অমনি পালোয়ানের গলাফাটা ফরিয়াদ আসমানে উঠলো, বাবারে, মরে গেলামরে! করছিস কি শুনি এই দাল্লাক?

দাল্লাকঃ আরে বাপু এরকম করো কেনো? সিংহের ছবিটাই তো আঁকছি। একটু ধৈর্য ধরো, কতক্ষণের ব্যাপার!

পালোয়ানঃ শুনি সিংহের কোন অংশ আঁকছিস এখন?

দাল্লাকঃ ঘাড়ের ওপর কেশর।

পালোয়ানঃ আরে বাপু সিংহের ঘাড় গর্দান আর কেশর কখন থেকে এতো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেলো? আমার সিংহের কেশর আঁকার দরকার নেই। ওসব বাদ দে। শরীরটা এঁকে দিলেই যথেষ্ট।

দাল্লাকঃ ঠিক আছে, কেশরও না হয় বাদ দিলাম।দাল্লাক ভাবতে লাগলো কি করা যায়। লেজ থেকেও হলো না, মাথার দিক থেকেও হলো না। ভালো কথা, এবার পায়ের দিক থেকেই শুরু করি। এরপর সিংহের পায়ের নকশার ওপর ঠিক থাবা বরাবর সুঁই খাড়া করে পালোয়ানের বাহুতে ঢুকিয়ে দিলো।

এবার পালোয়ানমাগো মাগোবলে গগন ফাটা ফরিয়াদ তুললো। ব্যথায় সারা শরীর তার কাঁপছে। তীব্র ব্যথায় ককিয়ে উঠে জিজ্ঞেস করলো, এটা আবার কোন জায়গা?

দাল্লাকঃ সিংহের পায়ের থাবা।

পালোয়ানঃ বাবা, তুইতো আজব চিত্রকর? এতোসব খুঁটিনাটি বিষয়ে কেনো ওস্তাদী দেখাচ্ছিস? সিংহের পায়ের থাবা আর নখ তো কারো চোখেই পড়েনা। আমি কি তোকে আমার শরীরে চীনের চিত্রশালা বানাতে বলেছি? শুধু সিংহের একটু সুরত হলেই চলে। আমার সিংহের থাবা দরকার নেই-বাদ দে ওসব। এমন কাজ কর যাতে ব্যথা কম হয় আর তাড়াতাড়ি বিদায় হতে পারি।

দাল্লাকঃ জোঁ হুকুম। এখন সিংহের মূল শরীরটাই এঁকে দেবো, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ না হয় বাদই থাক।

এরপর কালি দিয়ে অংকিত সিংহের নকশাটি ভালো করে খেয়াল করলো। তার নজর পড়লো সিংহের পেটের ওপর এবং সুঁইয়ের মাথা খাড়া করে পালোয়ানের চামড়ায় দিলো বসিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে পালোয়ানের কানফাটা চিৎকার। বললো, আরে বাপু আমাকে মেরে ফেলবি নাকি! করছিস কি? এটা আবার সিংহের কেমন জায়গা?

দাল্লাকঃ এটাইতো সিংহের আসল জায়গা, সিংহের পেট, এ ছাড়া তো সিংহ হবে না।

পালোয়ানঃ না, মোটেও তা নয়। আমার সিংহের পেটের দরকার নেই। এমন কিছু কর যাতে সিংহ হয়, তবে পেট যেন না থাকে।

এবার চিত্রকর হতভম্ব হয়ে গেলো। মুখে আঙ্গুল দিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করলো। তারপর চিত্রাঙ্কনের সুঁইটি ঢিল মেরে ফেলে দিলো। বললো, জনাব পালোয়ান! মাফ চাই। আমি এ যাবত কমপক্ষে এক হাজার লোকের গায়ে চিত্র এঁকেছি আর একশো বারের ওপর শুধু সিংহই অঙ্কন করলাম। কিন্তু এ যাবৎ লেজ, ঘাড়, থাবা আর পেট ছাড়া কোন সিংহ হতে দেখিনি।

দেখেছে কে কবে লেজ নেই পেট নেই বনরাজ?
খোদা কবে সাজালো এমন করে সিংহ-সাজ?”

বাবা পালোয়ান! সুঁইয়ের মাথার আঘাত যখন সহ্য করার ক্ষমতা তোমার নেই তখন তোমার বাহু এরকম খালি থাকাই শ্রেয়। এখন এখান থেকে বিদায় নাও আর আমাকে বিরক্ত করো না। এ ছাড়া পালোয়ানগিরি আর সিংহ-সাহসী হওয়ার গল্প গুজব একেবারে ভুলে যাও।

সইতে যদি নাইবা পারো সুঁইয়ের ঘা 
গল্প মারা বন্ধ করো সিংহ-ছা

লেখকঃ মোঃ ফরিদ উদ্দিন খান (সুলতান মাহমুদের দাড়ি)
গল্পটি মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমির মসনবীকাব্যগ্রন্থ থেকে অনুবাদ কৃত।

No comments:

Post a Comment