এক দেশে এক লােক ছিল। সে ছিল বিলাসী, পেটুক, নিষ্কর্মা, বেখেয়ালী ও
সুখপ্রিয়। সে সবকিছু ভােগ করতে চাইতাে কিন্তু কোন কাজই জানতাে না। এর ওপর
লােকটি ছিলাে চরম অলস; যাকে বলে অকেজো, অপদার্থ। শেষ পর্যন্ত বাবার দিয়ে
যাওয়া সহায় সম্পদ জমিজমা সব খুইয়ে কিছু কাল কাটিয়ে দিলাে ঋণ করে ও ফেরত
না দিয়ে। এছাড়া বন্ধক রেখে অর্থ গ্রহণ, জামিনে ঋণ গ্রহণ, ফাঁকি,
প্রতারণা ও বাটপারি করে তার কিছুকাল কাটে।
কয়েকবার সে মহাজনদের
নিকট থেকে ব্যবসায়ীদের জামিন রেখে জিনিসপত্র এনে অর্ধেক দামে তা বাজারে
বিক্রি করে এবং সেই অর্থ কয়েকদিনের মধ্যে খেয়ে দেয়ে শেষ করে দেয়।
কয়েকবার মহল্লা পাল্টিয়ে বাড়ি ভাড়া করে থেকেছে। তখন প্রতিবেশীর
আসবাবপত্রের দোকান থেকে বাকিতে আসবাবপত্র কিনে হঠাৎ আসবাবপত্রসহ উধাও
হয়েছে। আরাে কয়েকবার এদিক সেদিক দোকান খুলেছে ও আমানত হিসেবে দ্রব্য
সামগ্রী এনে এক ফাঁকে সব বিক্রি করে দিয়ে লাপাত্তা হয়েছে। এভাবেই এই টাউট
ব্যক্তি মানুষের টাকা-পয়সা, সহায় সম্পদ ভােগ করতাে।
অতি চালাকের
যেমন গলায় দড়ি তেমনি একবার এক পাওনাদার তাকে বাগে পেয়ে ধরে নিয়ে গেলাে
শহরের কাজীর কাছে। কাজীর নির্দেশে শহরের শাসক তাকে জেলখানায় আটক করলাে।
গণপ্রতারক টাউট জেলখানায় আটকা পড়েছে শুনে চারদিক থেকে পাওনাদাররা জমা
হলাে এবং মামলা দায়ের করলাে। সবাই যখন তার অসৎ চরিত্রের কথা জেনে গেলাে
তখন একজনও তাকে আর সুযােগ দিতে রাজি হলাে না। কেউ তার জন্যে জামিন হতেও
রাজি নয়। এভাবেই এ দেউলিয়া প্রতারক বহুদিন জেল খাটলাে।
টাউট
কিন্তু জেলখানাকেই তার জন্য শান্তির জায়গা বলে মনে করলাে। কারণ শহরে কেউ
তাকে ইজ্জত-সম্মান দিচ্ছে না। সবাই তাকে হেয় করে, পাওনা টাকাপয়সা
মালমাত্তা চায়, তেড়ে মারধর করতে আসে। তাই তার কাছে জেলখানাই আরামের
জায়গা বলে বিবেচিত হলাে। সে মনে মনে বললাে, আমার তাে কিছুই নেই। থাকার
মতাে শরীরটা আছে, তাও জেলখানার পােশাকে ঢাকা। এছাড়া আছে পেট, পেটও জেলের
খানায় ভরাট হচ্ছে। তাই সে জেলখানাতেই নির্বিঘ্নে মনের সুখে থাকতে লাগলাে।
কিন্তু কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না। মানুষের বদ অভ্যাসও আপনা আপনি বদলায়
না। এই টাউট এবার জেলখানাতেও শুরু করলাে চুরি-ডাকাতি ও ফাঁকি-প্রতারণা।
জেলের কয়েদীদের মালমাত্তায় হাত দিতে লাগলাে। কারাে নাস্তা খেয়ে ফেলে,
কারাে রাতের খানা নিয়ে যায় এবং কোথাও কারাে কাছে খানাপিনা দেখতে পেলে তা
চুরি না করা পর্যন্ত তার মন ছটপট করতে থাকে।
লজ্জাশরম ও ইনসাফকে
একেবারেই সে ভুলে গেছে। দয়ামায়া তার কাছে অজানা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার জিহবা ও পেট ছাড়া জগতে সে অন্য কিছুই দেখতে পেতাে না। শেষ পর্যন্ত
জেলখানার কয়েদীরাও তার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠলাে। সবাই মিলে
জেল-দারােগার কাছে নালিশ করলাে যে, এ বজ্জাতের যন্ত্রণায় তারা জেলের
যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট ও পরিশ্রমকে পর্যন্ত ভুলে গেছে। খবর পেয়ে কাজী এলাে
জেলখানায়।
কয়েদীরা কাজীকে বললাে, “আমাদের জন্য কি জেলের কষ্ট
যথেষ্ট নয় যে, এই বদমায়েশকে আমাদের ওপর গজব হিসেবে পাঠিয়েছেন? যা পায়
তাই খায় সে। জেলে কেউ আর তার কারণে শান্তি পাচ্ছে না। দয়া করে একে এখান
থেকে দূর করুন অথবা যেকোন উপায়ে তার অনিষ্টতা থেকে আমাদের নাজাত দিন।”
কাজী কিছুক্ষণ ভেবে চিন্তে বললেন, “তােমরা হক কথাই বলছো। সাধারণতঃ
জেলখানা তাদেরই উপযুক্ত স্থান যারা জেলখানায় কষ্ট অনুভব করে। কিন্তু
জেলখানা যার কাছে খুশীর ব্যাপার, আরামদায়ক সে জেলে থেকে কক্ষণাে মানুষ হবে
না। বরং বিনা পয়সায় খাওয়া-দাওয়াতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। তাকে জেল থেকে
বের করতেই হবে এবং যে করেই হােক তাকে দিয়ে পরিশ্রম করাতে হবে। তাকে
কারখানার কঠিন কাজে পাঠাবাে।”
কাজী দেউলিয়া টাউটকে ডেকে পাঠালেন
এবং বললেন, “পাওনাদারদের টাকা ফেরত দেয়ার জন্য তােকে লিখিত প্রতিশ্রুতি
দিয়ে দিতে হবে।” দেউলিয়া বললাে, আমি একজন দেউলিয়া। সাত আসমানের নিচে
আমার এক মুঠো মাটিও নেই। দেউলিয়ার আশ্রয় এবার আল্লাহ।”
কাজী বললেন, “তুই যদি দেউলিয়া হয়ে থাকিস তাহলে কোন কথাই নেই। তবে তুই যে দেউলিয়া এ ব্যাপারে কয়েকজনকে সাক্ষ্য দিতে হবে।”
দেউলিয়াঃ “জেলখানার সবাই সাক্ষী। এছাড়া আমার আর কোন সাক্ষী নেই।”
কাজীঃ “জেলখানার সবাই অপরাধী। অপরাধীদের সাক্ষ্য গ্রহণযােগ্য নয়। তাও কিনা তারাই তাের বিরুদ্ধে একযােগে নালিশ করেছে।”
দেউলিয়াঃ “সে যাই-হােক, আমার কিছুই নেই। জেলখানার চেয়ে ভালাে জায়গাও আমি খুঁজে পাবাে না।”
কাজীঃ “জেলখানা হলাে শাস্তির জায়গা, কষ্টের জায়গা। কিন্তু তুইতাে এখানে
শান্তি পাচ্ছিস। এতে তাের শাস্তি হবে কি করে? আমি তােকে জিন্দানখানা থেকে
বের করবাে। আর যেহেতু দেউলিয়া হওয়াতে শরম পাচ্ছিস না সেহেতু তােকে সারা
শহরে ঘুরাবাে যাতে কেউ আর তােকে কোন ঋণ না দেয়। সবাইকে সতর্ক করে দেবাে
যাতে কেউ তােকে কিছুই বাকিতে বা বন্ধকে না দেয়। তখন তুই নিজেই বুঝবি কি
করতে হবে। হয় কাজ করে রুটি রুজির ব্যবস্থা করবি নয়তাে আমরা তােকে কঠোর
কাজে লাগাবাে কিংবা ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলাবাে।”
এরপর কাজী হুকুম দিলো
তাকে যেনাে শহরের বড় ময়দানে নিয়ে যাওয়া হয় ও গাধা কিংবা গরু অথবা উট
যা-ই পাওয়া যায় সেখানে উপস্থিত করা হয়। এরপর দেউলিয়াকে ঐ পশুর ওপর
চড়িয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরের মহল্লায় মহল্লায় ঘুরিয়ে
জনগণেকে দেখিয়ে বলা হয়ঃ এই ব্যক্তি মানুষের টাকা পয়সা সহায় সম্পদ
খেয়েছে -এখন বলছে, সে নাকি দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। এখন থেকে যে কেউ তার
কাছে বাকিতে কিছু বিক্রয় করবে কিংবা তাকে ঋণ দেবে সে ব্যক্তির কোন অধিকার
নেই এ ব্যাপারে কাজীর কাছে নালিশ করার। কেননা, দেউলিয়ার কিছুই নেই এবং সে
জেলখানাকেও ভয় করে না।
কাজী মনে করেছেন, এতে করে লােকটি শহরে
বেইজ্জত হবে এরপর আর প্রতারণা ও বাটপারি করতে পারবে না। তখন বাধ্য হয়ে
একটা না একটা কাজে হাত দেবে কিংবা এই শহর ছেড়ে পালাবে।
দেউলিয়া
টাউটকে শহরের বড় ময়দানে আনা হলাে, ঢােল পেটানাের ফলে শহরের বহু লোক
ময়দানে উপস্থিত হয়েছে। কাজীর প্রতিনিধি বললেনঃ এ ব্যক্তিকে কোন গাধা, গরু
বা উটের ওপর সওয়ার করাতে চাই এবং রাত অবধি শহরের সব জায়গায় ঘুরাবাে এবং
মানুষকে বুঝাবাে যে, এ লােকের কোন কিছুই নেই।
ঠিক এমন সময় ঐখানে
এক কাঠুরিয়া উপস্থিত হলাে এবং উটের পিঠ থেকে লাকড়ির বােঝা মাটিতে নামিয়ে
উটের রশি ধরে তা ময়দানের মধ্যস্থলে আনলাে এবং কাজীর প্রতিনিধিকে বললােঃ
“এই নাও উট। এর পিঠে তাকে সওয়ার করাে।”
কাজীর প্রতিনিধিঃ “না, তুই বরং তাের নিজ কাজেই ফিরে যা। আমরা এমন উট বা গরু কিংবা গাধা খোঁজ করছি যা বেকার।”
কিন্তু সরলমতি উট মালিক একেবারে নাছােড় বান্দা। বললাে, “এই উট অন্য সবার
চেয়ে ভাল”। এরপর সে কাজীর প্রতিনিধিকে কিছু হাদিয়া দিলাে যাতে তার কথায়
রাজি হয়ে যায় ও তার উটকেই বাছাই করে।
দেউলিয়াকে কাঠুরিয়ার উটের
ওপর সওয়ার করা হলাে। এরপর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শহরে ঘুরানাে হয় এবং
ঘােষক উচ্চ কণ্ঠে ঘােষণা দেয়, “হে জনতা, ভালো করে তাকিয়ে দেখাে। এই
ব্যক্তি হচ্ছে দেউলিয়া, তার কিছুই নেই। এ যাবৎ বহু মানুষের টাকা-পয়সা সে
নষ্ট করেছে। কাজী প্রমাণ পেয়েছেন যে, সে এখন দেউলিয়া এরপর থেকে তাকে যদি
কেউ ঋণ দাও কিংবা বাকিতে কিছু বিক্রয় করাে তাহলে অনাদায়ে কাজীর দরবারে
নালিশ করার কোন হক থাকবে না। তাকে ভালাে করে দেখাে ও চিনে রেখাে।” প্রতিটি
অলিগলিতে উট থামিয়ে ফার্সী, কুর্দী, লােরী ও তুর্কী ভাষায় ঐ কথা কয়টি
লােকজনকে বুঝানাে হয়। সরল মতি উটের মালিকও উটের সাথে সাথে সারাক্ষণ ঘুরতে
থাকে।
রাত ঘনিয়ে আসলে দেউলিয়াকে কাজীর প্রতিনিধি সেই বড় ময়দানে
এনে উট থেকে নামিয়ে ছেড়ে দিলাে। উটকে উট মালিকের নিকট তুলে দিয়ে সরকারী
লােকজন চলে গেলাে যার যার পথে। শহরের বহু লােক তখনাে দেউলিয়ার চারপাশে জমা
হয়ে তামাশা দেখছে। দেউলিয়া যেই ভীড় ঠেলে বেরােবার পথ খুঁজছে সরলমতি উট
মালিক তার জামা টেনে ধরলাে এবং বললাে, “বাপু, দেখতে পাচ্ছ রাত অনেক হয়েছে।
আমার পথও অনেক দূর। সারাদিন বেচাকেনা আর রােজগার কিছুই করিনি। লাকড়িও
বিক্রি করা হলাে না। সেই সকাল থেকে এখন পর্যন্ত আমার উটেই সওয়ার হয়ে
ঘুরেছো। আমি বলছি না যে, আমার খরচ ও উটের কেরায়া দাও। তবে সামান্য কিছু
খড়কুটো বা ঘাস কিনে দাও যাতে উটটি উপােস না থাকে।”
দেউলিয়া লােকটি
বললাে, “দেখাে দেখাে এই লােকের কাণ্ড! তাহলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত
আমরা কি করলাম? কি ঘােষণা দেয়া হলাে? ব্যাটা বােকা কোথাকার! তাের কি চোখ
কান সাথে ছিলাে না? বুদ্ধি জ্ঞান কোথায় ছিলাে? আমি যে দেউলিয়া,
কপর্দকশূন্য, ভিক্ষুক, নিঃস্ব, ইজ্জতহীন সে ঘােষণা তাে আসমানেও গিয়ে
পৌঁছেছে। আর শহরের বাচ্চারা পর্যন্ত জেনে গেছে যে, আমার কিছুই নেই। তুই কি
এখনাে তা বুঝতে পারলি না?”
উট মালিকঃ “আমি এসব কিছু বুঝি না। আমি
শুধু এটিই জানি যে, সেই সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তুমি আমার উটের পিঠে
চড়ে শহর ঘুরেছো। আমার পাওনা আমাকে দিতেই হবে। তা না হলে তাের
ইজ্জত-সম্মান নষ্ট করব।”
দেউলিয়াঃ “সত্যি তুই ব্যাটা আমার চেয়েও
হতভাগা আর অন্যান্য পাওনাদারের চেয়ে বেশী লােভী। আমার সাথে যারাই লেনদেন
করেছে সবাই তাদের লােভের কারণে ও বেশী লাভের লােভে ফাঁদে পড়ে ঠকেছে। কারণ,
তারা দেখেছে যে, আমি প্রয়ােজনীয় দ্রব্য দ্বিগুণ দামে তাদের কাছ থেকে
বাকিতে ক্রয় করেছি, আয়ের চেয়ে শতগুণ বেশী খরচ করেছি। তবু বেশী লাভ
হওয়ার লােভে বাকিতেই আমাকে জিনিসপত্র ধার দিতাে। তারা ভাবতাে, আমার
নিশ্চয়ই সহায় সম্পদ কিছু আছে। কিন্তু তুই সেই সকাল থেকে এ পর্যন্ত কয়েক
হাজার বার শুনেছিস যে, আমার কিছুই নেই, এরপরও বুঝতে পারলি নে? ব্যাটা
আহাম্মক কোথাকার! আমার টাকাই যদি থাকতাে আর টাকা পাওনাদারদের ফেরত দেয়ার
স্বভাবও যদি থাকতাে তাহলে কি এতাে অপমান ও বেইজ্জতি সারাদিনভর সইতে হতাে?
যা ব্যাটা, যদি এরপরও তাের নালিশ করার কিছু থাকে তবে কাজীর কাছে যা।”
লেখকঃ মোঃ ফরিদ উদ্দিন খান (সুলতান মাহমুদের দাড়ি)
গল্পটি মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমির “মসনবী” কাব্যগ্রন্থ থেকে অনুবাদ কৃত।
No comments:
Post a Comment