Monday, December 31, 2018

উমারের (রাঃ) ছেলের কান্না

মক্তব থেকে এসে খলীফা উমারের ছেলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। উমার (রাঃ) তাকে টেনে জিজ্ঞাসা করলেন, “কাঁদছ কেন বৎস?” 

ছেলে উত্তর দিল, “সবাই আমাকে টিটকারী দেয় বলে, “দেখনা জামার ছিরি, চৌদ্দ জায়গায় তালি। বাপ নাকি আবার মুসলিম জাহানের শাসনকর্তা বলে ছেলেটি তার কান্নার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিল। 

ছেলের কথা শুনে উমার (রাঃ) ভাবলেন কিছুক্ষন। তারপর বাইতুল মালের কোষাধ্যক্ষকে লিখে পাঠালেন, “আমাকে আগামী মাসের ভাতা থেকে চার দিরহাম ধার দেবেন উত্তরে কোষাধ্যক্ষ তাঁকে লিখে জানালেন, “আপনি ধার নিতে পারেন। কিন্তু কাল যদি আপনি মারা যান তাহলে কে আপনার ধার শোধবে?” 

উমার (রাঃ) ছেলের গা-মাথা নেড়ে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, “যাও বাবা, যা আছে তা পরেই মক্তবে যাবে। আমাদের তো আর অনেক টাকা পয়সা নেই। আমি খলীফা সত্য, কিন্তু ধন সম্পদ তো সবই জন সাধারণের 

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-প্রথম খন্ড)

উমারের (রাঃ) ভাতা বৃদ্ধির চেষ্টা

উমারের (রাঃ) খিলাফত। খলীফা হওয়ার পূর্বে উমার ব্যবসা করে পরিবার চালাতেন। যখন খলীফা নিযুক্ত হলেন, তখন জনসাধারণের ধনাগার (বাইতুলমাল) থেকে অতি সাধারণভাবে জীবন ধারণের উপযুক্ত অর্থ তাঁকে ও তাঁর পরিবারের জন্য দেয়া হলো। বছরে মাত্র দুপ্রস্থ পোশাক। পারস্য ও রোম সাম্রাজ্যের শক্তি যাঁর কাছে নত, সেই দোর্দন্ড প্রতাপ খলীফা উমার সামান্য অর্থ পান জীবনধারণের জন্য। 

হযরত আলী, উসমান ও তালহা ঠিক করলেন খলীফার এ মাসোহারা যথোপযুক্ত নয়, আরও কিছু অর্থ বাড়িয়ে দেয়া হোক। কিন্তু কে এই প্রস্তাব খলীফা উমারের কাছে পেশ করবে। অবশেষে উমারের কন্যা ও রাসূলের (রাঃ) স্ত্রী হাফসাকে (রাঃ) তাঁর কাছে এই প্রস্তাব উত্থাপন করার জন্য অনুরোধ করা হলো। হাফসা (রাঃ) পিতার নিকট এই প্রস্তাব তুলতেই খলীফা উমার তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলেন। রুক্ষস্বরে তিনি প্রশ্ন করলেন, “কারা এই প্রস্তাব করেছে?” হাফসা নিরুত্তর। পিতাকে তিনি কি উত্তর দেবেন? সাহস হলোনা। খলীফা বললেন, “যদি জানতাম কারা এই প্রস্তাব তোমার মারফতে পাঠিয়েছে। তবে তাদের পিটিয়ে আমি নীল করে দিতাম। বেটি, তুমিতো জান, কি পোশাক রাসূল (সাঃ) পরিধান করতেন, কিরূপ খাদ্য তিনি গ্রহণ করতেন, কি শয্যায় তিনি শয়ন করতেন। বলতো, আমার পোশাক, আমার খাদ্য, আমার শয্যা কি তার চাইতে নিকৃষ্ট?” 

হাফসা উত্তর দিলেন, “না খলীফা বললেন, “তবে যারা এই প্রস্তাব করে পাঠিয়েছে, তাদের বলো, আমাদের নবী জীবনের যে আদর্শ স্থাপন করে গেছেন তা থেকে আমি এক চুলও বিচ্যুত হবে না সে আগুন ছড়িয়ে গেল সবখানে---। 

সহজ অনাড়ম্বর ও নিঃস্বার্থ জীবন যাপন সত্যিকার মানুষের আদর্শ——সংযত ও সুনিয়ন্ত্রিত যার জীবন নয়, সে কি করে শহীদের রক্তাক্ষরে লেখা সত্যের জীবনকে গ্রহণ করবে? খলীফা উমারও এক দিন আততায়ীর হস্তে নিহত হন। সত্যের পথে, ন্যায়ের পথে চলেছিলেন এই তাঁর অপরাধ। খলীফা উমার শহীদ হয়েছেন কবে, কিন্তু সত্যের নির্ভীক সাধক শহীদ উমার আজও বেঁচে আছেন দেশ ও জাতির দিগদর্শনরূপে। 

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-প্রথম খন্ড)

আপনি আচরি ধর্ম অপরে শিখাও

হযরত উমার (রাঃ) তখন খলীফা। খলীফা উমার (রাঃ) এর বাড়ী থেকে বেশ কিছু দূরে একটি পানির কূপ। খলীফার সাক্ষাৎপ্রার্থী একজন লোক দেখলেন, খলীফা কূপ থেকে পানি তুলছেন। শুধু পানি তোলা নয়, আগন্তুক বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলেন, পৃথিবীর শাসক উমার, পারস্য ও রোম সাম্রাজ্য পদানতকারী উমার (রাঃ) সেই পানি ভরা কলসি কাঁধে তুলে নিলেন। আগন্তুক আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি দ্রুত খলীফার নিকটে গেলেন। একজন অপরিচিত লোককে দেখে হযরত উমার (রাঃ) বললেন, “ভাই, আপনার কি কোন কথা আছে, বলবেন আমাকে?” 

লোকটি বললেন, “হে আমীরুল মুমিনীন, যদি কলসটি দয়া করে আমার কাঁধে দিতেন 

হযরত উমার (রাঃ) যেতে যেতেই বললেন, “আমার ছেলে-মেয়ের খাদ্য পানীয় সংগ্রহের মাধ্যমে পুণ্য সঞ্চয় করা কি আমার উচিত নয়? আচ্ছা, এ ছাড়া কি আপনি আর কিছু বলবেন?” 

আগন্তুক লোকটি বললেন, “আপনার এই অবস্থায় বলার মত কোন কথা আমার মনে আসছেনা। আগে বাড়ী চলুন। তারপর বলব। আমি আপনাকে অপেক্ষা করতে বলব, আপনি কাঁধে বোঝা নিয়ে আমার কথা শুনবেন, এটা হতে পারে না 

আগন্তুকের কথা শুনে হযরত উমার থমকে দাঁড়ালেন। বোধ হয় ভাবলেন, ‘আমি আমার নিজের কাজ করছি, এ কাজের অজুহাতে আগন্তুককে দাঁড় করিয়ে রাখা ঠিক হবে না তিনি কাঁধ থেকে কলসি নামিয়ে জানুর উপর রাখলেন। তারপর বললেন, “বলুন, আপনার কথা 

আগন্তুক ভীষণ বিব্রত বোধ করলেন। তার কথা শুনার জন্য আমীরুল মুমিনীন এ ভাবে কষ্ট করবেন। কলসটি মাটিতে নামিয়ে রাখলে তবু কিছুটা কষ্টের লাঘব হয় তাঁর। তিনি খলীফাকে নিবেদন করলেন, “জানুর উপর কলস রেখে কথা শুনতে আপনার কষ্ট হবে। কলসটি দয়া করে মাটিতে রাখুন 

খলীফা বললেন, “তা কি করে হয় ভাই? কলসির তলা ভিজা। এ জমিটি আমার নয়। ভিজা কলসির তলায় লেগে অন্যের জমি আমার বাড়িতে চলে গেলে, আকি কি জওয়াবদিহি করব?” 

লোকটি বলল, “আমার জিজ্ঞাসার জবাব আমি পেয়ে গেছি, আপনি দয়া করে যান 

উমার (রাঃ) বললেন, “বুঝলাম না, বুঝিয়ে বলুন 

লোকটি বলল, “ইয়া আমীরুল মুমিনীন, আমি জিজ্ঞাসা করতে এসেছিলাম বর্তমান জরীপে অন্যের জমির কতকাংশ আমার জমির সাথে উঠে এসেছে। তা আমার জন্য হালাল কিনা?” 

লেখকঃ আবুল আসাদ (আমরা সেই সে জাতি-প্রথম খন্ড)