Tuesday, November 27, 2018

মূসা (আঃ) ও মেষ পালক

হযরত মূসা আলাইহেস সালামের যুগের কথা। একদিন হযরত মূসা নবী এক পাহাড়ী পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। এমন সময় রাস্তার পাশ থেকে একটি করুণ আওয়াজ তার কানে এলাে। ব্যাপার কি দেখার জন্য যেদিক থেকে আওয়াজ আসছে সেদিকে তিনি এগিয়ে গেলেন এবং একটি টিলার পাশে দেখতে পেলেন এক সরল সাদাসিধে মেষ পালক আল্লাহর দরবারে দু’হাত তুলে মুনাজাত ও কান্নাকাটি করছে। মেষ পালক আল্লাহর উদ্দেশ্যে বলছে, “হে আমার প্রভু! যদি জানতাম তুমি কোথায় থাকো তাহলে আমি নিজেই তােমার কাছে ছুটে গিয়ে তােমার গােলামী করতাম, তােমার মাথার চুলে তেল দিয়ে ভাঁজ করে দিতাম, তােমার জুতা সেলাই করতাম, তােমার কাপড়-চোপড় ধুয়ে দিতাম। হে খােদা, আমি তােমাকে খুব ভালবাসি। যদি তােমাকে কখনাে দেখতে পাই তাহলে তােমার পদতলে আমার জান কোরবান করে দেবাে। আমার সকল ভেড়া, ছাগল ও দুম্বা তােমাকে দিয়ে দেবাে। হে খােদা, আমি তােমার ঠিকানা জানতে চাই, তােমার জন্য দই, পনির, তেলে ভাজা রুটি ও দুধ নিয়ে যাবাে। প্রতিদিন তােমার কাছে যাবাে, তােমার যত কাজ আছে সব করে দেবাে, তােমার ঘর-দুয়ার ঝাড়ু দেবাে, তুমি অসুস্থ হলে তােমার সেবা করবাে.............."

মেষ পালক এভাবে তার মনের কথা গুনগুনিয়ে বলে যাচ্ছিলাে। হযরত মূসা (আঃ) মেষ পালকের এসব কথায় চটে গেলেন। তার সামনে গিয়ে তাকে ডেকে বললেনঃ হে আল্লাহর বান্দা, এসব কি যা’তা কথা বলছাে? এসব কথা কুফরী কালাম; এসব কথা বলা গুনাহ। এসব খারাপ কথা। তােমাকে তওবা করতে হবে। আর কক্ষণাে এসব কথা মুখে আনবে না। শিগগির কথা থামাও, মুখ বন্ধ করাে।

মেষ পালক বললাে, তুমি কে? এখানে এসে নাক গলাচ্ছাে কেনাে? আমি তাে কোন খারাপ কথা বলছি না, খারাপ কাজ করছি না। আমি মুনাজাতে মশগুল, নিজের প্রভুর ইবাদত করছি। আমি খােদা-পরাস্ত, খােদা পূজারী। তবে তুমি কি খােদা পরাস্ত নও?

মূসা নবী বললেন, নিশ্চয়ই আমি খােদা পরাস্ত। কি করে সম্ভব যে, আমি খােদা পরাস্ত নই। আমি নিজেই মানুষকে আল্লাহর ইবাদত বন্দেগী শিক্ষা দেই। আমি বলছি না যে, তুমি আল্লাহর ইবাদত করাে না। কিন্তু আমরা যে খােদার উপাসনা করি তার ঘর নেই, জায়গা নেই, শরীর নেই, কাপড়-চোপড় নেই, হাত পা নেই, মাথা নেই, পেট নেই, খাদ্যের প্রয়ােজন নেই, অক্ষম ও অভাবী নন। তুমি এ সমস্ত কথা যা বলছাে, যে কেউ তা বলবে সে কাফের হয়ে যাবে। সে ধর্ম থেকে খারেজ হয়ে যাবে। আল্লাহর তাে কোন কিছুরই অভাব ও চাহিদা নেই।

মেষ পালক রাখাল এ কথা শুনে খুব ভয় পেয়ে গেলাে এবং লজ্জিত হয়ে বললাে, তবে এই খােদা, যার তরে জীবন বিলিয়ে দিতে চাই সে কেমন মানুষ যে, তার কিছুই নেই, আবার কোন কিছুর প্রয়ােজনও নেই?

মূসা নবী বললেন, আল্লাহ মানুষের মতো নন। এক অদ্বিতীয় খােদা সব কিছুর উর্ধ্বে ও সবার সেরা। কোন কিছুই তার মতাে নয়। খােদাকে চোখে দেখা যায় না। সবখানেই তিনি আছেন, তবে কোন কিছুর সাথেই মিশ্রিত নন, আবার কোন কিছু থেকেই পৃথক নন। সব ক্ষমতা তাঁর আছে, সব কিছুই তিনি জানেন, সবার ক্ষমতা তাঁর হাতেই। এই হচ্ছেন সেই খােদা আমরা যার ইবাদত বন্দেগী করি।

মেষ পালক বললাে, যাও বাবা! আমি এসব কিছু বুঝি না। আমি আল্লাহকে ভালবাসি, তাঁর জন্য জান বিলিয়ে দেবাে, তাঁর খেদমত করতে চাই, তাঁর পায়ের ধূলি আমার চোখে মাখবাে। যাও যাও, তুমি আবার কোন্ ছার যে, আমাকে খােদা সম্পর্কে ভয় দেখাতে এসেছাে?

মূসা (আঃ) বললেন, আরে বাবা আমি মূসা, আল্লাহর পয়গম্বর। আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে ভাল কাজ চান। যদি খােদার খেদমত করতে চাও তাহলে মানুষের উপকার করাে, কারাে ক্ষতি করাে না। খােদা এটাই চান। নিজের জন্য কিছুই চান না। কেউ আল্লাহকে দেখতেও পায় না। তুমি যে সব কথা বলেছো তা থেকে তওবা করাে, আর এসব কথা বলাে না, এসব কথায় গুনাহ হয়। আমার ভয় হচ্ছে, তুমি যেসব কথা বলছো তাতে আল্লাহর রাগ হবে এবং আল্লাহ আসমানী বালামুসিবত নাজিল করবেন, অগ্নি বৃষ্টি হবে ও সৃষ্টিকে পুড়িয়ে মারবেন। যদি আরেকবার এ ধরনের কথা বলাে ধর্ম থেকেই বিচ্যুৎ হয়ে যাবে এবং আল্লাহ তােমাকে অপছন্দ করবেন।

মেষ পালক বললাে—হে মূসা, তুমি আমাকে নিরাশ করলে। জানি না তাহলে কি করবাে। হায় হায়! আমার দুর্ভাগ্য! কতাে বদনসীব আমি!

মেষ পালক ভয়ে ও অনুতাপে মাথা চাপড়াতে লাগলাে। নিজের জামা নিজেই ছিড়ে ফেললাে। দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগলাে এবং মূসার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে কান্নারত অবস্থায় মরুভূমির দিকে ছুটে চললাে এবং দেখতে দেখতে অদৃশ্য হয়ে গেলাে।

হযরত মূসা আলাইহেসসালামও এ দুঃখজনক পরিস্থিতির কারণে কষ্ট পেলেন আর ভাবতে লাগলেন কি করে এ ধরনের সহজ সরলমনা সাদাসিদা মানুষকে আল্লাহ সম্পর্কে জ্ঞান দান করা যায়। তিনি খুবই বিচলিত হয়ে পড়লেন। এমনি সময় আল্লাহর তরফ থেকে মূসা নবীর কাছে ওহী নাজিল হলাে। আল্লাহ তায়ালা বললেন, হে মূসা, তুমি তােমার এই আচরণ দিয়ে আমার বান্দাকে আমার কাছ থেকে দূর করে দিলে। তুমি এজন্যে নবী হয়েছো যে, লােকজনকে আমার নিকটবর্তী করবে, তাদের নিরাশ করার জন্যে নয়। হে মূসা, আমি চাই মানুষ খােদার স্মরণ করুক ও তাঁর উপর আশা-ভরসা রাখুক। শিক্ষিতরা ভালােভাবে কথাবার্তা বলতে পারে। কিন্তু সাদাসিধে অন্তরের মানুষেরও খােদার ইবাদত করা আবশ্যক। মানুষের আমল-আখলাক ভালো হওয়া চাই। উত্তম কথাবার্তা সবাই জানে না। অন্তর ও দীল আল্লাহর সাথে থাকলে বাকি কাজও ঠিক হয়ে যাবে। আমি তােমাকে পাঠিয়েছি, তুমি মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান জানাবে এবং তাদের অন্তরকে ঈমানের নূরে আলোকিত করবে। এই মেষ পালক যাই করুক না কেনো আমার দোস্ত ছিলাে এবং খােদার দিকেই মুখ ফিরিয়ে ছিলাে। কিন্তু তুমি তার মন ভেঙ্গে দিয়েছাে, হে মূসা...............।

যেনাে হযরত মূসাকে বলা হলাে, হে মূসা, দুনিয়াতে এমন অনেক লােক আছে যারা আল্লাহকে না দেখেই ঈমান আনে, দ্বীন, পয়গম্বর ও কিতাবে বিশ্বাস স্থাপন করে। আবার কেউ কেউ আছে যারা আল্লাহর পরিবর্তে মূর্তি পূজা করে, সাপ পূজা করে, বাছুর পূজা ও অন্যান্য কিছুর পূজা করে যা মানুষের আক্কেল বুদ্ধি সায় দেয় না। বীর পুরুষ সেই, যে ঐসব গুমরাহদের আল্লাহর দিকে দাওয়াত করে। মূর্তি পূজারীদের ছেড়ে দিয়ে ঐ বীর আল্লাহর উপাসকদের মনে কক্ষণাে আঘাত হানে না।

ততক্ষণে হযরত মূসা আলাইহেসসালাম মেষ পালককে যা বলেছিলেন সে ব্যাপারে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হলেন। লজ্জা ও অনুতাপ তাকে ঘিরে ধরলাে আর সাথে সাথেই ছুটে চললেন ঐ মেষ পালকের উদ্দেশে। রাখাল যে পথে অদৃশ্য হয়েছেন সে পথে অনেক ছুটাছুটির পর শেষ পর্যন্ত তার দেখা পেলেন। তাকে বললেন, হে মেষ পালক! তুমি খুবই ভাগ্যবান। আল্লাহর তরফ থেকে নির্দেশ এসেছে। আমি তােমাকে শক্তভাবে বুঝিয়েছি, যাও এখন আর কোন বাধা নেই।

আদব কায়দার নেইকো আর প্রয়োজন,
সব কথা বলে যাও যেমন চায় দুঃখী মন।

হে মেষ পালক, তুমি খােদার সাথে থাকো, যেখানে যে অবস্থায়ই থাকো না কেনো খােদাকে স্মরণ করাে। যে ভাষাতে যে কথাতেই খােদাকে ডাকো না কেনো খােদা তা কবুল করবেন। আল্লাহ সত্যকে চিনেন, নিয়তকে জানেন। তিনি তােমার দীলের পবিত্রতাকে পছন্দ করেছেন।

মেষ পালক আক্ষেপ করে বললেন, হে মূসা আমার দফা রফা হয়ে গেছে। আমি অনুতাপে এতােই ভস্মীভূত হয়েছি যে, যা জানতাম না তা জেনে গেছি। যে আল্লাহ সব কিছু জানেন তিনি আমার দীলের বর্তমান অবস্থাও ভালাে করে জানেন। আমি জানি যে, আমার দীল আল্লাহর সাথে আছে, আমি গুনাহগার নই। আমার মুখ যদি সুন্দর সুন্দর কথা বলতে না জানে তাহলে এ মুখ বন্ধই করে দেবাে, আমার আর বলার কিছু নেই; ওয়াসসালাম।

লেখকঃ মোঃ ফরিদ উদ্দিন খান (সুলতান মাহমুদের দাড়ি)
গল্পটি মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমির “মসনবী” কাব্যগ্রন্থ থেকে অনুবাদ কৃত।

No comments:

Post a Comment