খায়বর যুদ্ধ তখন শেষ।
মহানবী (সাঃ) তখনও খায়বরে।
ভেতরে ভেতরে ইহুদীরা পাগল হয়ে গেছে
কিছু করার জন্যে।
ইহুদীদের একটা গ্রুপ সিদ্ধান্ত নিল
মহানবী (সাঃ)-কে হত্যা করার। ঠিক হলো বিষ খাওয়ানোই সবচেয়ে নিরাপদ।
পরিকল্পনা অনুসারে ছাগল জবাই করে
রান্না করা গোশতে তীব্র বিষ মেশানো হলো, যার ফোঁটা পরিমাণ গলাধঃকরণ করলে
সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মৃত্যু ঘটবে।
মহানবী (সাঃ) ছাগলের রানের গোশত
বেশী পছন্দ করতেন। সেই রানের গোশতে অধিক পরিমাণে বিষ মেশানো হলো।
যয়নাব নামে সম্ভ্রান্ত বংশীয়া
ইহুদী মেয়ে আরও কয়েকজনকে সাথে নিয়ে মহানবী (সাঃ)-এর কাছে এসে বলল, ‘আপনার জন্যে এই সামান্য হাদিয়া এনেছি। আপনি অনুগ্রহ করে
গ্রহণ করবেন কি?’
মহানবী (সাঃ) ধন্যবাদের সাথে
হাদিয়া গ্রহণ করলেন এবং উপস্থিত সাহাবাদের সাথে নিয়ে খেতে বসলেন।
তিনি এক টুকরো গোশত খেয়েই
সাহাবাদের উদ্দেশ্যে দ্রুত বললেন, ‘গোশতে বিষ মেশানো আছে, খেওনা কেউ।’
কিন্তু বিশর নামের একজন সাহাবী তখন
এক টুকরার কিছু অংশ গিলে ফেলেছিলেন।
সংগে সংগেই তাঁর দেহে বিষক্রিয়া
শুরু হয়ে গেল। দেহ তার বিবর্ণ হয়ে যেতে লাগল। বিষের যন্ত্রণায় তিনি কাতর হয়ে
পড়লেন।
মহানবী (সাঃ) যয়নাব ও তার সাথীদের
ডেকে তাদের কৃত অপরাধের কারণ জিজ্ঞাসা করলেন।
যয়নাব উদ্যত কণ্ঠেই বলল, ‘আপনাকে হত্যা করার জন্যে এটা করেছি।’ আর তার সাথী ইহুদীরা ধূর্ততার সাথে বলল, ‘আমরা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলাম, তুমি যদি ভণ্ড হও, তাহলে বিষ তোমার জিহ্বা স্পর্শ করার সাথে সাথে তোমার মৃত্যু
ঘটবে। আর যদি সত্যিই নবী হও, তাহলে বিষ তোমার কিছু করতে পারবে
না।’
চারদিকে দাঁড়ানো সাহাবীরা ইহুদীদের
এই ষড়যন্ত্রে ক্রোধে তখন আগুন। তারা বলল, ‘এদের হত্যা করার অনুমতি কি আমরা
পাব না?’
মহানবী (সাঃ) তাদেরকে ধৈর্য ধারণের
উপদেশ দিলেন। তাঁর নিজের উপর অত্যাচারের প্রতিশোধ কখনও তিনি নেন না, এ জন্যে কাউকে কোন দণ্ড-ও কখনো তিনি দেন না।
যয়নাব উদ্যত কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিল
ঠিকই। কিন্তু শীঘ্রই তার ভাবান্তর ঘটতে লাগল। সে মনে করেছিল তখনই তাদের গর্দান চলে
যাবে, হত্যা করা হবে তাদের সংগে সংগেই। সাহাবাদের প্রতি ধৈর্য ধারণের
উপদেশ, মহানবীর প্রতিশোধ না নেবার কথায় সে বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে পড়ল।
দ্বিতীয়ত, সাহাবী বিশরের চেয়ে অনেক বেশী গোশত মহানবী (সাঃ) খেয়েছেন।
কিন্তু বিশর যেখানে মুমূর্ষু, সেখানে মহানবী (সাঃ) সুস্থ। তাঁর
ঠোঁট দু’টি বিবর্ণ হওয়া ছাড়া বিষের আর কোন প্রতিক্রিয়া তাঁর দেহে
নেই। এই চিন্তা যয়নাবের মনকে ওলট-পালট করে দিল।
সর্বোপরি যয়নাব যখন দেখল, তাদের হত্যা তো দূরে গ্রেফতারও করা হলো না, তখন যয়নাব আর স্থির থাকতে পারলো না। মুহূর্তে তার হৃদয় খেকে
সব বিদ্বেষ কোথায় যেন দূর হয়ে গেল। তার জায়গায় তার হৃদয়ে নামল মহানবীর প্রতি ভক্তি, মমতার অঢেল প্রস্রবণ। সে লুটিয়ে পড়ল মহানবীর পায়ে এবং
কালেমায়ে তাইয়্যেবা পাঠ করে ইসলামে দাখিল হয়ে গেল।
হত্যা করতে এসে নতুন জীবন পেল
যয়নাব, নতুন মানুষ হয়ে গেল সে।
কিন্তু তার সৌভাগ্যের জীবন স্থায়ী
হলো না। বিষক্রিয়ার ফলে তিনদিন পরে সাহাবী বিশর-এর মৃত্যু ঘটলে হত্যার অপরাধে
যয়নাব প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হলেন।
লেখকঃ আবুল আসাদ
বইঃ আমরা সেই সে জাতি [তৃতীয় খণ্ড]
No comments:
Post a Comment