মক্কার উপকণ্ঠে মাররুজ জাহরান
উপত্যাকায় ফজরের নামায পড়ে দশ হাজার সৈন্যের মুসলিম বাহিনী মক্কা প্রবেশের জন্যে
যাত্রা শুরু করলেন।
বিভিন্ন সেনাপতির অধীনে দলে দলে
বিভক্ত হয়ে মুসলিম বাহিনী মক্কা প্রবেশের জন্যে অগ্রসর হচ্ছে।
প্রত্যেক সেনাপতি বহন করছেন তাঁর
দলের পতাকা।
তখনও সকাল হয়নি। আবু সুফিয়ান
মহানবী (সাঃ)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রাঃ)-এর সাথে এক টিলায় বসে তাদের সম্মুখ দিয়ে
মক্কার দিকে অগ্রসরমান মুসলিম সেনাদলের শান-শওকত ও শৃংখলা দেখছিলেন বিস্মিত চোখে।
মদীনার আনসার রেজিমেন্ট তখন অগ্রসর
হচ্ছিল আবু সুফিয়ানের সম্মুখ দিয়ে। আবু সুফিয়ান চিনতে পারলো না ওদের। জিজ্ঞাসা করল
হযরত আব্বাস (রাঃ)-কে, এরা
কারা?
আব্বাস (রাঃ) বললেন, এটা মদীনার
আনসারদের রেজিমেন্ট। সা’আদ
ইবনে উবাদা এদের সেনাপতি।
তখন সেনাপতি সা’আদ ইবনে উবাদা একদম সামনে এসে
পড়েছিলেন। তিনি আবু সুফিয়ানকে দেখে বললেন, ‘আজ ভীষণ সংঘর্ষের দিন, আজ কা’বার সম্ভ্রম বিনষ্ট হবে।’
শুনে তাঁর জাতির কথা ভেবে আবু
সুফিয়ান আর্তনাদ করে উঠলেন। অনুরোধ করতে লাগলেন তিনি হযরত আব্বাসকে কুরাইশদের
সাহায্য করার জন্যে।
আনসারদের পরেই ছিল মুহাজির
রেজিমেন্ট। আবু সুফিয়ান দেখলেন, মুহাজির দল যাচ্ছে তার সামনে দিয়ে এবং মহানবী (সাঃ) তাদের
সাথে রয়েছেন।
দেখেই আবু সুফিয়ান ছুটলেন মহানবীর
কাছে। আর্তনাদ করে বললেন, “মুহাম্মাদ, তুমি কি তোমার স্বজনদের
হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছ?”
মহানবী (সাঃ) বললেন, ‘না, কখনই না।’
তখন আবু সুফিয়ান সা’আদ ইবনে উবাদার কাছে যা শুনেছিল, বলল মহানবীকে।
শুনে মহানবী বললেন, ‘না, সা’আদের কথা সত্য নয়, আজ প্রেম ও করুণার
দিন। আজ কা’বার
সম্ভ্রম চির প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দিন।’
বলে একজন অশ্বারোহীকে কিছু
নির্দেশ দিলেন মহানবী (সাঃ)।
সঙ্গে সঙ্গেই অশ্বারোহীটি ছুটল আনসার
রেজিমেন্টের দিকে। সে সেনাপতি সা’আদ ইবনে উবাদার সামনে হাজির হয়ে জানাল যে, আবু সুফিয়ানকে উপরোক্ত উক্তি করার জন্যে তাকে পদচ্যুত
করা হয়েছে।
সেনাপতি সা’আদ সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর হাতের পতাকা
নব নিয়োজিত সেনাপতির হাতে তুলে দিয়ে পেছনে সাধারণ সৈনিকদের কাতারে এসে দাঁড়ালেন।
কোন প্রশ্ন বা অসন্তুষ্টির সামান্য চিহ্নও তাঁর চোখে-মুখে ফুটে উঠল না।
অশ্বারোহীকে আনসার রেজিমেন্টের
দিকে পাঠিয়ে দিয়ে মহানবী (সাঃ) আবু সুফিয়ানকে বললেন, ‘আবু সুফিয়ান, গিয়ে মক্কাবাসীকে
অভয় দাও, আজ তাদের প্রতি
কোনই কঠোরতা দেখানো হবে না। তুমি আমার পক্ষ থেকে ঘোষণা করে দাওঃ
(ক) যে ব্যক্তি অস্ত্র ত্যাগ করবে তাকে অভয় দেয়া হলো।
(খ) যে ব্যক্তি কা’বায় প্রবেশ করবে, তারা নিরাপদ।
(গ) যারা দরজা বন্ধ করে বাড়ীর ভেতরে অবস্থান করবে তাদের
কোন ভয় নেই এবং
(ঘ) যারা আবু সুফিয়ানের গৃহে প্রবেশ করবে, তারাও নিরাপদ।
মক্কাবাসীকে অভয়দানের এই চারটি
শর্তের ঘোষণা মুসলিম বাহিনীর সব সৈন্য, সব সেনাপতিকে জানিয়ে দেয়া হলো। সেই সাথে মুসলিম
বাহিনীকে আদেশ দেয়া হলো, মক্কায়
প্রবেশের সময় বা পরে কেউই অস্ত্র ব্যবহার করতে পারবে না।
যারা বার বার মদীনায়
অভিযান পরিচালনা করেছে মুসলমানদের অস্তিত্ব দুনিয়া থেকে মুছে ফেলার জন্যে, মদীনাকেও ধ্বংস
করার জন্যে, তাদের
জন্যেই মহানবীর এই ক্ষমা, এই
মহানুভবতা। কারণ তিনি রহমাতুল্লিল আলামীন।
লেখকঃ
আবুল আসাদ
বইঃ
আমরা সেই সে জাতি [তৃতীয় খণ্ড]
No comments:
Post a Comment