[মক্কায় অবতীর্ণ- আয়াত ১১০, রুকু ১২]
পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহ্র নামে-
১. সকল তা’রীফ আল্লাহ
তায়ালার জন্যে, যিনি তাঁর (একজন বিশেষ) বান্দার ওপর (এ) গ্রন্থ নাযিল
করেছেন এবং এর কোথাও তিনি কোনােরকম বক্রতা রাখেননি;
২. (একে তিনি)
প্রতিষ্ঠিত করেছেন (সহজ সরল পথের ওপর), যাতে করে তাঁর পক্ষ থেকে সে (নবী
তাদের জাহান্নামের ব্যাপারে) সতর্ক করে দিতে পারে এবং যারা ঈমানদার, যারা
নেক কাজ করে, তাদের সে (এ মর্মে) সুসংবাদ দিতে পারে (যে), তাদের জন্যে
(আল্লাহর কাছে) উত্তম পুরস্কার রয়েছে,
৩. সেখানে তারা চিরকাল থাকবে
৪. এবং সে সেসব লােকদেরও ভয় দেখাবে যারা বলে, আল্লাহ তায়ালা সন্তান গ্রহণ করেছেন।
৫. (অথচ) তাদের কাছে এর কোনাে জ্ঞান (-সম্মত দলীল) নেই, তাদের বাপ দাদাদের
কাছেও ছিলাে না; এটা বড়াে কঠিন কথা, যা তাদের মুখ থেকে বের হচ্ছে (আসলে)
তারা (জঘন্য) মিথ্যা ছাড়া কিছুই বলে না।
৬. (হে নবী,) তারা যদি এ কথার ওপর ঈমান না আনে তাহলে মনে হয় দুঃখে-কষ্টে এদের পেছনে পড়ে তুমি নিজেকেই বিনাশ করে দেবে।
৭. যা কিছু যমীনের বুকে আছে আমি তাকে অবশ্যই, তার জন্যে শােভা বর্ধনকারী
(করে) বানিয়েছি, যাতে করে তাদের আমি পরীক্ষা করতে পারি যে, তাদের মধ্যে
কাজকর্মের দিক থেকে কে বেশী উত্তম।
৮. (আজ) যা কিছু এর ওপর আছে, (একদিন তাকে) আমি উদ্ভিদশূন্য মাটিতে পরিণত করে দেবাে।
৯. (হে নবী,) তুমি কি মনে করাে, গুহা ও (পাহাড়ের) উপত্যকার অধিবাসীরা আমার নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি বিস্ময়কর নিদর্শন ছিলাে?
১০. (ঘটনাটি ছিলাে এই যে,) কতিপয় যুবক যখন গুহায় আশ্রয় নিলাে, তখন তারা
(এই বলে) দোয়া করলাে, হে আমাদের রব, তুমি একান্ত তােমার কাছ থেকে আমাদের
ওপর অনুগ্রহ করাে, আমাদের কাজকর্ম সহজ করে দাও, তুমি আমাদের সঠিক পথ দেখাও।
১১. অতপর আমি গুহার ভেতরে তাদের কানে বহু বছর ধরে (ঘুমের) পর্দা দিয়ে রাখলাম।
১২. তারপর আমি তাদের (ঘুম থেকে) উঠিয়ে দিলাম, যাতে করে আমি জেনে নিতে
পারি, দু’দলের মধ্যে কোন্ দলটি ঠিক করে বলতে পারে, তারা কতােদিন সেখানে
অবস্থান করেছিলাে।
১৩. (হে নবী,) আমিই তােমার কাছে তাদের বৃত্তান্ত
সঠিকভাবে বর্ণনা করছি; অবশ্যই তারা ছিলাে কতিপয় যুবক, যারা তাদের মালিকের
ওপর ঈমান এনেছিলাে, আমি তাদের হেদায়াতের পথে এগিয়েও দিয়েছিলাম।
১৪. আমি তাদের মনে দৃঢ়তা দান করেছি, যখন তারা (আল্লাহর পথে) দাঁড়িয়ে
গেলাে এবং ঘােষণা করলাে, আমাদের রব তাে হচ্ছেন তিনি, যিনি আসমানসমূহ ও
যমীনেরও রব, আমরা কখনাে তাঁকে বাদ দিয়ে আর কাউকে ডাকবাে না, যদি (আমরা)
এমন কথা বলি তাহলে (তা হবে) দ্বীন বিরােধী কাজ।
১৫. এরা হচ্ছে
আমাদের জাতির (লােক, যারা) আল্লাহ তায়ালাকে বাদ দিয়ে অসংখ্য মাবুদ গ্রহণ
করেছে; (তারা যদি সত্যবাদী হয় তাহলে) তারা এদের কাছে স্পষ্ট দলীল নিয়ে
আসে না কেন? তার চাইতে বড়াে যালেম আর কে, যে আল্লাহ তায়ালার ওপর মিথ্যা
আরােপ করে।
১৬. (অতপর যুবকরা পরস্পরকে বললাে,) আল্লাহ তায়ালা
ছাড়া অন্যদের যারা মাবুদ বানায় তাদের কাছ থেকে তােমরা যখন বিচ্ছিন্ন
হয়েই গেলে, তখন তােমরা একটি গুহায় গিয়ে আশ্রয় নাও, (সেখানে) তােমাদের
রব তােমাদের ওপর তাঁর রহমতের (ছায়া)-কে বিস্তার করে দেবেন এবং তােমাদের
বিষয়গুলাে তােমাদের জন্যে সহজ করে দেবেন।
১৭. (হে নবী,) তুমি (যদি
সে গুহা দেখতে, তাহলে) দেখতে পেতে, সূর্য (তার) উদয়কালে তাদের গুহার
দক্ষিণ পাশ দিয়ে হেলে যাচ্ছে, (আবার) যখন তা অস্ত যায় তখন তা গুহার বাম
পাশ দিয়ে অতিক্রম করে এবং তারা তার (মধ্যবর্তী) এক প্রশস্ত চত্বরে অবস্থান
করছে, (সূর্যের প্রখরতা কখনাে তাদের কষ্টের কারণ হয় না); আসলে এ সবই
হচ্ছে আল্লাহ তায়ালার (কুদরতের) নিদর্শন, (এর মাধ্যমে) আল্লাহ তায়ালা
যাকে হেদায়াত দান করেন সে-ই একমাত্র হেদায়াতপ্রাপ্ত হয়, আর (যাকে) তিনি
গােমরাহ করেন সে কখনাে কোনাে পথ প্রদর্শনকারী ও অভিভাবক পাবে না।
১৮. (হে নবী, দেখলে) তুমি তাদের মনে করবে, তারা বুঝি জেগেই রয়েছে, অথচ
তারা ঘুমন্ত, আমি তাদের (কখনাে) ডানে (কখনাে) বামে পরিবর্তন করে দিতাম,
তাদের কুকুরটি (গুহার) সামনে তার হাত দুটি প্রসারিত করে (পাহারারত) ছিলাে,
তুমি যদি তাদের দিকে (সত্যি) উঁকি মেরে দেখতে, তাহলে তুমি অবশ্যই তাদের কাছ
থেকে পেছনে ফিরে পালিয়ে যেতে এবং (এ আজব দৃশ্য) দেখে তুমি নিসন্দেহে ভয়ে
আতংকিত হয়ে যেতে।
১৯. এ ভাবেই তাদের আমি (ঘুম থেকে) উঠিয়ে দিলাম,
যেন তারা (তাদের অবস্থান সম্পর্কে) নিজেরা পরস্পরে জিজ্ঞাসাবাদ করে; (এ
সময়) তাদের এক ব্যক্তি বললাে (বলাে তাে), তােমরা (এ গুহায়) কতােকাল
অবস্থান করেছো; তারা বললাে, একদিন কিংবা একদিনের কিছু অংশ আমরা (এখানে)
অবস্থান করেছি; অতপর তারা বললাে, তােমাদের রব ভালাে জানেন, তােমরা (এ
গুহায়) কতো কাল অবস্থান করেছো; এখন (এই বিতর্ক রেখে বরং) তােমরা তােমাদের
একজনকে তােমাদের এ মুদ্রাসহ শহরে পাঠাও, সে (বাজারে) গিয়ে দেখুক উত্তম
খাবার কোনটি, অতপর সেখান থেকে কিছু খাবার তােমাদের কাছে নিয়ে আসুক, সে যেন
বিচক্ষণতার সাথে কাজ করে এবং সে যেন কোনো অবস্থায় কাউকে তােমাদের
ব্যাপারে কিছু না জানায়।
২০. তারা হচ্ছে (এমন) লােক যদি তাদের
কাছে তােমাদের (কথা) তারা প্রকাশ করে দেয়, তাহলে তারা তােমাদের
প্রস্তরাঘাত (করে হত্যা) করবে কিংবা তােমাদের (জোর করে) তাদের (আগের)
দ্বীনে ফিরিয়ে নেবে, (আর) তেমনটি হলে কখনােই তােমরা মুক্তি পাবে না।
২১. আর এভাবেই আমি (একদিন) তাদের ব্যাপার (শহরবাসীদের) জানিয়ে দিলাম,
যাতে করে তারা (এ কথাটি) জানতে পারে, (মৃতকে জীবন দেয়ার ব্যাপারে) আল্লাহ
তায়ালার ওয়াদা (আসলেই) সত্য এবং কেয়ামতের ব্যাপারেও কোনাে রকম সন্দেহ
নেই, যখন তারা নিজেদের মধ্যে এ নিয়ে বিতর্ক করে যাচ্ছিলাে, (তখন) কিছু
লােক বললাে, (তাদের সম্মানে) তাদের ওপর একটি (স্মৃতি-) সৌধ নির্মাণ করে
দাও; (আসলে) তােমাদের রবই তাদের সম্পর্কে সর্বাধিক খবর রাখেন; (অপর দিকে)
যেসব মানুষ তাদের কাজের ওপর বেশী প্রভাবশালী ছিলাে তারা বললাে (স্মৃতিসৌধ
বানানাের বদলে চলো)- আমরা তাদের ওপর একটি মাসজিদ নির্মাণ করি।
২২.
কিছু লােক বলে, (গুহার অধিবাসীরা ছিলাে) তিন জন, ওদের মধ্যে চতুর্থটি
(ছিলাে) ওদের (পাহারাদার) কুকুর, (আবার) কিছু লোেক বলে, (তারা ছিলাে) পাঁচ
জন, তাদের ষষ্ঠটি (ছিলাে) ওদের কুকুর, (আসলে) অজানা অদেখা বিষয়সমূহের
প্রতি এরা (খামাখা) অনুমান নিক্ষেপ করেই (এ সব কিছু) বলে, তাদের কেউ বলে
(ওরা ছিলাে) সাত জন এবং অষ্টমটি ছিলাে তাদের কুকুর; (হে নবী,) তুমি (এদের)
বলো (হ্যাঁ), আমার রব ভালাে করেই জানেন ওদের (আসল) সংখ্যা কতাে ছিলাে,
তাদের সংখ্যা খুব কম লােকই বলতে পারে। তুমিও এদের ব্যাপারে সাধারণ আলােচনার
বাইরে বেশী বিতর্ক করাে না এবং তাদের সম্পর্কে (খামাখা অন্য) মানুষদের
কাছেও মতামত জানতে চেয়াে না।
২৩. (হে নবী,) কখনাে কোনাে কাজের ব্যাপারে এ কথা বলাে না, (এ কাজটি) আমি আগামীকাল করবাে,
২৪. বরং (বলাে,) আল্লাহ তায়ালা যদি চান (তাহলেই আমি আগামীকাল এ কাজটা
করতে পারবাে), যদি কখনাে (কিছু) ভুলে যাও তাহলে তােমার রবকে স্মরণ করাে এবং
বলো, সম্ভবত আমার রব এর চাইতে নিকটতর কোনাে কল্যাণ দিয়ে আমাকে পথ
দেখাবেন।
২৫. (সৌর গণনায়) তারা তাদের (এ) গুহায় কাটিয়েছে মােট
তিনশ বছর, আর (চন্দ্র বছরের গণনায়) তারা (এর সাথে) আরাে নয় (বছর) যােগ
করেছে।
২৬. (হে নবী,) তুমি বলাে, একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই সঠিক করে
বলতে পারেন, ওরা (গুহায়) কতো বছর কাটিয়েছে, আসমানসমূহ ও যমীনের (যাবতীয়)
গায়ব বিষয়ের জ্ঞান তাে একমাত্র তাঁর (জন্যেই নির্দিষ্ট); কতাে সুন্দর
দ্রষ্টা তিনি, কতাে সুন্দর শ্রোতা তিনি! তিনি ছাড়া তাদের দ্বিতীয় কোনােই
অভিভাবক নেই, তিনি নিজের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতায় অন্য কাউকে কখনাে শরীক করেন
না।
২৭. (হে নবী,) তােমার ওপর তােমার মালিকের যে কিতাব নাযিল করা
হয়েছে তা তুমি তেলাওয়াত করো; তাঁর (কিতাবে বর্ণিত) কথাবার্তা রদবদল করার
কেউই নেই, তিনি ছাড়া তুমি আর কখনাে কোনো আশ্রয়স্থল পাবে না।
২৮.
(হে নবী) তুমি নিজেকে (সদা) সেসব মানুষদের সাথে রেখে চলবে, যারা সকাল
সন্ধ্যায় তাদের রবকে ডাকে, তারা একমাত্র তাঁরই সন্তুষ্টি কামনা করে এবং
তুমি কখনাে তাদের কাছ থেকে তােমার (স্নেহের) দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ো না (এমন
যেন না হয় যে,) তুমি শুধু এ পার্থিব জগতের সৌন্দর্যই কামনা করাে, কখনাে
এমন কোনাে ব্যক্তির কথামতাে চলাে না, যার অন্তকরণকে আমি আমার স্মরণ থেকে
গাফেল করে দিয়েছি, যে ব্যক্তি নিজের প্রবৃত্তির গােলামী করে এবং যার
কার্যকলাপ হচ্ছে (আল্লাহ তায়ালার) সীমানা লংঘন।
২৯. (হে নবী,) তুমি
বলাে, এ সত্য (দ্বীন) তােমাদের মালিকের পক্ষ থেকেই এসেছে। সুতরাং যার
ইচ্ছা সে (এর ওপর) ঈমান আনুক, আর যার ইচ্ছা সে (তা) অস্বীকার করুক, আমি এ
(অস্বীকারকারী) যালেমদের জন্যে এমন এক আগুন প্রস্তুত করে রেখেছি, যার পরিধি
তাদের পুরােপুরিই পরিবেষ্টন করে রাখবে; যখন তারা (পানির জন্যে) ফরিয়াদ
করতে থাকবে, তখন এমন এক গলিত ধাতুর মতাে পানীয় তাদের দেয়া হবে, যা তাদের
সমগ্র মুখমন্ডল জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেবে, কী ভীষণ (হবে সে) পানীয়; আর কী
নিকৃষ্ট হবে তাদের আশ্রয়ের স্থানটি।
৩০. আর যারাই (আল্লাহ
তায়ালার) ওপর ঈমান এনেছে এবং ভালাে কাজ করেছে (তাদের কোনাে আশংকা নেই
কেননা), আমি কখনাে তাদের বিনিময় বিনষ্ট করি না যারা নেক কাজ করে,
৩১. এদের জন্যে রয়েছে এক স্থায়ী জান্নাত, তাদের পাদদেশ দিয়ে ঝর্ণাধারা
প্রবাহিত হবে, তাদের সেখানে সােনার কাঁকন দ্বারা অলংকৃত করা হবে, তারা
পরিধান করবে সূক্ষ্ণ ও পুরু রেশমের পােশাক, (উপরন্তু) তারা সমাসীন হবে (এক)
সুসজ্জিত আসনে, কতাে সুন্দর (তাদের এ) বিনিময়; কতো চমৎকার (তাদের)
আশ্রয়ের স্থানটি।
৩২. (হে নবী,) তাদের জন্যে তুমি দু’জন লােকের
উদাহরণ পেশ করাে, যাদের একজনকে আমি দুটো আঙ্গুরের বাগান দান করেছিলাম এবং
তাদের উভয় (বাগান)-কে আমি খেজুর গাছ দ্বারা পরিবেষ্টিত করে রেখেছিলাম,
আবার এ দু’য়ের মধ্যবর্তী স্থানকে (পরিণত) করেছিলাম একটি সুফলা
শস্যক্ষেত্রে।
৩৩. উভয় বাগানই (এক পর্যায়ে) যথেষ্ট ফল দান করলাে,
(ফলদানে) বাগান দুটো কোনােরকম ক্রটি করেনি, উভয় বাগানে আমি পানির
ঝর্ণাধারাও প্রবাহিত করে রেখেছিলাম।
৩৪. (সেখানে) তার জন্যে ফল
(উৎপাদিত) হলাে, অতপর (একদিন) সে তার সাথীকে বললাে, দেখাে, আমি ধন-সম্পদের
দিক থেকে তােমার চাইতে (যেমন) বড়াে, (তেমনি) জনবলেও আমি তােমার চাইতে বেশী
শক্তিশালী।
৩৫. নিজের (শক্তি সামর্থের) ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে,
করতে সে (এক সময়) নিজের বাগানে গিয়ে প্রবেশ করলাে এবং বললাে, আমি ভাবতেই
পাচ্ছি না, এ বাগান (-এর সৌন্দর্য কোনাে দিন) নিশেষ হয়ে যাবে!
৩৬.
আমি (এও) মনে করি না যে, একদিন কেয়ামত প্রতিষ্ঠিত হবে এবং (কেয়ামতের পর)
আমাকে যদি আমার মালিকের সামনে ফিরিয়ে নেয়াও হয়, তাহলে এর চাইতে উৎকৃষ্ট
কিছু আমি (সেখানে) পাবাে।
৩৭. (তার) সে (গরীব) সাথীটি- যে তার সাথে কথা বলছিলাে, বললাে, (এ পার্থিব সম্পদ দেখে) তুমি
কি সত্যিই সে মহান সত্তাকে অস্বীকার করছো, যিনি তােমাকে মাটি থেকে অতপর
শুক্রকণা থেকে পয়দা করেছেন, পরিশেষে তিনি তােমাকে (একটি) মানুষের আকৃতিতে
পূর্ণাংগ করেছেন;
৩৮. কিন্তু (আমি বিশ্বাস করি,) সেই সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালাই হচ্ছেন আমার রব এবং আমার রব-এর এই সাথে আমি কাউকে শরীক করি না।
৩৯. তুমি যখন তােমার (ফলবতী) বাগানে প্রবেশ করলে, তখন কেন (একথা) বললে না
যে, আল্লাহ তায়ালা যা চেয়েছেন তা কতাে সুন্দর! আল্লাহ তায়ালা ব্যতিরেকে
কারােই (কিছুই ঘটানাের) শক্তি নেই, যদিও তুমি আমাকে ধনে জনে তােমার চাইতে
কম দেখলে (কিন্তু আমি আল্লাহ তায়ালার ওপর ঈমান রাখি)।
৪০. সম্ভবত
আমার রব আমাকে তােমার (এ পার্থিব) বাগানের চাইতে (আখেরাতে) উৎকৃষ্ট (বাগান)
দান করবেন এবং (অকৃতজ্ঞতার জন্যে) তার ওপর আসমান থেকে এমন কোনাে বিপর্যয়
নাযিল করবেন, ফলে তা (উদ্ভিদ-) শূন্য (বিরান) ভূমিতে পরিণত হয়ে যাবে।
৪১. কিংবা তার পানি তার (যমীনের) নীচেই অন্তর্হিত হয়ে যাবে, (তেমন কিছু হলে) তুমি কখনো তা (আবার) খুঁজে আনতে পারবে না।
৪২. (অতপর তাই ঘটলাে,) তার (বাগানের) ফলফলারিকে বিপর্যয় দিয়ে ঘিরে ফেলা
হলাে, তখন সে ব্যক্তি সেই ব্যয়ের ওপর- যা সে বাগানের (শােভাবর্ধনের) পেছনে
করেছিলাে, হাতের ওপর হাত রেখে আক্ষেপ করতে লাগলাে, (অপরদিকে) তার বাগান
মুখ থুবড়ে পড়ে থাকলো এবং সে বলতে লাগলাে, কতাে ভালাে হতাে যদি আমি আমার
মালিকের সাথে অন্য কাউকে শরীক না করতাম।
৪৩. কোনো দলই (আজ) তাকে
আল্লাহর (এ প্রতিশােধের) মােকাবেলায় সাহায্য করার জন্যে (অবশিষ্ট) রইলাে
না- না সে নিজে কোনাে রকম প্রতিশােধ নিতে পারলাে!
৪৪. ওখানে তাে
রক্ষা করার যাবতীয় এখতিয়ার একমাত্র আল্লাহ তায়ালার, তিনিই একমাত্র সত্য,
পুরস্কারদানে ও পরিণাম নির্ধারণে তিনিই উত্তম।
৪৫. (হে নবী,) তুমি
এদের কাছে দুনিয়ার জীবনের উদাহরণ পেশ করাে, (এ জীবনটা হচ্ছে) পানির মতাে,
আমি তা আকাশ থেকে বর্ষণ করি, যার কারণে যমীনের উদ্ভিদ ঘন (সুশােভিত) হয়ে
ওঠে, অতপর এক সময় তা ভুষিতে পরিণত হয়ে যায়, বাতাস তা উড়িয়ে নেয়;
(মূলত) আল্লাহ তায়ালা সব কিছুর ওপর প্রচন্ড ক্ষমতাবান।
৪৬. (আসলে)
ধন সম্পদ ও সন্তান সন্ততি হচ্ছে (তােমাদের) পার্থিব জীবনের কতিপয়
(অস্থায়ী) সৌন্দর্য মাত্র, চিরস্থায়ী বিষয় হচ্ছে (মানুষের) নেক কাজসমূহ,
তােমার মালিকের কাছে পুরস্কার পাওয়ার জন্যে (তা) অনেক ভালাে, আর কোনাে
(কল্যাণময়) কিছু কামনা হিসেবেও তা হচ্ছে উত্তম।
৪৭. যেদিন আমি
পাহাড়সমূহকে চলমান করে (সরিয়ে) দেবাে এবং তুমি পৃথিবীকে দেখবে, (তা) একটি
শূন্য প্রান্তর, (সেদিন) আমি তাদের; (মানবকুল)-কে এক জায়গায় জড়ো করবো,
তাদের কোনাে একজনকেও (সেদিন) আমি বাদ দেবাে না।
৪৮.তাদের (সবাই)-কে
তােমার মালিকের সামনে সারিবদ্ধভাবে এনে হাযির করা হবে; (অতপর আমি বলবাে,
আজ) তােমরা সবাই আমার কাছে এসে গেছে- (ঠিক) যেমনি করে আমি তােমাদের প্রথম
বার পয়দা করেছিলাম, কিন্তু তােমরা (অনেকেই) মনে করতে, আমি তােমাদের (আমার
কাছে হাযির করার) জন্যে কোনাে সময় (-সূচীই) নির্ধারণ করে রাখিনি!
৪৯. (অতপর তাদের সামনে) আমলনামা রাখা হবে, (তখন) নাফরমান ব্যক্তিদের তুমি
দেখবে, সে আমলনামায় যা কিছু লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে তারা (খুবই)
আতংকগ্রস্ত থাকবে, তারা বলতে থাকবে, হায় দুর্ভাগ্য আমাদের, এ (আবার) কেমন
বই! এ তো (দেখছি আমাদের) ছােটো এবং বড়ো প্রত্যেক বিষয়েরই হিসাব রেখেছে,
জীবনভর তারা যা কিছু করেছে তার প্রতিটি বস্তুই তারা সে গ্রন্থে) মজুদ দেখতে
পাবে, তােমার মালিক কারাে ওপর বিন্দুমাত্র যুলুমও করবেন না।
৫০.
(স্মরণ করাে), যখন আমি ফেরেশতাদের বলেছিলাম, তােমরা সবাই আদমকে সাজদা করাে,
তখন তারা সবাই সাজদা করলাে, কিন্তু ইবলীস ছাড়া; সে ছিলাে (আসলে)
জ্বিনদেরই একজন, সে তার মালিকের আদেশের নাফরমানী করলাে; (এরপরও) তােমরা কি
তাকে এবং তার বংশধরদের আমার বদলে তােমাদের অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করবে? অথচ
সে তােমাদের প্রকাশ্য দুশমন; (চেয়ে দেখাে,) যালেমদের কি নিকৃষ্ট বিনিময়
(দেয়া হয়েছে)।
৫১. আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী সৃষ্টি করার সময় আমি
তাদের কাউকে ডাকিনি, এমনকি স্বয়ং তাদের নিজেদের বানানাের সময়ও (তাে আমি
তাদের ডাকিনি), অন্যদের যারা গােমরাহ করে আমি তাদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করি
না।
৫২. সেদিন তিনি বলবেন, তােমরা তাদের ডাকো যাদের তােমরা
(দুনিয়ায় আমার শরীক) মনে করতে, অতপর ওরা তাদের ডাকবে (কিন্তু) তারা তাদের
(ডাকে) কোনােই সাড়া দেবে না, আমি এদের উভয়ের মাঝখানে এক (মরণ) ফাঁদ রেখে
দেবাে।
৫৩. নাফরমান লােকেরা যখন (জাহান্নামের) আগুন দেখতে পাবে তখন
তারা বুঝে যাবে, তারা (এক্ষুণি) সেখানে গিয়ে পতিত হচ্ছে, (আর সেখানে পতিত
হলে) ওরা তা থেকে কখনােই মুক্তির পথ পাবে না।
৫৪. অবশ্যই আমি
মানুষের জন্যে এই কোরআনে সব ধরনের উপমা (ও উদাহরণ) বিশদভাবে বর্ণনা করেছি,
কিন্তু মানুষরা অধিকাংশ বিষয় নিয়েই (অযথা) তর্ক করে।
৫৫. হেদায়াত
যখন মানুষের সামনে এসে গেলাে তখন ঈমান আনা ও (গুনাহের জন্যে) তাদের
মালিকের কাছে ক্ষমা চাওয়া থেকে তাদের কোন্ জিনিস বিরত রাখছে, তারা (কি)
তাদের কাছে পূর্ববর্তী মানুষদের অবস্থা এসে পৌঁছানাের অপেক্ষা করছে কিংবা
তাদের সামনে আযাব এসে হাযির হবার অপেক্ষা করছে?
৫৬. আমি তাে রসূলদের
(মানুষদের জন্যে জান্নাতের) সুসংবাদবাহী ও (জাহান্নামের) সতর্ককারী করেই
পাঠাই, কিন্তু যারা কুফরী করেছে তারা (অযথা) ঝগড়া শুরু করে, যাতে তারা এ
দিয়ে সত্যকে ব্যর্থ করে দিতে পারে, (মূলত) তারা আমার আয়াতসমূহকে এবং যেসব
বিষয় দিয়ে তাদের (জাহান্নাম থেকে) সতর্ক করা হয়েছিলাে তাকে একটি
বিদ্রূপের বিষয়ে পরিণত করে নিয়েছে।
৫৭. তার চাইতে বড়ো যালেম আর
কে আছে যাকে তার মালিকের আয়াতসমূহ স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে এবং সে এর
থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে, যা কিছু (গুনাহ) তার হাত দুটো অর্জন করেছে সে
(তাও) ভুলে যায়; আমি অবশ্যই তাদের অন্তরের ওপর (জাহেলিয়াতের) আবরণ
লাগিয়ে দিয়েছি, তাই তারা (সত্য দ্বীন) বুঝতে পারছে না, তাদের কানেও কঠিন
বস্তু ঢেলে দিয়েছি (তারা সত্য কথা শুনতে পায় না, অতএব হে নবী); তুমি ওদের
যতােই হেদায়াতের পথে ডাকো না কেন, তারা কখনাে হেদায়াত পাবে না।
৫৮. (হে নবী,) তােমার রব বড়ােই ক্ষমাশীল, দয়াবান; তিনি যদি তাদের সবাইকে
তাদের কৃতকর্মের জন্যে শাস্তি দিতে চাইতেন, তাহলে তিনি (সহজে) শাস্তি
ত্বরান্বিত করতে পারতেন; বরং (এর পরিবর্তে) তাদের জন্যে (শাস্তির) একটি
প্রতিশ্রুত ক্ষণ (নির্ধারিত) আছে, যা থেকে ওদের কারােই পরিত্রাণ নেই!
৫৯. এ জনপদ (ও তার অধিবাসীরা) যখন (আল্লাহ তায়ালার) সীমা লংঘন করেছিলাে
তখন আমি তাদের নির্মূল করে দিয়েছি, তাদের ধ্বংসের জন্যে আমি একটি দিন
ক্ষণ নির্দিষ্ট করে রেখেছি।
৬০. (হে নবী, তুমি এদের মূসার ঘটনা
শােনাও,) যখন মূসা তার খাদেমকে বললাে, যতােক্ষণ পর্যন্ত আমি দুটো সাগরের
মিলনস্থলে না পৌঁছবাে, ততােক্ষণ পর্যন্ত আমি (আমার পরিকল্পনা থেকে) ফিরে
আসবাে না, কিংবা (প্রয়ােজনে) আরাে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আমি চলা অব্যাহত
রাখবাে।
৬১. যখন তারা উভয়ে (সেই প্রত্যাশিত) দুটো সাগরের সংগমস্থলে
এসে পৌঁছলো, তখন তারা উভয়েই তাদের (খাবারের জন্যে রাখা) মাছটির কথা ভুলে
গেলাে, অতপর মাছটি সুড়ংয়ের পথ করে সাগরে চলে গেলাে।
৬২. যখন তারা
দু’জন আরাে কিছু দূর এগিয়ে গেলাে, তখন সে তার খাদেমকে বললাে, (এবার)
আমাদের নাশতা নিয়ে এসাে, আমরা এ সফরে সত্যিই ভারী ক্লান্ত হয়ে পড়েছি।
৬৩. সে বললাে, তুমি কি দেখােনি, আমরা যখন শিলাখন্ডের পাশে বিশ্রাম
করছিলাম, তখন মাছের কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম, (আসলে) শয়তানই আমাকে
ভুলিয়ে দিয়েছে যে, আমি তার কথাটা স্মরণ রাখবাে, আর সে (মাছটি)ও কি
আশ্চর্যজনক পদ্ধতিতে নিজের পথ ধরে সাগরের দিকে নেমে গেলাে।
৬৪. সে বললাে (আরে), এই তাে হচ্ছে সে (জায়গা), যার আমরা সন্ধান করছিলাম, অতপর তারা নিজেদের পথের চিহ্ন ধরে ফিরে চললাে।
৬৫. এরপর তারা (সেখানে) আমার বান্দাদের মাঝ থেকে একজন (পুণ্যবান) বান্দাকে
পেলাে, যাকে আমি আমার অনুগ্রহ দান করেছি, (উপরন্তু) তাকে আমি আমার কাছ
থেকে (বিশেষ) জ্ঞানও শিখিয়েছি।
৬৬. মূসা তাকে বললাে, আমি কি তােমার
অনুসরণ করতে পারি, যাতে করে (আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে) যে জ্ঞান তােমাকে
শেখানাে হয়েছে তার কিছু অংশ তুমি আমাকে শেখাতে পারাে।
৬৭. সে বললাে (হ্যাঁ পারাে), তবে আমার সাথে থেকে (তো) তুমি কখনাে ধৈর্য ধারণ করতে পারবে না।
৬৮. (অবশ্য,) যে বিষয়টি তুমি (জ্ঞান দিয়ে) আয়ত্ত করতে পারোনি তার ওপর তুমি ধৈর্য ধরবেই বা কি করে?
৬৯. সে বললো, আল্লাহ তায়ালা যদি চান তাহলে তুমি আমাকে ধৈর্যশীল (হিসেবেই) পাবে, আমি তােমার কোনাে আদেশেরই বরখেলাফ করবাে না।
৭০. সে বললাে, (আচ্ছা) যদি তুমি আমাকে অনুসরণ করােই তাহলে কোনাে বিষয়
নিয়ে আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবে না, যতোক্ষণ না সে কথা আমি তােমাকে বলে
দেবাে!
৭১. অতপর তারা দু’জন পথ চলতে শুরু করলাে। (নদীর পাড়ে এসে)
উভয়েই একটি নৌকায় আরােহণ করলাে, (নৌকায় উঠেই) সে তাতে ছিদ্র করে দিলাে;
সে বললাে, তুমি কি এ জন্যে তাতে ছিদ্র করে দিলে যেন এর আরােহীদের তুমি
ডুবিয়ে দিতে পারাে, তুমি তাে সত্যিই এক গুরুতর (অন্যায়) কাজ করেছো!
৭২. (মূসার কথা শুনে) সে বললাে, আমি কি তােমাকে একথা বলিনি যে, আমার সাথে থেকে তুমি কখনাে ধৈর্য ধারণ করতে পারবে না।
৭৩. সে বললাে, আমি যে (কথা) ভুলে গেছি সে ব্যাপারে তুমি আমাকে পাকড়াও
করো না এবং (এ ব্যাপারে) আমার ওপর বেশী কঠোরতাও আরােপ করো না।
৭৪.
আবার তারা উভয়ে পথ চলতে শুরু করলাে, (কিছুদূর গিয়ে) তারা উভয়ে এক
(কিশাের) বালককে পেলাে, (সাথে সাথে) সে তাকে হত্যা করে ফেললাে, (এটা দেখে)
সে বললাে, তুমি তাে কোনােরকম হত্যার অপরাধ ছাড়াই একটি নিষ্পাপ জীবনকে
বিনাশ করলে! তুমি (সত্যিই) একটা গুরুতর অন্যায় কাজ করে ফেলেছো!
৭৫. সে বললাে, আমি কি তােমাকে (একথা) বলিনি যে, তুমি আমার সাথে (থেকে) কখনাে ধৈর্য ধরতে পারবে না।
৭৬. সে বললাে, যদি এরপর একটি কথাও আমি তােমাকে জিজ্ঞেস করি, তাহলে তুমি আর
আমাকে তােমার সাথে রেখাে না, (অবশ্য এখন তাে) তুমি আমার পক্ষ থেকে ওযর পেশ
করার (প্রান্ত)-সীমায় পৌঁছে গেছো।
৭৭. তারা দু’জন আবার পথ চলতে
শুরু করলাে। (কিছুদূর এগিয়ে) তারা জনপদের অধিবাসীদের কাছে পৌঁছলাে,
(সেখানে পৌঁছে) তারা (সেখানকার) অধিবাসীদের কাছে কিছু খাবার চাইলাে, কিন্তু
তারা তাদের উভয়ের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করলাে, অতঃপর সেখানে তারা
একটি পতনোন্মুখ প্রাচীর (দেখতে) পেলাে, সে প্রাচীরটাকে সােজা করে দিলাে,
মূসা বললাে, তুমি চাইলে তাে এ কাজের ওপর কিছু পারিশ্রমিক গ্রহণ করতে পারতে!
৭৮. সে বললাে (বেশ), এখানেই তােমার আমার মধ্যে বিচ্ছেদ (হয়ে
গেলাে, কিন্তু তার আগে) যেসব ব্যাপারে তুমি আমার সাথে ধৈর্য ধরে থাকতে
পারোনি-তার ব্যাখ্যা আমি তোমাকে বলে দিতে চাই।
৭৯. (প্রথম ঘটনাটি
হচ্ছে,) নৌকা সম্পর্কিত, (মূলত) তা ছিলাে কয়েকজন গরীব মানুষের
(মালিকানাধীন), তারা (এটা দিয়ে) সমুদ্রে (জীবিকা অন্বেষণের) কাজ করতাে,
কিন্তু আমি (নৌকাটিতে ছিদ্র করে) তা ত্রুটিযুক্ত করে দিতে চাইলাম, (কারণ)
তাদের পেছনেই ছিলাে (এমন) এক বাদশাহ, যে (ত্রুটিবিহীন) যে নৌকাই পেতাে, তা
বল প্রয়ােগে ছিনিয়ে নিতাে।
৮০. (আর সে) কিশােরটি (-র ঘটনা হচ্ছে)
তার, পিতামাতা উভয়েই ছিলাে মােমেন, আমি আশংকা করলাম, (বড়াে হয়ে) সে
এদের দু’জনকেই (আল্লাহর) নাফরমানী ও কুফুর দ্বারা প্রভাবান্বিত করে দেবে,
৮১. আমি চাইলাম তাদের রব তার বদলে তাদের (এমন) একটি সন্তান দান করবেন, যে
দ্বীনদারী ও রক্তের সম্পর্ক রক্ষার ব্যাপারে তার চাইতে বেশী ভালাে
(প্রমাণিত) হবে।
৮২. (সর্বশেষ ছিলাে ওই) প্রাচীরটি (-র ঘটনা!
আসলে) তা ছিলাে শহরের দুটি এতীম বালকের, এর নীচেই তাদের জন্যে (রক্ষিত)
ছিলাে (গুপ্ত) ধনভান্ডার, ওদের পিতা ছিলাে নেককার ব্যক্তি, (এ কারণেই)
তােমার রব চাইলেন ওরা বয়ােপ্রাপ্ত হােক এবং তাদের (সে ভান্ডার থেকে তারা)
সম্পদ বের করে আনুক (এ প্রাচীরটাকে আমি তাদের বড়াে হওয়া পর্যন্ত দাঁড়
করিয়ে রাখতে চেয়েছিলাম), এ ছিলাে (মূলত) তােমার মালিকের অনুগ্রহ (দ্বারা
সম্পাদিত কতিপয় কাজ), এর কোনােটাই আমি আমার নিজে থেকে করিনি; আর এ হচ্ছে
সেসব কাজের ব্যাখ্যা, যে ব্যাপারে তুমি (আমার সাথে থেকে) ধৈর্য ধারণ করতে
পারছিলে না!
৮৩. (হে নবী,) এরা তােমাকে যুলকারনায়ন সম্পর্কে
জিজ্ঞেস করবে, তুমি বলো, (হ্যাঁ) আমি (আল্লাহর কিতাবে যা আছে) তা থেকে (সে)
বিবরণ তােমাদের (পড়ে) শােনাচ্ছি।
৮৪. (আল্লাহ তায়ালা বলছেন,) আমি যমীনের বুকে তাকে ক্ষমতা দান করেছিলাম এবং আমি তাকে (এর জন্যে) সব উপকরণও দান করেছিলাম,
৮৫. অতপর সে আরেক অভিযানের পেছনে বেরুলাে।
৮৬. (চলতে চলতে) এমনিভাবে সে সূর্যের অস্তগমনের জায়গায় গিয়ে পৌঁছলাে,
সেখানে গিয়ে সে সূর্যকে (সাগরের) কালাে পানিতে ডুবতে দেখলাে, তার পাশে সে
একটি জাতিকেও (বাস করতে) দেখলাে, আমি বললাম, হে যুলকারনায়ন, (এরা তােমার
অধীনস্থ, তারা খারাপ কাজ করলে), তুমি (তাদের) শাস্তি দিতে পারো অথবা (ভালাে
কাজ করলে) তাদের সাথে তুমি সদয় ভাবও গ্রহণ করতে পারাে।
৮৭. সে
বললাে (হ্যাঁ), এদের মাঝে যে যুলুম করবে তাকে আমি অবশ্যই শাস্তি দেবাে,
অতপর তাকে (যখন) তার মালিকের দিকে ফিরিয়ে নেয়া হবে (তখন) তিনি তাকে কঠিন
শাস্তি দেবেন।
৮৮. (অপরদিকে) যে ব্যক্তি (আল্লাহর ওপর) ঈমান আনবে
এবং নেক কাজ করবে, তার জন্যে (আখেরাতে) থাকবে উত্তম পুরস্কার, আর আমিও তার
সাথে আমার কাজকর্ম সম্পাদনের সময় একান্ত সহজ (ও নম্র) ব্যবহার করবাে;
৮৯. অতপর সে আরেক অভিযানের পেছনে বেরুলাে।
৯০. এমনকি (চলতে চলতে) সে সূর্যোদয়ের স্থানে গিয়ে পৌঁছলাে, তখন সে
সূর্যকে এমন এক জাতির ওপর (দিয়ে) উদয় হতে দেখলাে; যাদের জন্যে তার
(উত্তাপ) থেকে (রক্ষার) কোনাে অন্তরাল আমি সৃষ্টি করে রাখিনি।
৯১. (যুলকারনায়নের ঘটনা) এরকমই (ছিলাে); তার কাছে যা ছিলাে আমার কাছে সে সম্পর্কিত সব খবর (মজুদ) আছে।
৯২. অতপর সে আরেক (অভিযানে) পথে বেরুলাে।
৯৩. এমনকি (চলতে চলতে) সে দুটো প্রাচীরের মধ্যবর্তী স্থানে গিয়ে পৌঁছলাে,
দুই পর্বতের মধ্যবর্তী স্থানে (পৌঁছে) সে এমন এক সম্প্রদায়ের লােকদের
পেলাে, যারা (যুলকারনায়নের) কোনাে কথাই (তেমন) বুঝতে পারছিলাে বলে মনে
হলাে না।
৯৪. তারা (বিভিন্নভাবে তাকে) বললাে, হে যুলকারনায়ন,
নিসন্দেহে ইয়াজুজ মা’জুজ হচ্ছে যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী (দুটো দল, তাদের
থেকে বাঁচার জন্যে) আমরা কি তােমাকে (এ শর্তে) কিছু ‘কর’ দেবাে যে, তুমি
আমাদের এবং তাদের মাঝে একটি প্রাচীর বানিয়ে দেবে।
৯৫. সে বললাে
(করের প্রয়ােজন হবে না, কেননা), আমার রব আমাকে যা কিছু দিয়ে রেখেছেন তাই
(আমার জন্যে) উত্তম (হ্যাঁ, শারীরিক) শক্তি দ্বারা তােমরা আমাকে সাহায্য
করতে পারাে, আমি তােমাদের এবং তাদের মাঝে এক মযবুত প্রাচীর বানিয়ে দেবাে।
৯৬. তোমরা আমার কাছে লোহার পাতগুলো নিয়ে এসাে (অতপর তা দিয়ে প্রাচীর
তৈরীর কাজ শুরু হয়ে গেলাে); যখন মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানটি (দুটো পর্বতের)
সমান হয়ে গেলাে, তখন সে (তাদের) লক্ষ্য করে বললো, তােমরা (হাঁপরে) দম দিতে
থাকো; অতপর যখন তা আগুনকে উত্তপ্ত করলাে, (তখন) সে বললাে, (এখন) তােমরা
আমার কাছে (কিছু) গলানাে তামা নিয়ে এসাে, আমি তা এর ওপর ঢেলে দেবাে।
৯৭. অতপর (বিপর্যয় সৃষ্টিকারী দলের) লােকেরা তার ওপর (আর) উঠতে সক্ষম হলাে না- না তারা তা ভেদ করে (বাইরে) আসতে পারলাে!
৯৮. (যুলকারনায়ন বললাে,) এগুলাে আমার মালিকের অনুগ্রহ, কিন্তু যখন আমার
মালিকের ওয়াদা (-মতাে কেয়ামত) আসবে, তখন তিনি তা চূর্ণ বিচূর্ণ করে
একাকার করে দেবেন, আর আমার মালিকের ওয়াদা হচ্ছে সত্য ওয়াদা;
৯৯.
(কেয়ামতের আগে আবার) আমি তাদের দলে দলে ছেড়ে দেবাে, তারা (সমুদ্রের)
ঢেউয়ের আকারে একদল আরেক দলের মধ্যে প্রবিষ্ট হবে, যখন শিংগায় ফুৎকার
দেয়া হবে তখন তাদের সবাইকে আমি একত্রিত করবাে,
১০০. (সেদিন) আমি জাহান্নামকে (তার) অবিশ্বাসীদের জন্যে (সামনে) এনে হাযির করবাে,
১০১. যাদের চোখের মধ্যে আমার স্মরণ থেকে আবরণ পড়ে ছিলাে, তারা (হেদায়াতের কথা) শুনতেই পেতাে না।
১০২. কাফেররা কি এ কথা মনে করে নিয়েছে, তারা আমার বদলে আমারই (কতিপয়) গােলামকে অভিভাবক বানিয়ে নেবে, (আর আমি এ ব্যাপারে তাদের কোনো জিজ্ঞাসাবাদই করবো
না) আমি তাে জাহান্নামকে কাফেরদের মেহমানদারীর জন্যে সাজিয়েই রেখেছি।
১০৩. (হে নবী,) তুমি বলাে, আমি কি তােমাদের এমন লােকদের কথা বলবাে, যারা আমলের দিক থেকে আসলেই ক্ষতিগ্রস্ত;
১০৪. (এরা হচ্ছে) সেসব লােক যাদের সমুদয় প্রচেষ্টাই এ দুনিয়ায় বিনষ্ট হয়ে
গেছে, অথচ তারা মনে মনে ভাবছে, তারা (বুঝি) ভালো কাজই করে যাচ্ছে।
১০৫. এরাই হচ্ছে সেসব লােক, যারা তাদের মালিকের আয়াতসমূহ অস্বীকার করে এবং
(অস্বীকার করে) তাঁর সাথে ওদের সাক্ষাতের বিষয়টিও, ফলে ওদের সব কৰ্মই
নিষ্ফল হয়ে যায়, তাই কেয়ামতের দিন আমি তাদের (নাজাতের) জন্যে ওযনের
কোনাে মানদন্ডই স্থাপন করবাে না।
১০৬. এটাই জাহান্নাম! (এটাই)
তাদের (যথার্থ) পাওনা, কেননা তারা (স্বয়ং স্রষ্টাকেই) অস্বীকার করেছে,
(উপরন্তু) তারা আমার আয়াতসমূহ ও (তার বাহক) রসূলদের বিদ্রুপের বিষয়
হিসেবে গ্রহণ করেছে।
১০৭. (অপরদিকে) যারা (আল্লাহ তায়ালার ওপর)
ঈমান এনেছে এবং (সে অনুযায়ী) নেক কাজ করেছে, তাদের মেহমানদারীর জন্যে
‘জান্নাতুল ফেরদাউস’ (সাজানাে) রয়েছে।
১০৮. সেখানে তারা চিরদিন থাকবে, তারা সেখান থেকে (অন্য কোথাও যাওয়ার জন্যে) জায়গা বদল করতে চাইবে না।
১০৯. (হে নবী,) তুমি বলাে, আমার মালিকের (প্রশংসার) কথাগুলাে (লিপিবদ্ধ
করার) জন্যে যদি সমুদ্র কালি হয়ে যায়, তাহলে আমার মালিকের কথা (লেখা) শেষ
হওয়ার আগেই সমুদ্র শুকিয়ে যাবে, এমনকি যদি আমি তার মতাে (আরাে) সমুদ্রকে
(লেখার কালি বানিয়ে) সাহায্য করার জন্যে নিয়ে আসি (তবুও)।
১১০.
(হে নবী,) তুমি বলাে, আমি তাে তােমাদের মতােই একজন মানুষ, তবে আমার ওপর ওহী
নাযিল হয়, (আর সে ওহীর মূল কথা হচ্ছে), তােমাদের মাবুদ হচ্ছেন একজন, অতএব
তােমাদের মাঝে যদি কেউ তার মালিকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন (সব সময়)
ভালাে কাজ করে, সে যেন কখনাে তার মালিকের এবাদাতে অন্য কাউকে শরীক না করে।
অনুবাদকঃ হাফেজ মুনির উদ্দীন আহমদ।
প্রকাশনাঃ আল কোরআন একাডেমী লন্ডন।
No comments:
Post a Comment